ভূমিকা:
বাংলাদেশের খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলের সমুদ্রতীরবর্তী চিরসবুজ বনাঞ্চলের নাম সুন্দরবন। এটিকে ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ বা লবণাক্ত জলাভূমির বনও বলা হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এ বন অতুলনীয় ও জীববৈচিত্র্যে অসাধারণ। শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছে নয়, এটি বিশ্বের প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় স্থান।
অবস্থান ও আয়তন:
সুন্দরবনের আয়তন প্রায় দশ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট অঞ্চলে এবং বাকি অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। পরস্পর সংযুক্ত প্রায় ৪০০টি নদীনালা এবং ছোটবড় প্রায় ২০০টি দ্বীপ নিয়ে সুন্দরবন গড়ে উঠেছে।
মৃত্তিকা ও জলবায়ু :
উৎপত্তির দিক থেকে সুন্দরবনের ভূভাগ হিমালয় পর্বতের ভূমিক্ষয়জনিত জমা পলি থেকে সৃষ্ট। জোয়ারধৌত এ বনের কোনো কোনো স্থানের মাটি আধাশক্ত এবং তেমন সুদৃঢ় নয়। pH মানের ব্যাপ্তি ব্যাপক। পলিযুক্ত দোআঁশ এখানকার মাটির প্রধান উপাদান। বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিকে অবস্থানের কারণে এ বনকে উষ্ণমণ্ডলীয় আর্দ্র বনভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানকার বাৎসরিক গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩১° সে. এবং সর্বনিম্ন ২১° সে.।
সুন্দরবনের উদ্ভিদ :
সুন্দরবনের উদ্ভিদকুল বৈচিত্র্যময়। এখানকার অধিকাংশ গাছপালা ম্যানগ্রোভ ধরনের। এখানে রয়েছে বৃক্ষ, লতাগুল্ম ঘাস, পরগাছা ইত্যাদি উদ্ভিদ। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত সন্ধাণপ্রাপ্ত ৫০টি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের মধ্যে সুন্দরবনেই আছে ৩৫টি। সুন্দরবনের উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে সুন্দরী, গরান, গেওয়া, কেওড়া, পশুর, ধুন্দল, বাইন প্রভৃতি। এছাড়া সুন্দরবনের প্রায় সবখানেই জন্মে গোলপাতা।
সুন্দরবনের প্রাণী :
বিচিত্র সব প্রাণীর বাস সুন্দরবনে। সুন্দরবনে রয়েছে প্রায় ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩২০ প্রজাতির পাখি, ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং ৪০০ প্রজাতির মাছ। সুন্দরবনের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে পৃথিবী বিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। এছাড়া রয়েছে চিত্রা ও মায়া হরিণ, বানর, বনবিড়াল, লিওপার্ড, শজারু ও বন্য শূকর।
পাখিদের মধ্যে রয়েছে টিয়ে, ময়না, শালিক, শ্যামা, দোয়েল, ঘুঘু, বক, সারস, বুনোহাঁস, বনমোরগ ইত্যাদি। এছাড়া সরীসৃপ প্রজাতির মধ্যে আছে কুমির, হাঙ্গর, সাপ, ব্যাঙ, গুঁইসাপ প্রভৃতি। বনের ভিতরের বিভিন্ন জলাশয়ে নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। শীতকালে সুন্দরবনে প্রচুর অতিথি পাখির আগমন ঘটে।
সুন্দরবনের গাছপালা :
সুন্দররবনে রয়েছে প্রচুর সুন্দরী গাছ। এজন্য এই বনকে বলা হয় সুন্দরবন। এছাড়া এই বনে রয়েছে গোলপাতা, গেওয়া, কেওড়া, ধুন্দল, গরান প্রভৃতি নানা প্রজাতির গাছ। এছাড়া সুন্দরবনে নানা ধরনের ছোট গাছ, লতাগুল্ম ও ঝোপঝাড় রয়েছে। এসব গাছপালা বনের পরিবেশকে সবুজ ও সুন্দর করে তুলেছে। এখানকার গাছপালা বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়েরও ব্যবস্থা করে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব :
সুন্দরবনে রয়েছে অফুরন্ত বনজ ও প্রাণিজ সম্পদ। হাজার হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে এ সম্পদের ওপর নির্ভর করে। প্রতিবছর দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক আসে সুন্দরবনের সৌন্দর্য দেখার জন্য। এতে সরকারের অনেক রাজস্ব আয় হয়। সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র তৈরি হয়। এর গোলপাতা গরিব লোকদের ঘরের ছাউনী ও বেড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।
সুন্দরবনে যে শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়, তা খাওয়ার চুনের ভালো উৎস। সুন্দরবনের মধুর ওপর নির্ভর করে এক শ্রেণির মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। দেশে বিক্রির পাশাপাশি এ মধু বিদেশেও রপ্তানি হয়।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবন:
যেকোনো দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন; কিন্তু বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৭ শতাংশ। FAO (Food & Agriculture Organization)-এর তথ্য মতে আবার বনভূমির আয়তন মাত্র ১০ শতাংশ।
একক বন হিসেবে সুন্দরবন বাংলাদেশের বৃহত্তম বন। এখানে প্রচুর শ্বাসমূলীয় গাছ আছে, যেগুলো পানিতে থেকেও শ্বাস নিতে পারে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন তার বৃহৎ অংশ সরবরাহ করে সুন্দরবন।
বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন:
সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে পরিচিত। ম্যানগ্রোভ হলো লবণাক্ত পানিতে শ্বাসমূল দিয়ে বেঁচে থাকা গাছগাছালির বন। সুন্দরবনের গাছপালা জোয়ারের লবণাক্ত পানিতে টিকে থাকতে পারে বলে একে বৃহত্তম টাইডাল বন বলে। এ বনে এমন কিছু উদ্ভিদ আছে যা পৃথিবীর অন্যত্র পাওয়া যায় না।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য:
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সুন্দরবন অনন্য। সুন্দবনের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এখানে ভিড় করে। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলো থেকে পশুপাখি, গাছপালা দেখা যে কাউকে মুগ্ধ করবে। সুন্দরবনের বাঘ এবং হরিণ দেখতে পৃথিবীর অন্যান্য জঙ্গলের চেয়ে আলাদা।
সমুদ্র উপকূল রক্ষায় ম্যানগ্রোভ:
ম্যানগ্রোভ বৃক্ষের মূল পলি ধরে রাখে এবং কোনো নতুন চরের স্থিতিশীলতায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ। এখানকার মানুষের বসতি রক্ষায় ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করে। তাই এ এলাকার মানুষের জীবনের অপর নাম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এছাড়াও এ এলাকায় খাদ্যশস্যের মাঠে লোনা পানি প্রবেশে বাধারূপে কাজ করে এ ম্যানগ্রোভ আচ্ছাদন।
সুন্দরবনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি:
সুন্দরবনকে নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন মহলে নানা বিতর্ক চলছে। কেউ কেউ বলছেন, সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে। আবার কেউ কেউ এটাকে গুজব বলছেন। বিতর্কের শুরু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে। এটি সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে স্থাপিত হচ্ছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। সরকার এর বিপরীত অবস্থানে। তবে এক গবেষণায় উঠে এসেছে সুন্দরবনে ইতিমধ্যে অনেক প্রাণী বিলুপ্তির মধ্যে। যেমন: বনরুই, গন্ডার, চিতাবাঘ, গরিলা ইত্যাদি। বাঘের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। কিছু অসৎ মানুষ এবং জলবায়ু পরিবর্তন এর জন্য বেশি দায়ী।
মৌয়ালি :
সুন্দরবনের আশেপাশে কিছু লোকজন রয়েছে যারা সুন্দরবনে কাঠ কাটতে ও মধু সংগ্রহ করতে যায়। সুন্দরবনে যারা মধু সংগ্রহ করতে যায় তাদের বলা হয় মৌয়ালি। এরা মৌচাকের ভেতর থেকে মধু সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করে আয় উপার্জন করে।
বাওয়ালি :
সুন্দরবনে যারা কাঠ কাটে এবং সেই কাঠ বাজারে বিক্রি করে তাদেরকে বলা হয় বাওয়ালি। তারা নৌকায় করে বনের ভেতরে গিয়ে গাছ কাটে এবং কাঠ সংগ্রহ করে। পরে সেই কাঠ বাজারে বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। সুন্দরবনের বাওয়ালিরা নানা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, কারণ বনের মধ্যে বাঘসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর ভয় থাকে।
উপসংহার :
পরিশেষে বলা যায়, সম্পদে, প্রাচুর্যে ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ সুন্দরবন। সুন্দরবন আমাদের গৌরব, আমাদের সৌন্দর্য। কেবল বাংলাদেশের নয়; এটি বিশ্ববাসীরও সম্পদ। তাই ইউনেস্কো সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য ভারত ও বাংলাদেশকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আমাদের জাতীয় দায়িত্ব সুন্দরবনকে রক্ষা করা।