পবিত্র কুরআন ও হাদিসের ভাষাকে নস (نَصٌّ) বলা হয়। نَصٌّ-এর চাহিদা ও মর্মার্থের ওপর ভিত্তি করেই মুজতাহিদগণ গবেষণামূলক তত্ত্ব উদঘাটন করে শরয়ী আহকাম নির্ণয় করে থাকেন। এ نَصٌّ-এর সুনির্দিষ্ট প্রকারভেদও রয়েছে। ইসলামী শরিয়ার বিভিন্ন মাসয়ালা উদ্ভাবনের নিগূঢ় তত্ত্ব জানতে হলে نَصٌّ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা একান্ত আবশ্যক।
নস অর্থ কি ?
আভিধানিক অর্থ: نَصٌّ শব্দটি বাবে نَصَرَ-এর মাসদার। এটা একবচন, বহুবচন نُصُوْصٌ। এর আভিধানিক অর্থ হলো—
- التَّعِيِّيْنُ তথা নির্দিষ্ট করা।
- التَّحْدِيْدُ তথা সীমা বর্ণনা করা।
- الرَّفْعُ তথা উত্তোলন করা।
- الْإِظْهَارُ তথা প্রকাশ করা।
- الْمُنْتَهَى তথা প্রান্তসীমা।
নস কাকে বলে ?
১. উসূলুশ শাশি গ্রন্থকার বলেন—
النَّصُّ مَا سِيْقَ الْكَلَامُ لِأَجْلِهِ
অর্থাৎ, نَصٌّ ঐ বস্তুকে বলা হয়, যাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলা হয়েছে।
২. আল মানার প্রণেতা বলেন—
نَصٌّ বলা হয় এমন বাক্যকে, যা শব্দের কারণে নয়; বরং শুধু বক্তার নিকট হতে প্রাপ্ত অর্থের ভিত্তিতেই ظَاهِرٌ অপেক্ষা অধিকতর সুস্পষ্ট হয়ে থাকে।
নস এর উদাহরণ:
আল্লাহ তায়ালার বাণী— أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا অর্থাৎ, “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” আলোচ্য আয়াতটি যেরূপ ظَاهِرٌ-সেরূপ নস ও বটে। কেননা আয়াতটি দ্বারা কাফেরদের দাবি إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا
(বেচাকেনা সুদের মতো)-কে খণ্ডন করা হয়েছে। সুতরাং এটা نَصٌّ।
আরও জানুন : সরীহ ও কেনায়া কাকে বলে? অর্থ, হুকুম ও উদাহরণ বিস্তারিত
নস এর প্রকারভেদ :
উসূলশাস্ত্রবিদগণ نَصٌّ-কে চারভাগে ভাগ করেছেন। যেমন—
১. عِبَارَةُ النَّصِّ
২. إِشَارَةُ النَّصِّ
৩. دَلَالَةُ النَّصِّ
৪. اقْتِضَاءُ النَّصِّ
১. عِبَارَةُ النَّصِّ-এর পরিচয়: عِبَارَةُ النَّصِّ-এর অর্থ হলো— প্রত্যক্ষ মূল বক্তব্য। এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় আল্লামা নিযামুদ্দীন শাশী (র.) বলেন—যে উদ্দেশ্যে কোনো বক্তব্য নেয়া হয়েছে, তার সে উদ্দেশ্য বর্ণনা করাকে عِبَارَةُ النَّصِّ বলে।
উদাহরণ: আল্লাহ তায়ালার বাণী— وَعَلَى الْمَوْلُوْدِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ আয়াতটি তালাক প্রাপ্তাকে জীবিকা ও বস্ত্রপ্রদান করা স্বামীদের ওপর ওয়াজিব, এ কথা বোঝানোর জন্য নেয়া হয়েছে। সুতরাং এ উদ্দেশ্যে আয়াতটি عِبَارَةُ النَّصِّ।
২. إِشَارَةُ النَّصِّ-এর পরিচয়: إِشَارَةُ النَّصِّ-এর শাব্দিক অর্থ— ইঙ্গিতসূচক বক্তব্য। এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় উসূলুশ শাশি গ্রন্থকার বলেন—
ইশারাতুন নস বলা হয়, যা نَصٌّ-এর সাহায্যে কোনো প্রকার প্রবৃদ্ধি সাধন ব্যতীত সাব্যস্ত হয় ও সার্বিকভাবে এটা অস্পষ্ট থাকে এবং বক্তার উক্তির জন্য বাক্যটি প্রয়োগও করা হয়নি।
উদাহরণ: আল্লাহ তায়ালার বাণী— لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِيْنَ الَّذِيْنَ أُخْرِجُوْا مِنْ دِيَارِهِمُ الْآيَةَ আয়াতটি ফিকর মুহাজিরদের জন্য গনিমতের মালে অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বর্ণিত। তবে এখানে النَّصِّ إِشَارَةُ দ্বারা মুহাজিরদের দরিদ্রতা ও তাদের পরিত্যক্ত মালে কাফেরদের মালিকানা সাব্যস্ত হয়।
আরও জানুন : আমর (أَمْر) কাকে বলে? অর্থ, হুকুম ও কয়টি অর্থে ব্যবহার হয়
৩. دَلَالَةُ النَّصِّ-এর পরিচয়: دَلَالَةُ النَّصِّ-এর শাব্দিক অর্থ— নির্দেশসূচক বক্তব্য। এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—
دَلَالَةُ النَّصِّ বলা হয়, যার সাহায্যে مَنْصُوْصٌ عَلَيْهِ -এর হুকুমের কারণ শাব্দিক দৃষ্টিতে অবগত হওয়া যায়, ইজতিহাদ কিংবা اسْتِنْبَاطٌ-এর দৃষ্টিতে নয়।
উদাহরণ: মহান আল্লাহর বাণী— وَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا আলোচ্য আয়াতে “মাতাপিতাকে ‘উহ’ বলা থেকে বিরত থাক” এর অর্থ হলো তাদেরকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাক। কাজেই এটা دَلَالَةُ النَّصِّ এ আয়াতের ভিত্তিতে তাদেরকে মারা হারাম সাব্যস্ত হয়েছে।
৪. اقْتِضَاءُ النَّصِّ-এর পরিচয়: اقْتِضَاءُ النَّصِّ-এর শাব্দিক অর্থ— কামনাসূচক বক্তব্য। এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—
اقْتِضَاءُ النَّصِّ বলতে نَصٌّ-এর উপর বর্ধিত ঐ অংশকে বোঝায়, যা ছাড়া نَصٌّ-এর অর্থ সাব্যস্ত হয় না।
উদাহরণ: আল্লাহ তায়ালার বাণী— فَتَحْرِيْرُ رَقَبَةٍ (তাহলে গোলাম আযাদ করতে হবে) আয়াতটি কাফফারার ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে। এর দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, স্বীয় মালিকানাধীন গোলাম মুক্ত করতে হবে। কেননা تَحْرِيْرٌ শব্দটি মালিকানার দাবিদার; যদিও মালিকানার কথা উল্লেখ নেই।
সর্বশেষ : نَصٌّ উসূলে ফিকহশাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। কুরআনুল কারিমের আয়াত, মর্মার্থ, নীতিমালা ইত্যাদি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে نَصٌّ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।