শ্রমের মর্যাদা রচনা (class 6,7,8,9,10)

উপস্থাপনা:

কর্মই জীবন। জীবন ও জগতে একমাত্র শ্রমের মাধ্যমেই সাফল্য আসে। শ্রমের মাধ্যমে জীবনে সাফল্যের ধারায় যে আনন্দ ও তৃপ্তি আসে, তা সত্যিই নির্মল ও অতুলনীয়। কথায় বলে – “পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।” এ জন্য শ্রমের মর্যাদাবোধ সকলের একান্ত কাম্য। ইংরেজিতে আরেকটি প্রবাদ আছে- God helps those who help themselves. অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি পরিশ্রম করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করবে না, আল্লাহও তাকে সাহায্য করবে না।”

শ্রম সম্পর্কে ধারণা:

শ্রম দু’প্রকার। শারীরিক শ্রম ও মানসিক শ্রম। আমরা অনেকেই শারীরিক শ্রমকে অমর্যাদাকর ও অসম্মানজনক মনে করি। আমাদের অনেকের ধারণা, শ্রমজীবী মানুষ যেমন চাষী, কুলি-মজুর, শ্রমিক- এরা ছোট জাতের মানুষ, কিন্তু তা ঠিক নয়। জাতীয় উন্নয়নে এদের অবদানই বেশি।

শ্রমের গুরুত্ব:

মানুষের সকল উন্নতির মূল নিয়ামক হচ্ছে শ্রম। যে যত পরিশ্রমী ভাগ্যও তার প্রতি তত বেশি প্রসন্ন। শ্রম ছাড়া উন্নতি শুধু কল্পনার বস্তু। শ্রমের দ্বারা মানুষ তার ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে। একজন মানুষ যত গরীব হয়েই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, কঠোর শ্রমসাধনার মাধ্যমে সে দেশ ও জাতির কর্ণধার হতে পারে।

মানুষ একদিকে যেমন সভ্যতার স্রষ্টা, অন্যদিকে সে আপন ভাগ্যেরও কারিগর। মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই নির্মাণ করতে পারে শ্রমের মাধ্যমে। প্রত্যেক মানুষের মাঝে প্রতিভা লুকিয়ে থাকে। মানুষ পরিশ্রমের মাধ্যমেই তার সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে।

ইসলামে শ্রমের মর্যাদা:

পবিত্র কুরআন ও হাদীসে শ্রমের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূল (স) বলেছেন, “যে মানুষ যত বেশি কর্তব্যনিষ্ঠ তার সফলতা তত বেশি হয়।” শ্রমিকের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (স) বলেছেন, “শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”

আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) পরিশ্রমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি নিজে শ্রমিকদের সাথে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। শ্রমকে উৎসাহিত করে ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করার জন্য আমাদের মহানবী (স) অনেক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

উন্নত দেশে শ্রমের মর্যাদা:

জাপান তার বার কোটি মানুষের চব্বিশ কোটি কর্মঠ হাতের দ্বারা বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমেরিকা, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, জার্মান, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের উন্নতির মূল হচ্ছে তাদের কায়িক পরিশ্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও তারা জুতা কালি করাকে কোন ছোট কাজ মনে করেন না। তাদের সবার শ্লোগান হচ্ছে, “পরিশ্রমের দ্বারা উন্নতি কর অথবা নিপাত যাও”।

আমাদের দেশে শ্রমবিমুখতা:

অপ্রিয় হলেও সত্য যে আমাদের দেশের লোক অলস এবং শ্রমবিমুখ। এছাড়া দেশের শিক্ষিত লোকেরা কায়িক শ্রমকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে। তাদের ধারণা পরিশ্রম করার জন্য কৃষক, জেলে, কুলি, মজুর ইত্যাদি লোকেরাই যথেষ্ট।

আমাদের শিক্ষিত সমাজের শ্রমবিমুখতা সম্পর্কে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একবার স্টেশনে গিয়ে দেখতে পেলেন, ট্রেন থেকে নেমে এক যুবক কুলি খোঁজ করছে। বিদ্যাসাগর তার কাছে গিয়ে কুলি খোঁজার কারণ জানতে চাইলে যুবক হাতের ছোট্ট একটা ব্যাগ দেখিয়ে তা বহনের জন্য কুলির প্রয়োজনের কথা বলে। নিতান্ত ছোট এবং হালকা ব্যাগটি ঈশ্বরচন্দ্র নিজেই কুলি সেজে বহন করে নেন। পরে যুবক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিচয় পেয়ে ক্ষমাপ্রার্থী হয়। বিদ্যাসাগর তাকে বললেন—”নিজের কাজ নিজে করাই উত্তম, শ্রমে কোনো অগৌরব নাই।”

শ্রমের জয়:

শ্রমিক সমাজ আজ বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানবিক শ্রমকে তার যোগ্য মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কালের যাত্রায় একমাত্র তারাই আজ সমাজের রথকে গতি দিতে পারে, একমাত্র তারাই পারে সমাজে কর্মমুখরতার ঢেউ আনতে। তাই আজ শ্রমের জয় বিঘোষিত হচ্ছে দিকে দিকে।

প্রাণীকূলে শ্রমের দৃষ্টান্ত:

আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ অতি তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র প্রাণী থেকেও শ্রমশীলতার অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারে। ক্ষুদ্র পিপীলিকা শীতের সঞ্চয়ের জন্য গ্রীষ্মকালে নিরলসভাবে খাদ্য সংগ্রহ করে। উইপোকা কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলে বিশাল ঢিবি। মৌমাছি মধু সংগ্রহে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে।

উপসংহার:

আধুনিক পৃথিবী কর্ম ও শ্রমমুখর। দেশে দেশে তাই শ্রমজীবী মানুষের বিজয় ঘোষিত হচ্ছে। আমাদের দেশের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য অবশ্যই শ্রমের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে হবে। শ্রম দেহকে নীরোগ ও মনকে সতেজ করে। শ্রমের যথার্থ মর্যাদা দানের মাধ্যমে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে আমাদের সকলকে সচেষ্ট হতে হবে।


Author

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment