হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা কিতাবের বৈশিষ্ট্য

প্রত্যেক মনীষী কম বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু সকলের গ্রন্থ আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও যুগশ্রেষ্ঠ হয় কি? হ্যাঁ, হিসেবে আল্লামা শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (র.) রচিত ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ গ্রন্থটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী অদ্বিতীয় ও যুগশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। আসরারুশ শরিয়াহ-এর ওপর লিখিত এটি একটি অমূল্য কিতাব।

‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যাবলি:

বিশ্ব নন্দিত আলেমে দীন, সমাজ সংস্কারক অদ্বিতীয় জ্ঞানতাপস আল্লামা শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (র.) রচিত ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ একটি অমূল্য ও তুলনাহীন কিতাব। এ কিতাবের বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো—

১. পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায় আসরারুশ শারিয়াহ-এর বর্ণনা দান: শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলভি (র.) স্বীয় গ্রন্থে আসরারুশ শরিয়াহ তথা শরিয়তের রহস্যাবলি পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা করেছেন। শরিয়তের রহস্যাবলি বর্ণনার ক্ষেত্রে সত্যিই তা একটি তুলনাহীন কিতাব।

২. যুক্তির আলোকে শরয়ি বিধানের বর্ণনা: গ্রন্থকার এ গ্রন্থে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায় যুক্তির আলোকে শরিয়তের বিধানসমূহকে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। যা প্রমাণ করে যে, শরিয়তের বিধানসমূহ বিবেক ও যুক্তি বহির্ভূত নয়; বরং এর সব বিধান বিবেকসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত।

সম্পর্কিত পোস্ট : শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.)-এর জীবনী

মাওলানা মনজুর নুমানি (র.) বলেন, আমি কোনো মানুষের রচিত গ্রন্থ দ্বারা এত বেশি উপকৃত হইনি। আল্লাহর ইচ্ছায় যে উপকার লাভ করেছি হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা হতে। এ গ্রন্থ হতে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার জ্ঞান লাভ করেছি। ইসলাম ধর্মের অনেক বিষয়ের আমি অন্ধ অনুকরণ করতাম, কিন্তু এ গ্রন্থ পাঠের পর আমার ইয়াকিন ও বাস্তবসম্মত জ্ঞান অর্জিত হয়েছে।

— রহমতুল্লাহিল ওয়াসেয়া, মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরি। খণ্ড: ১ম, পৃ. ২৮

৩. সমাজ সংস্কারমূলক গ্রন্থ: ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ শুধু শরীয়তের আসরার বর্ণনামূলক গ্রন্থ নয়; বরং এটি একটি সমাজ সংস্কারমূলক গ্রন্থ। গ্রন্থাগার স্বীয় গ্রন্থে মুসলমানদের থেকে অপসংস্কৃতি দূর করার নিমিত্তে নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

৪. ভ্রান্ত আকিদা দূরীকরণ: আকিদা ইসলামের মূল বিষয়। ইসলামের সব আমল আকিদার ওপর নির্ভরশীল। আকিদা ঠিক ও বিশুদ্ধ না হলে আমলের কোনো গুরুত্ব নেই। তাই গ্রন্থকার আকিদাকে ত্রুটিমুক্ত রাখার লক্ষ্যে যুক্তির আলোকে কোনো গুরুত্ব নেই। তাই আলোচনা ইসলামের সঠিক আকিদা-বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেছেন।

৫. উন্নত সাহিত্যেরসে পরিপূর্ণ: এ গ্রন্থটি ভাষাগত সৌন্দর্যে একটি উন্নত সাহিত্য সমলিত গ্রন্থ। শায়খ আবু মুহাম্মদ আবুল হক হাক্কানি হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার অনুবাদের ভূমিকায় বলেছেন, কিতাবের ভাষা উন্নত, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাকে অনুবাদ গ্রন্থ হিসেবে এ কিতাবকে যদি মাকামাতে হারিরির পরিবর্তে নির্ণয় করা হয়, তবে যথার্থ হবে।

৬. একটি মুজিযা: ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ একটি সাধারণ গ্রন্থ নয়; বরং একটি মুজিযা। আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি (র.) বলেন, এ গ্রন্থটি মহানবী (স.)-এর সব মুজিযার একটি, যা তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর উম্মতের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। যার দ্বারা মহানবী (স.)-এর স্বকীয়তা এবং আল্লাহ তায়ালার একক সত্তা প্রমানের পূর্ণতা অর্জিত হয়। অতএব, এ কিতাবের মর্যাদা অন্যান্য কিতাব থেকে স্বতন্ত্র — রহমতুল্লাহিল ওয়াসেয়া।

৭. ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ দীন হিসেবে উপস্থাপন: এটি দুখণ্ডে বিভক্ত। গ্রন্থকার প্রথম খণ্ডে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে এবং রাষ্ট্রনীতি, সমরনীতি, অর্থনীতি, ইবাদতের রহস্যাবলি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। আর দ্বিতীয় খণ্ডে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রুজি রোজগার উপার্জনের বিভিন্ন দিক, লেনদেন, রাষ্ট্রনীতি, সমরনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেছেন। সর্বদিক বিবেচনায় গ্রন্থকার ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ দীন হিসেবে উপস্থাপন করতে প্রয়াস পেয়েছেন। সুতরাং এটি একটি তুলনাহীন কিতাব।

৮. শিরক-বিদআতের মূলোৎপাটন: পুত:পবিত্র ইসলাম ধর্মের অসুন্দর ও ধ্বংসকারী বিষয় হলো শিরক-বিদআত। এগুলো ইসলামের মধ্যে এমনভাবে ঢুকে পড়েছে যে, তা চিহ্নিত করা কষ্টকর। গ্রন্থকার শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (র.) এ গ্রন্থে শিরক ও বিদআতের মূলোৎপাটন করে ইসলামের পবিত্র ও নির্মল শিক্ষাকে তুলে ধরেছেন। তাছাড়া শিরক যে মারাত্মক ব্যাধি তা পাঠকের সামনে পরিষ্কারভাবে আলোচনা করেছেন।

৯. কল্যাণের প্রতি দিকনির্দেশনা: কোন কোন কাজে এবং কী ধরনের কাজে মুসলমানদের কল্যাণ সাধিত হবে সেসব দিক ও বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এ গ্রন্থে। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় গ্রন্থটি তুলনাহীন।

১০. দার্শনিক ধাঁচে রচিত: এ গ্রন্থটি দর্শনশাস্ত্রের রচিত গ্রন্থাবলির মাঝে একটি উঁচু মানের কিতাব। ফলে সর্ববিষয়ের দার্শনিক চিন্তাধারা এতে ফুটে উঠেছে।

১১. উন্নত ভাষা: ভাষাগত দিক থেকে ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ এমন একটি গ্রন্থ যা আরবি ভাষাবিদদেরকে অবাক করে দিয়েছে। একজন অনারব এতো সুন্দর উন্নত আরবি ভাষা জানে তারা তা বিশ্বাস করতে পারে না। ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে এটি একটি মহান কিতাব।

১২. ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ: গ্রন্থকার যুক্তির আলোকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে প্রয়াস করেছেন। তিনি যুক্তির আলোকে প্রমাণ করেছেন যে, ইসলামের প্রতিটি কাজে কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। আর ইসলামের প্রতিটি কাজই বিবেক সম্মত। আর এতে করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।

১৩. ফিকহশাস্ত্রের রহস্যাবৃত বিষয়ের বিবরণ: এ গ্রন্থে ফিকহশাস্ত্রের এমন কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছে, যা অন্য কোনো কিতাবে অনুসন্ধান করে পাওয়া যাবে না।

১৪. অতীব প্রয়োজনীয় পার্থিব বিষয়ের সংশোধনমূলক বিবরণ: এ গ্রন্থে পার্থিব কল্যাণমূলক নানা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবিকা অর্জনের হালাল পন্থা, নিষিদ্ধ ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি পার্থিব লেনদেন প্রসঙ্গে সুনিপুণ বর্ণনা স্থান পেয়েছে।

১৫. দুর্লভ শব্দ প্রয়োগ: গ্রন্থকার স্বীয় গ্রন্থে এমন কতিপয় শব্দ ব্যবহার করেছেন যা তার কিতাবের মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে। যেমন— مَلَكِيَّةٌ، مَلَأُ الْأَعْلَى، حَظِيْرَةُ الْقُدْسِ ইত্যাদি।

১৬. মাকাসিদুশ শরিয়াহ-এর বর্ণনা: গ্রন্থকার স্বীয় গ্রন্থে আসরারুশ শরিয়াহ-এর সাথে সাথে মাকাসিদুশ শরিয়াহও বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন—

١. إِنَّ الصَّلَاةَ شُرِعَتْ لِذِكْرِ اللهِ وَمُنَاجَاتِهِ كَمَا قَالَ تَعَالَى: أَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِيْ
٢. وَإِنَّ الْحَجَّ شُرِعَ لِتَعْظِيْمِ شَعَائِرِ اللهِ
٣. إِنَّ الْقِصَاصَ شُرِعَ زَاجِرًا عَنِ الْقَتْلِ
٤. إِنَّ الْجِهَادَ شُرِعَ لِإِعْلَاءِ كَلِمَةِ اللهِ وَإِزَالَةِ الْفِتْنَةِ

১৭. একত্ববাদের বিবরণ: এ গ্রন্থে যুক্তির মাধ্যমে তাওহিদ বা একত্ববাদের দৃঢ়ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। একত্ববাদ প্রসঙ্গে এতো সুন্দর বর্ণনা খুব কম সংখ্যক গ্রন্থেই পাওয়া যায়।

শিক্ষাগার

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে লাখো শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment