শ্রমের মর্যাদা রচনা (১৫ পয়েন্ট)

সূচনা :

পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। শ্রম ব্যতীত সুখের আশা করা যায় না। মানবজীবনের উন্নতি-অগ্রগতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি, এমনকি অস্তিত্বও শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। ক্ষুদ্র পিপীলিকা থেকে শুরু করে মানব-মহামানব পর্যন্ত সকলকেই পরিশ্রম করতে হয়। তাই সকলকেই শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত।

শ্রমের শ্রেণিবিভাগ :

শ্রম দু’প্রকার। যথা- কায়িক শ্রম এবং মানসিক শ্রম। মানুষ যখন বাহ্যিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে পরিশ্রম করে তখন তাকে কায়িক শ্রম বলে। আবার বিভিন্ন চিন্তাভাবনার মাধ্যমে যে পরিশ্রম হয় তাকে মানসিক শ্রম বলে। আমরা অনেকেই শারীরিক শ্রমকে অমর্যাদাকর ও অসম্মানজনক মনে করি। আমাদের অনেকের ধারণা, শ্রমজীবী মানুষ যেমন চাষী, কুলি-মজুর, শ্রমিক- এরা ছোট জাতের মানুষ, কিন্তু তা ঠিক নয়। জাতীয় উন্নয়নে এদের অবদানই বেশি।

শ্রমের প্রয়োজনীয়তা :

মানবজীবন সংগ্রামময়। কেবল শ্রম দ্বারাই মানুষ তার জীবনের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-দারিদ্র্যকে জয় করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। পার্থিব জীবনে মানুষ হিসেবে মর্যাদা নিয়ে সাফল্যজনকভাবে বাঁচতে হলে প্রয়োজন কঠোর শ্রম সাধনা। কেউ কারো অন্নের সংস্থান করে দেবে না। নিজের অন্ন নিজেকেই জোটাতে হয়। এজন্য বেঁচে থাকার তাগিদে পরিশ্রম করতে হবে।

ছাত্রজীবনে শ্রম :

আমাদের ছাত্রজীবনের শ্রমের গুরুত্ব কম নয়। নিয়মিত অনুশীলন ও জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে একজন ছাত্রের মানসিক উৎকর্ষ লাভ হয়। একজন বৈজ্ঞানিককে হয়তো সারাদিন গবেষণাগারেই কাটিয়ে দিতে হয়। একজন কবিকে তার কল্পনার কথা সারারাত জেগে লিখতে হয়। একজন দার্শনিককে অসম্ভব পড়াশোনা করতে হয় এবং তার চিন্তাধারাকে লিপিবদ্ধ করতে হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমের গুরুত্ব :

পবিত্র কুরআন ও হাদীসে শ্রমের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসূল (স) বলেছেন, “যে মানুষ যত বেশি কর্তব্যনিষ্ঠ তার সফলতা তত বেশি হয়।” মহানবী (স) শৈশবকাল থেকেই শ্রমপ্রিয় ছিলেন। শ্রমিকের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (স) বলেছেন, “শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”

ভাগ্য নির্মাণ ও প্রতিভা বিকাশে পরিশ্রম :

মানুষ একদিকে যেমন সভ্যতার স্রষ্টা, অন্যদিকে সে আপন ভাগ্যেরও কারিগর। মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই নির্মাণ করতে পারে শ্রমের মাধ্যমে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে- God helps those who help themselves. অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি পরিশ্রম করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করবে না, আল্লাহও তাকে সাহায্য করবে না।” প্রত্যেক মানুষের মাঝে প্রতিভা লুকিয়ে থাকে। মানুষ পরিশ্রমের মাধ্যমেই তার সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে।

ব্যক্তিগত শ্রম ও জাতীয় উন্নয়ন :

ব্যক্তির উন্নয়নের ওপর জাতীয় উন্নয়ন নির্ভরশীল। আবার ব্যক্তির উন্নয়ন পরিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল। শ্রমবিমুখ ব্যক্তি জাতির বোঝা। অলস ব্যক্তি নিজে যেমন সমস্যায় জর্জরিত থাকে, তেমনি জাতীয় উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত করে। তাই ব্যক্তি, জাতি ও শ্রম একসূত্রে গাঁথা। প্রত্যেক নাগরিক পরিশ্রমী ও কর্মঠ হলে ব্যক্তির পাশাপাশি দেশও দ্রুত উন্নতি লাভ করবে।

শ্রম ও সভ্যতা :

পরিশ্রম শুধু সৌভাগ্যের নিয়ন্ত্রক নয়; বরং সভ্যতা বিকাশেরও সহায়ক। মানব সভ্যতার উন্নতি অগ্রগতিতে শ্রমের অবদান অনস্বীকার্য। যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি সভ্য। শ্রমই পাহাড় ভেঙে রাস্তা তৈরি করে, বন কেটে তৈরি করে বসতি। শ্রম গরিবকে ধনী, অসভ্য বর্বর জাতিকে রূপান্তরিত করে সভ্য জাতিতে।

শ্রম ও স্বাস্থ্য :

পরিশ্রম করলে শরীর সুস্থ ও সবল থাকে এবং নানারকম রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়। পরিশ্রম না করলে শরীর সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়াম করতে হয়, আর ব্যায়াম হলো এক ধরনের কৃত্রিম শ্রম। তাই নিয়মিত ও পরিমিত পরিশ্রম করলে আলাদাভাবে ব্যায়াম করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যায়।

মানসিক উন্নতিতে শ্রম :

কথায় বলে, “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।” পরিশ্রমী মানুষ সর্বদা নিজের কাজের চিন্তায় থাকে। ফলে তার মাথা নানা রকম কুচিন্তা থেকে মুক্ত থাকে। তাছাড়া পরিশ্রমের ফলে শরীর ভালো থাকে। আর শরীর ভালো থাকলে মনও ভালো থাকে।

উন্নত দেশে শ্রমের মর্যাদা :

আমেরিকা, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, জার্মান, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের উন্নতির মূল হচ্ছে তাদের কায়িক পরিশ্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও তারা জুতা কালি করাকে কোন ছোট কাজ মনে করেন না। তাদের সবার শ্লোগান হচ্ছে, “পরিশ্রমের দ্বারা উন্নতি কর অথবা নিপাত যাও”।

আমাদের দেশে শ্রমবিমুখতা :

অপ্রিয় হলেও সত্য যে আমাদের দেশের লোক অলস এবং শ্রমবিমুখ। দেশের শিক্ষিত লোকেরা কায়িক শ্রমকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে। তাদের ধারণা পরিশ্রম করার জন্য কৃষক, জেলে, কুলি, মজুর ইত্যাদি লোকেরাই যথেষ্ট।

আমাদের শিক্ষিত সমাজের শ্রমবিমুখতা সম্পর্কে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একবার স্টেশনে গিয়ে দেখতে পেলেন, ট্রেন থেকে নেমে এক যুবক কুলি খোঁজ করছে। বিদ্যাসাগর তার কাছে গিয়ে কুলি খোঁজার কারণ জানতে চাইলে যুবক হাতের ছোট্ট একটা ব্যাগ দেখিয়ে তা বহনের জন্য কুলির প্রয়োজনের কথা বলে। নিতান্ত ছোট এবং হালকা ব্যাগটি ঈশ্বরচন্দ্র নিজেই কুলি সেজে বহন করে নেন। পরে যুবক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিচয় পেয়ে ক্ষমাপ্রার্থী হয়। বিদ্যাসাগর তাকে বললেন—”নিজের কাজ নিজে করাই উত্তম, শ্রমে কোনো অগৌরব নাই।”

প্রাণীকূলে শ্রমের দৃষ্টান্ত :

আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ অতি তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র প্রাণী থেকেও শ্রমশীলতার অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারে। ক্ষুদ্র পিপীলিকা শীতের সঞ্চয়ের জন্য গ্রীষ্মকালে নিরলসভাবে খাদ্য সংগ্রহ করে। উইপোকা কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলে বিশাল ঢিবি। মৌমাছি মধু সংগ্রহে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে।

শ্রমের জয় :

শ্রমিক সমাজ আজ বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানবিক শ্রমকে তার যোগ্য মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কালের যাত্রায় একমাত্র তারাই আজ সমাজের রথকে গতি দিতে পারে, একমাত্র তারাই পারে সমাজে কর্মমুখরতার ঢেউ আনতে। তাই আজ শ্রমের জয় বিঘোষিত হচ্ছে দিকে দিকে।

উপসংহার :

জীবনের সর্বক্ষেত্রে শ্রমের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিশ্রম না করে পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকায় কোনো মর্যাদা নেই। সত্যিকার অর্থে পরিশ্রমেই জীবনের প্রকৃত আনন্দ। বৃথা আভিজাত্যের ভাব পরিত্যাগ করে সকল পরিশ্রমকে মর্যাদার বস্তু বলে গণ্য করতে হবে। কোনো কাজই অগৌরবের নয়- এ শিক্ষা সকলকে গ্রহণ করে পরিশ্রমী হতে হবে। তবেই আমরা বিশ্বের দরবারে সভ্য জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।


Author

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment