মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার রচনা ৩০ পয়েন্ট। SSC/HSC

পোস্ট সূচিপত্র সমূহ

ভূমিকা :

মাদকাসক্তি আমাদের সমাজের ভয়াবহ একটি সমস্যা। অবশ্য একে শুধু সমস্যা না বলে বড় সংকটও বলা যায়। কারণ কিছু কিছু পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে একজন মানুষ নিজেকে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। তবে এর ব্যতিক্রমও লক্ষ করা যায়। একটি জাতির উন্নয়নের ধারাকে গতিশীল করে তরুণ সমাজ। কিন্তু মাদক তরুণ সমাজের সেই অদম্য কর্মপ্রেরণাকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে সে নিজেকে যেমন ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়, তেমনি দেশকেও মহাবিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেয়। এই তরুণরাই তখন হয়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে বিপথগামী সম্প্রদায়।

মাদকাসক্তি :

মাদকাসক্তি শব্দটি ভাঙলে পাওয়া যায় ‘মাদক’ ও ‘আসক্তি’। মাদক হলো নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্য আর ‘আসক্তি’ বলতে বোঝায় কোনো কিছুর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত টান বা আকর্ষণ। মাদকদ্রব্য সেবনে মানবদেহে সংবেদন হ্রাস পায় এবং বেদনাবোধ বন্ধ হয়ে যায়। মাদকদ্রব্য একবার সেবন করা শুরু করলে তা আর সহজে ছাড়া যায় না। এর পরিণামে ব্যক্তি প্রতিনিয়ত মাদক সেবন করতে থাকে এবং হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত।

মাদকের আদি উৎস:

মাদক ও এর নেশার ইতিহাস বেশ প্রাচীন হলেও তার একটা সীমারেখা ছিল। মদ, গাঁজা, আফিম, চরস বা তামাকের কথা বহু আগে থেকেই মানবসমাজে প্রচলিত ছিল। উনিশ শতকের মধ্যভাগে বেদনানাশক ওষুধ হিসেবে মাদকের ব্যবহার শুরু হয়- যাকে ইংরেজিতে ড্রাগ বলা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সৈনিকদের ব্যথার উপশম হিসেবে ড্রাগের ব্যবহার হলেও হতাশা কাটাতেও তারা ড্রাগ ব্যবহার করত। এরপর থেকেই কলম্বিয়া, বলিভিয়া, ব্রাজিল, ইকুয়েডর ইত্যাদি দেশে নেশার দ্রব্য হিসেবে ব্যাপকভাবে ড্রাগের ব্যবহার শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে তা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

মাদকদ্রব্য সমূহ :

মাদকদ্রব্য হচ্ছে সেসব বস্তু যা গ্রহণের ফলে স্নায়ুবিক বৈকল্যসহ নেশার সৃষ্টি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব মাদকদ্রব্যের প্রচলন রয়েছে সেগুলোর মধ্যে গাঁজা, আফিম, ভাং, চরস, মরফিন, মারিজুয়ানা, মদ, কোকেন, প্যাথেড্রিন, হেরোইন, তামাক, ফেনসিডিল, বিয়ার, তাড়ি, অ্যালকোহল, বোডেন, এল এস ডি, হাশিস, পপি, ইয়াবা, ক্যানাবিস ইত্যাদি প্রধান। তবে আমাদের দেশে বর্তমানে গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, বিয়ার ইত্যাদি প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। মাদকদ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলো আফিম। আফিম থেকেই বিশেষ প্রক্রিয়ায় হেরোইন তৈরি হয়।

মাদক চোরাচালান :

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানাভাবে মাদক চোরাচালান হয়। সীমান্তে স্থল বা জলপথে এবং আকাশ পথে বিশ্বব্যাপী এক বৃহৎ চোরাচালান নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে যার পেছনে রয়েছে বিরাট এক সিন্ডিকেট। কিছুকাল আগেও মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের ‘স্বর্ণভূমি’ বা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল’। তবে ভিয়েতনামে সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এই নেটওয়ার্ক ভেঙে যায়। এর কিছুদিন পরেই চোরাচালানকারীরা ইরান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান নিয়ে গড়ে তোলে ড্রাগ পাচারের নতুন ভিত্তিভূমি ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’।

মাদকদ্রব্যের ব্যবহার:

মানুষ নিজেকে অপ্রকৃতিস্থ করতে মাদকদ্রব্য ব্যবহার করে। মাদকের ব্যবহার করে সে কল্পনার এক জগতে কিছুসময়ের জন্য বিচরণ করে। এক্ষেত্রে মাদক ব্যবহারকারীরা নানা ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করে যেমন: ধূমপান, ইনহেল বা শ্বাসের মাধ্যমে, জিহ্বার নিচে গ্রহণের মাধ্যমে, সরাসরি সেবনের মাধ্যমে, স্কিন পপিং ও মেইন লাইনিং-এর মাধ্যমে। তবে যেভাবেই গ্রহণ করুক না কেন তাদের উদ্দেশ্য একটাই- নেশায় উন্মত্ত হওয়া। প্রথমে কৌতূহলের বশে অনেকেই নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে। কিন্তু আস্তে আস্তে তাতে অভ্যস্থ হয়ে ভয়াবহ এক সর্বনাশের পথে এগিয়ে যায়।

মাদকাসক্তির কারণ :

মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ ব্যক্তিজীবনের হতাশা। মানুষ যখন জীবন সম্পর্কে অনেক বেশি হতাশ হয়ে পড়ে, তখন সে মাদকদ্রব্যের আশ্রয় নেয়। হতাশা সাধারণ তরুণদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়, তাই তাদের মাদক গ্রহণের হারও অনেক বেশি। তাছাড়া অসৎ সঙ্গে লিপ্ত হয়েও অনেকেই মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। যেসব পরিবারে পারিবারিক অশান্তি অনেক বেশি সে পরিবারের ছেলেমেয়েদের জীবন বিশৃঙ্খল হতে থাকে। তারা এই বিশৃঙ্খলা থেকে ধীরে ধীরে মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং পরিণামে অনেক ভয়াবহ ঘটনা ঘটায়। বেশির ভাগ ঘটনায় হয় বন্ধু-বান্ধব বা সহপাঠী কিংবা পারিবারিক অশান্তিই মূল কারণ হিসেবে দেখা যায়।

বাংলাদেশে মাদকের আগ্রাসন:

আমাদের দেশে মাদকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করা এই মাদক আমাদের যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। মায়ানমার থেকে অবাধে এ দেশে প্রবেশ করছে ইয়াবা-যাতে আক্রান্ত হয়েছে বহু তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতী। দর্শনার ‘কেরু এন্ড কোম্পানি’ এদেশের একমাত্র লাইসেন্সধারী মদ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান- কিন্তু তার বাইরে বহু বিদেশি কোম্পানির মদ অবৈধভাবে অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া গাঁজা ও আফিমের মতো মাদকদ্রব্য প্রায় উন্মুক্ত ভাবে দেশের সর্বত্রই বিক্রি হচ্ছে এবং মাদকসেবীরা তা অবাধে ক্রয়ও করছে।

মাদকাসক্তির কুফল :

মাদকাসক্তির কুফল বহুমুখী। শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ক্ষতির পাশাপাশি এর গভীর প্রভাব আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি সবকিছুর ওপরই পড়ে। অত্যন্ত উচ্চমূল্যে মাদকদ্রব্য ক্রয় করে মাদকাসক্ত ব্যক্তি সংসার, সমাজ এবং দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। অর্থের অভাবে সে অন্যায়-দুর্নীতির পথ বেছে নিতেও দ্বিধা করে না । বস্তুত, মাদকাসক্তির কারণে দেশের তরুণ সমাজ তিলে তিলে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায় এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও অগ্রগতি সবকিছু মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে ।

মাদকাসক্তির পরিণাম :

মাদকাসক্তির পরিণাম নিশ্চিত মৃত্যু। তবে সেই মৃত্যুর পথে রয়েছে অসহ্য নারকীয় যন্ত্রণার ভয়াবহতা। সেই মৃত্যু সহজ নয়। মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে মস্তিস্কের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। ফলে তিলে তিলে মাদকদ্রব্য সেবনকারীর স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়ে সমস্ত স্নায়ুতন্ত্র অসুস্থ হয়ে পড়ে। কর্মক্ষমতা লোপ পেয়ে মানুষ পরিণত হয় জড় মাংসপিণ্ডে। জীবস্মৃত অবস্থায় কিছুকাল বেঁচে থেকে একসময় অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

বিশ্বব্যাপী মাদকবিরোধী তৎপরতা:

অবৈধ মাদক কারবারিদের প্রতিরোধকল্পে সারাবিশ্বে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন আন্দোলন। ১৯৮৭ সালে ২৩টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মাদকবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইরান প্রভৃতি দেশে মাদক চোরাচালানের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ব্রাজিল ও কলম্বিয়ায় মাদক উৎপাদক ও চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশেও ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ নামে একটি বিভাগ কাজ করছে।

পৃথিবী ও বাংলাদেশে মাদকাসক্ত লোকসংখ্যা:

পৃথিবীর শতাধিক দেশের ৫০ থেকে ৬০ কোটি মানুষ মাদকে আসক্ত বলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছে। ৩৬টি দেশে অধিক ক্ষতিকর মাদক উৎপাদন করা হলেও এর স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শতাধিক দেশকে মাদকের লীলা ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক এক সরকারি জরিপে জানা গেছে যে, সমগ্র দেশে ১৭ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি। প্যাথেড্রিন আসক্তদের মধ্যে বেশি হচ্ছে মহিলার সংখ্যা।

বিভিন্ন ধরনের ড্রাগের কবলে বাংলাদেশ:

ড্রাগের উৎপাদন বাড়ছে দ্রুত গতিতে। এবার তো বাজার দরকার। এই বাজারের অন্যতম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর থেকে বাংলাদেশে এই নেশা ব্যাপকভাবে ছড়াতে শুরু করেছিল। গাঁজা, চরস, হাসিস, হেরোইন, কোকেন, হেম্প, ব্রাউনসুগার, ওপিয়াম ডেরিভেটিস ইত্যাদি মাদকদ্রব্যে ছেয়ে গেছে দেশ। কৌতূহলের বশবর্তী হয়েও যারা এ নেশার কবলে একবার প্রবেশ করেছে, তারা হয়েছে নরকের কারাগারে বন্দী।

মাদকাসক্ত হবার প্রাথমিক লক্ষণ :

মাদকাসক্ত হবার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। ড্রাগে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের আচার আচরণের মধ্যে একটা খাপছাড়া ভাব পরিলক্ষিত হয়। চেহারাও হয়ে যায় রুক্ষ। খিদে না পাওয়া এবং দ্রুত ওজন হ্রাস এ আসক্তির প্রাথমিক লক্ষণ। দেখা যায়, তারা যখন তখন নিজের ঘরে ফিরে আসছে। সেই সঙ্গে বইপত্র, খাতা-কলম ও অন্যান্য দ্রব্য হারিয়ে ফেলা, পায়খানা বা বাথরুমে বেশি সময় কাটানো, চোখের তারা ছোট হয়ে যাওয়া, এমন কি চুরির অভ্যাসও দেখা যায়। এ সময় থেকেই অভিভাবকদের সাবধান হওয়া উচিত।

মাদকের ক্ষতিকর দিক:

মাদকাসক্তি দেহে নানা রকম ক্ষতি করে। দেহের শক্তি কমে অক্ষমতা বেড়ে যায়। মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সমাজের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক কাজকর্ম করার মনোবল থাকে না। পরিণাম ব্যর্থতার গ্লানি তাকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দেয়। এভাবে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক চোরাচালানিচক্র এদেশের যুবসমাজকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে। মাদকদ্রব্যের দাম বেশি হওয়ায় যুবকরা ছিনতাই, ডাকাতিসহ বহুবিধ সামাজিক অপকর্মে জড়িত হচ্ছে।

মাদকাসক্তি ও যুবসমাজ:

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আঠারো বছর বয়সের বন্দনা করেছেন, নজরুল ইসলাম যৌবনের গুণগান করেছেন, সেই যুবসমাজ আজ নেশায় মত্ত। ভাবতেই অবাক লাগে, এইভাবে দেশ ও জাতি পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। এই যুবসমাজকে আগামীদিনের দেশের কাণ্ডারীরূপে গড়ে উঠতে হলে মাদকাসক্তি ত্যাগ করতে হবে।

মাদকাসক্তির ফলে নৈতিক অবক্ষয় :

মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে বহুলোকের বিশেষত তরুণ সমাজের ধ্বংস নেমে আসছে, শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের। এর ফলে তরুণ সমাজ অধঃপতনের নিম্নসীমায় পৌঁছে যাচ্ছে।

মাদকাসক্তির সামাজিক কুফল:

মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে ব্যক্তিজীবন; পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তির প্রভাবে যুবক শ্রেণি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, উচ্ছৃঙ্খলা এবং নানারূপ অত্যাচার-অনাচারের আশ্রয় নেয়। মাদকদ্রব্য ব্যক্তিকে নেশাগ্রস্ত করে তার ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে, সদগুণ ও শুভ চৈতন্যকে নষ্ট করে দেয়। জীবনের প্রতি বেঁচে থাকার অনীহা সৃষ্টি করে। ফলে তারা যা ইচ্ছা তাই করে।

মাদকাসক্তির কারণে দৈহিক ক্ষতি:

মাদকদ্রব্য দেহের নানারকম ক্ষতি সাধন করে। মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে মানুষ ক্রমান্বয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে; রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়। প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়। যকৃত ও ফুসফুসের ক্ষতি, যক্ষ্মা, ক্যান্সার, জন্ডিসের মতো প্রাণনাশা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কিডনি ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে, রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়, হৃদরোগ হয়। এছাড়া চামড়া খসখসে, চুলকানি, ঘা, ফোঁড়া ইত্যাদি হয়ে অনেকসময় শরীরে পচন ধরে।

মাদকাসক্তির মানসিক কুফল :

মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে মানসিক ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি দেহের মাংসপেশির কম্পন সৃষ্টি হয়। এভাবে একসময় তারা মানসিকভাবে জড়তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তাদের অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে যায়। ফলে ভালোমন্দ জ্ঞানহীন হয়ে নৈতিকতাবিরোধী কাজে কোনো দ্বিধাবোধ তাদের থাকে না।

মাদকাসক্তির ফলে মেধার অপচয়:

মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে ব্যক্তির মেধা বিনষ্ট হয়, স্মরণশক্তি কমে যায়। নেশাগ্রস্ত লোকের ব্যক্তিত্বের অবলুপ্তি ঘটে এবং স্বাভাবিক জীবনে বেঁচে থাকার সামর্থ্য থাকে না। এদের পক্ষে কোনো গুরুদায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না।

মাদকাসক্তির কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি:

মাদকদ্রব্য ক্রয় করতে টাকার দরকার হয়। কোনো কোনো মাদকদ্রব্য অনেক মূল্য দিয়ে কিনতে হয়। এজন্য বিপুল অর্থের অপচয় হয়।

মাদকাসক্তির অন্যান্য বিশেষ কুফল:

মাদকদ্রব্য ব্যবহারের ফলে যুব সমাজের মাঝে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সামাজিকভাবে তারা হেয় প্রতিপন্ন ও অপমানজনক জীবনযাপন করে। মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে গাড়ি চালকরা গাড়ি চালালে নানা দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতার জন্য অবৈধ জমজমাট ব্যবসায় গড়ে ওঠে।

বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ ও তাদের ব্যবহারের ধরন :

বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাসবীদের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়ে এ ভয়াবহ নেশাজাত দ্রব্যের ব্যবসা ফেঁদেছে। এ ধরনের মাদক ড্রাগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-আফিম, হাসিস, হেরোইন, ইয়াবা, কোকেন, হেম্প, মারিজুয়ানা, ব্রাউন সুগার, এলএসডি, ব্ল্যাক ইত্যাদি। এসবের ব্যবহার পদ্ধতিও বিভিন্ন রকমের। কিন্তু সবকিছুকে অতিক্রম করে চলেছে ইয়াবা এবং হেরোইন। এর মাদকাসক্তিও অত্যন্ত তীব্র। এক গ্রাম হেরোইনের ষোলো ভাগের এক ভাগ দু-তিনবার ব্যবহার করলে এমন আসক্তি সৃষ্টি হবে যে, আসক্ত ব্যক্তি সহজে আর এই নেশা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে না।

বৈদেশিক সংযোগ ও মাদকদ্রব্যের প্রসার:

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রয়োজনের সীমানা বেড়ে চলেছে। আর সেই সূত্রে সমাজ ও সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বেড়ে গেছে। শিক্ষিত যুবসমাজ এলএসডি, মারিজুয়ানা, হেরোইন, কোকেন প্রভৃতি নেশাজাত দ্রব্য সম্পর্কে অবহিত হচ্ছে। আর এ কারণে জল, স্থল ও আকাশ পথে মাদকদ্রব্যের চোরাচালান জমজমাট হয়ে পড়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর, ব্রনাই, কলম্বো, কুয়ালালামপুর হয়ে কলকাতা, মুম্বাই, এলাহাবাদ এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও কাবুল পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এদের সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক।

মাদকাসক্তির প্রতিকার:

পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সচেতনার মাধ্যমে একজন মানুষকে মাদকদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখা সম্ভব। পারিবারিকভাবে একজন নারী বা পুরুষের জীবন যদি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে তাহলে তার মাদকের সংস্পর্শে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে তারা নানাভাবে মাদকদ্রব্যবিরোধী প্রচারণা চালাতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে মাদকদ্রব্য বিক্রি ও এর সঙ্গে নিয়োজিত চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সার্বিকভাবে একজন মানুষকে যদি তার নিকটাত্মীয়রা খুব ভালোভাবে পরিচর্যা করে এবং রাষ্ট্র যদি তাকে সুস্থভাবে বাঁচার পরিবেশ করে দেয় তবে খুব সহজেই মাদকাসক্তির প্রতিকার করা সম্ভব।

প্রতিকারের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ:

বর্তমানে মাদকাসক্তিকে ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে সূত্রে মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য কয়েকটি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার নিউ ইস্কাটনে অবস্থিত মুক্তি ক্লিনিকের কথা উল্লেখ করা যায়। লালমাটিয়ায় অবস্থিত দ্বীপ ক্লিনিকটিও মাদকাসক্তদের নিরাময়ের কাজ করে যাচ্ছে। মুক্তি এবং দ্বীপ ছাড়াও ধানমন্ডিতে মনোরোগ এবং বনানীতে জামান ক্লিনিকও মাদকাসক্তদের নিরাময়ের কাজে নিয়োজিত। এছাড়া অবৈধ মাদকব্যবসা এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারকে অপরাধমূলক কাজ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। এ অপরাধের শাস্তিস্বরূপ জেল, জরিমানা ছাড়াও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

ধর্মীয় দৃষ্টিতে :

ইসলামী শরীয়ত মানবতার কল্যাণে মদকে হারাম করেছে। আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য গণনার এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা তা থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। সুতরাং সকল প্রকার মাদকতা হতে আমাদের মুক্ত থাকা একান্ত কর্তব্য।

ইসলামে এর শাস্তি :

মদ পানকারীকে আল্লাহ তায়ালা কেয়ামত দিবসে যেনাকারী মহিলার যৌন পথে বের হওয়া ময়লা পান করাবেন। আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। একবার মদপান করলে আল্লাহ তায়ালা চল্লিশ দিন মদপানকারীর ইবাদত ও দোয়া কবুল করেন না। মদ পানকারী কবরে, হাশরে ও জাহান্নামে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকবে। সুকবান নেশা নামক পাহাড় হতে প্রবাহিত পুঁজ ও মাটির কণা হতে তাকে খাবার দেয়া হবে।

উপসংহার:

আমাদের যুব সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এবং আজকের ও আগামীদিনের সুস্থ, সুন্দর ও সুখকর সমাজের জন্য মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। আর এর জন্য দরকার পারিবারিক, সামাজিক ও আন্ত র্জাতিক পদক্ষেপ। সবাইকে মুক্ত কণ্ঠে বলতে হবে- ‘মাদক নয়, সুস্থ জীবন চাই, শিশুদের জন্য সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যৎ চাই।’


Author

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment