সুন্দর ও স্বাভাবিক নিয়মে প্রাণিজগৎকে শ্রেণীবিন্যাস করার জন্য পকৃতিবিদগণ অনেক আগেই এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। আর এই জন্যই জীববিজ্ঞানের একটি স্বতন্ত্র শাখা গড়ে ওঠেছে ট্যাক্সোনমি বা শ্রেণীবিন্যাস বিদ্যা। এই শ্রেণীবিন্যাসে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন বিজ্ঞানী ক্যারোলাস নিলিয়াস ।
শ্রেণীবিন্যাস কি?
উদ্ভিদ ও প্রাণীদের আকৃতিগত এবং প্রকৃতিগত বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যাবলির পারস্পরিক সাদৃশ্য- বৈসাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে এদেরকে বিভিন্ন বিভাগ, পর্ব, শ্রেণী, বর্গ, গোত্র, গণ, প্রজাতি প্রভৃতি ধারাবাহিক স্তরে বিন্যস্ত করার পদ্ধতিকে শ্রেণীবিন্যাস বলে ।
শ্রেণিবিন্যাসের নীতি :
প্রাণীদের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক, সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রাণীদেরকে বিভিন্ন দলে অন্তর্ভুক্ত করার পদ্ধতিই হলো শ্রেণিবিন্যাস। শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যা অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাসের প্রধান নীতিগুলো হলো-
১। বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা : প্রতিটি প্রাণীর বৈশিষ্ট্য প্রথমেই ‘পর্যবেক্ষণ ও লিপিবদ্ধকরণ।
২। ট্যাক্সায় অন্তর্ভুক্ত : একটি প্রাণীর সাথে অন্যান্য প্রাণীর সম্পর্ক, সাদৃশ্য, বৈসাদৃশ্য ইত্যাদি বিবেচনা করে তাকে একটি দলভুক্ত এবং শ্রেণিবিন্যাসের একটি ধাপে (Texa) স্থাপন করা হয়।
আরও জানুন : প্রাণী জগতের শ্রেণীবিন্যাস, পর্ব ও প্রয়োজনীয়তা
৩। নামকরণ : ICZN কর্তৃক প্রদত্ত নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি Taxon- এর একটি আলাদা নাম দেয়া হয়। সর্বনিম্ন Taxon-এর নামটি ICZN কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয়।
৪। সংরক্ষণ : নিয়মানুযায়ী শ্রেণিবিন্যস্ত নমুনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়।
৫। শনাক্তকরণ : পরবর্তীতে এভাবে শ্রেণিবিন্যাসবদ্ধ প্রাণীটিকে শনাক্তকরণের জন্য সংগ্রহ হতে শ্রেণিবিন্যাসকরণ পদ্ধতি অনুযায়ী বৈশিষ্ট্যসমূহ লিপিবদ্ধ রাখা হয়।
শ্রেণিবিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা:
তত্ত্বীয় ও ফলিত উভয় জীববিজ্ঞানেই শ্রেণিবিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
তত্ত্বীয় প্রয়োজনীয়তা:
১. শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে কোন প্রাণিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত একটি প্রাণী সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করলে ঐ গোষ্ঠীর অন্যান্য প্রাণী সম্বন্ধে ধারণা জন্মে ।
২. কম পরিশ্রম ও অল্প সময়ের মধ্যে প্রাণিজগতের অনেক সদস্য সম্পর্কে জানা ও শোনা যায় ।
৩. প্রাণিকূলের যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে তা বা জাতিজনির বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
৪. প্রাণিকূলের বিবর্তনিক ধারা নির্ণয়ে সাহায্য করে ।
৫. নতুন প্রজাতি শনাক্ত করতে শ্রেণীবিন্যাস অপরিহার্য ।
ফলিত প্রয়োজনীয়তা:
১. জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও বনের ক্ষতিকর প্রজাতি দমনের উদ্দেশ্যে শ্রেণীবিন্যাস নির্দিষ্ট প্রজাতির সঠিক পরিচয় দান করে ।
২. অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রাণী বাছাই করা যায় ।
৩. বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সাহায্যে করে ।
৪. ভূতত্ত্বীয় ঘটনাবলীর নিখুঁত চিত্র তুলে ধরতে জীবজগতের শ্রেণীবিন্যাসের
সাহায্য প্রয়োজন ।
৫. কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাতের পশুপাখি উদ্ভাবন সহজতর হয় ।
আরও জানুন : প্রাণী বৈচিত্র্য কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি-উদাহরণ সহ
শ্রেণীবিন্যাসকরণের নিয়মাবলি :
১। জগৎ, পর্ব, শ্রেণী, বর্গ, গোত্র, গণ ও প্রজাতি ইত্যাদি ধাপগুলো নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে একটার নিচে অন্যটা লিখতে হয়।
২। ধাপগুলো সাধারণত ইংরেজিতে বা বাংলায় এবং বিশেষ নাম অবশ্যই রোমান হরফে লিখতে হবে।
৩। হাতে লেখার সময় উদ্ভিদ এবং প্রাণী উভয়ের ক্ষেত্রেই Genus বা গণ নামের নিচে এবং Species বা প্রজাতির নামের নিচে দুটো পৃথক সরলরেখা টানতে হবে।
৪। ছাপার অক্ষরে লেখার সময়ে গণ ও প্রজাতি বাঁকা (Italics) অক্ষরে লিখতে হবে। Genus বা গণ : Amoeba. Species বা প্রজাতি : Amoeba proteus
৫। গণ বা প্রজাতি ব্যতীত হাতে লেখার সময় বা ছাপানোর সময়ে অন্য কোন ও নামের নিচে দাগ দেয়া যাবে না ।
৬। সকল প্রাণীর গোত্রের নামের শেষে – idae’ এই অক্ষরে চারটি থাকবে। যেমন – অ্যামিবার গোত্র : Amoebidae. কুনোব্যাঙের গোত্র : Bufonidae .
৭। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের ক্ষেত্রে ইংরেজিতে Phylum, Class, Order, Family, Genus এবং Species অথবা বাংলায় পর্ব, শ্রেণী, বৰ্গ, গোত্র, গণ ও প্রজাতি এই ছয়টা ধাপ লিখলেই চলবে। কিন্তু মানুষ, ব্যাঙ, সাপ, মাছ ইত্যাদি সকল মেরুদণ্ডী প্রাণীর ক্ষেত্রে Phylum বা পর্বের নিচে অবশ্যই Sub phylum বা উপপৰ Vertebrata ধাপটা লেখা উচিত ।
আরও জানুন : পরিফেরা পর্বের বৈশিষ্ট্য, উদাহরণ, মনে রাখার উপায়
শ্রেণিবিন্যাসের উদ্দেশ্য কি?
শ্রেণিবিন্যাসের উদ্দেশ্য গুলো হলো –
১। প্রতিটি জীবের দল ও উপদল সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ করা । জীবজগতের ভিন্নতার প্রতি আলোকপাত করে আহরিত জ্ঞানকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা।
৩। পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানকে সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা।
৪। প্রতিটি জীবকে শনাক্ত করে তার নামকরণের ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি, জীবজগৎ ও মানব কল্যাণে প্রয়োজনীয় জীবসমূহকে শনাক্ত করে তাদের সংরক্ষণ অথবা প্রজাতিগত সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া ।
শ্রেণীবিন্যাসের ধাপ কয়টি ও কি কি ?
শ্রেণিবিন্যাসের জন্য কতকগুলো একক বা ধাপ রয়েছে। সর্বোচ্চ একক হচ্ছে জগৎ ও সর্বনিম্ন একক হচ্ছে প্রজাতি। একটি জীবকে প্রজাতি পর্যন্ত বিন্যাসের ক্ষেত্রে মূলত ৭টি ধাপ রয়েছে। শ্রেণিবিন্যাসের ধাপগুলো হলো-
| জগৎ (Kingdom) |
| পর্ব (Phylum) |
| শ্রেণি (Class) |
| বর্গ (Order) |
| গোত্র (Family) |
| গণ (Genus) |
| প্রজাতি (Species) |
