ভূমিকা:
মানুষের জীবনে আনন্দ উপভোগ করার শ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে যৌবন। আর আনন্দ উপভোগের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ভ্রমণ। ভ্রমণ আমাদেরকে দুটি বিষয়ে লাভবান করে, আনন্দ দেয় এবং মনের ও জ্ঞানের চোখ খুলে দেয়। অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার, একস্থান থেকে অন্যস্থানে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় তা ভ্রমণের আনন্দকে বাড়িয়ে দেয়।
ছাত্রজীবনের ভ্রমণের শখ :
ছাত্রজীবন মানুষের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময় পৃথিবীকে জানতে ইচ্ছে করে। এটাই যৌবনের ধর্ম। পড়াশোনার পাশাপাশি যেমন অনেকেরই উপন্যাস বা অন্যান্য বই পড়ার শখ থাকে তেমনি অনেকেরই দেশ ভ্রমণের শখ জাগে। বন্ধুদের নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, চট্টগ্রামের ফয়েজ লেক, সিলেটের জাফলং, রাঙামাটির পাহাড়ি অরণ্য, বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার ময়নামতি প্রভৃতি দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণের ইচ্ছে পূরণ করা যায় ছাত্রজীবনে। বাংলাদেশে আরো অনেক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে যেখানে ভ্রমণ করে ভ্রমণপিপাসু মনের তৃপ্তি মেটানো যায়।
ভ্রমণের পরিকল্পনা:
ভরা বর্ষায় আমরা বন্ধুরা ঠিক করলাম, নৌকা ভ্রমণের জন্য এর চেয়ে সঠিক সময় আর নেই। তাই মাত্র একদিনের ভেতর’ সবকিছুর দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম। দুইটি বড় নৌকায় আমরা আট বন্ধু যাব। সাথে অভিভাবক হিসেবে যাওয়ার কথা ঠিক হলো আমার বড় ভাইয়ার। খাবার, ওষুধ, প্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি জিনিসপত্র রাতেই গুছিয়ে রাখা হলো। সকালের উত্তেজনায় রাতে আমাদের কারোরই ঘুম আসছিল না কিন্তু জেগে থাকতে থাকতে এক সময় সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম।
যাত্রা শুরু:
ভোরে ফজরের আযানের পর ভাইয়া সবাইকে ডেকে দিয়ে নৌকার ব্যবস্থা দেখতে চলে গেলেন। খুব অল্প সময়ে তৈরি হয়ে আমরা যখন নদীর পাড়ে উপস্থিত হলাম তখন নদীর বুকে হালকা কুয়াশা আর সূর্য ঘোমটা খুলে জেগে উঠছে ধীরে ধীরে। আমরা হইহই করে নৌকায় উঠে বসলাম। যেহেতু আমরা শহরের মানুষ তাই নৌকায় চড়া বিষয়ে আমরা কিছুটা অনভ্যস্ত। নৌকার ছই, নৌকার ওপর পাটাতনের ওপর হোগলা তার ওপর আমাদের জন্য চাদর, বালিশ। নৌকার পাটাতনের নিচে মাটির চুলা। সম্ভবত মাঝিরা এখানে রান্না করে। সকাল ছয়টা নাগাদ আমরা যাত্রা শুরু করলাম।
নৌকা ভ্রমণ :
বর্ষা কালের ভরা নদীতে পানি থইথই করছে। নৌকায় চারজন করে মাঝি, প্রত্যেকেই বেশ দক্ষ, খালি গা, কোমরে গামছা। দুইটি নৌকা পাশাপাশি চলতে শুরু করল। নৌকা চলতে শুরু করলে প্রথমে গ্রামের তীর ঘেঁষে চলছিল। গ্রামের বধূরা কলসি কাঁখে পানি নিতে এসে নৌকা দেখে হাসছিল। নদীর তীরে জেলেরা তাদের মাছগুলো জাল থেকে ছাড়িয়ে হাটে নিয়ে যাচ্ছিল। কয়েকজন মহিলা থালা বাসন ধুচ্ছিল। চারদিকে যেন এক শান্ত পরিবেশ যা আমাদের শহুরে চোখে আলাদা বলেই মনে হচ্ছিল।
টু-ইন-ওয়ানে গান বাজছিল, ওরে নীল দরিয়া আমায় দেরে দে ছাড়িয়া …..।’ বড়ই দরদ দিয়ে গাওয়া গানের সুর আমাকেও ক্ষণিকের জন্য তন্ময় করে ফেলেছে। মনে হচ্ছিল আমি যেন ছায়াছবির কোনো দৃশ্য দেখছি। ততক্ষণে পালে হাওয়া লেগেছে। দূরে ছোট দোকানপাট, হাটবাজার, দালান-বাড়ি, গাছপালা দেখা যাচ্ছে। কিশোর দামাল ছেলেরা নদীর জলে মাছ ধরছে, কেউবা সাঁতার কাটছে। কেউ গৃহস্থ গরু গোসল করাচ্ছে নদীর জলে।
এক জায়গায় দেখলাম একসাথে সারিবাঁধা অনেকগুলো নৌকা। কোনো কোনোটি থেকে ধোঁয়া উঠছে, ছইয়ের উপর রোদে দেওয়া শাড়ি। মাঝিরা বলল, ওগুলো বেদে নৌকার বহর। চুপ করে বসে আমরা চারপাশের প্রকৃতি দেখছিলাম। শহরের বর্ষার সাথে গ্রামের নদীর বুকের এই ভিন্নতা আমাদের আবিষ্ট করে ফেলেছিল। বর্ষার ভরা নদীর পানির ঢেউ নৌকায় এসে ধাক্কা দিচ্ছিল।
মাথার উপরে সকালের মেঘে ঢাকা আকাশ সাথে ঝিরিঝিরি বাতাস। আকাশের সৌন্দর্য যে মানুষকে বিহবল করে ফেলতে পারে তা প্রথম জানলাম। সাদা কালো মেঘ জমাট বাঁধা তুলার মতো। দূরে উড়ে যাচ্ছে বকের সারি। মাঝে মাঝে শব্দ করে ঢেউ তুলে ছুটে যাচ্ছে লঞ্চ, স্পিডবোট। ঘণ্টা তিনেক পর আমরা একটি বাজারের গায়ে নৌকা ভিড়ালাম।
বাজারে একটি দোকানে চা খেলাম। সে স্বাদ যেন আজও মনে পড়ে। নৌকায় ফিরে আমরা সবাই মিলে নৌকা ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের গল্প কৌতুক বলছি ও শুনছি। সুন্দর সুন্দর গান ও কৌতুকে মনটা খুশিতে ভরে উঠল। ভাইয়াও আমাদের সাথে যোগ দিলেন এবং দুটো সুন্দর কৌতুক শোনালেন। অতঃপর আমরা মাঝিদের অনুরোধ করি গান শোনাতে। মাঝিরা গান ধরল-
“মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে
আমি আর বাইতে পারলাম না।”
আমরা সবাই কোরাস কণ্ঠে মাঝি ভাইয়ের সাথে গান গাইতে থাকি। কানায় কানায় পূর্ণ নদীর পানিতে ঢেউ হচ্ছে প্রচণ্ড। প্রতিকূল স্রোত ঠেলে আমাদের নৌকা এগিয়ে চলেছে। মাঝে মধ্যে দু একটা যাত্রীবাহী লঞ্চ ভোঁ ভোঁ শব্দে যান্ত্রিক আওয়াজ তুলে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যে।
বৌদ্ধ মন্দির দেখা:
নিজের চোখে না দেখলে এমন একটি ঐতিহাসিক মন্দির সম্পর্কে আমার কিছুই জানা হতো না। মন্দিরে একটি বৌদ্ধ মূর্তি আছে যা পিতলের তৈরি। সিন্দুকের মতো করে লোহার জালির মধ্যে মূর্তিটি রাখা হয়েছে। এত বড় একটা মূর্তি তাও আবার পিতলের তৈরি। চমৎকার কারুকাজ করা। চকচক করছে মূর্তিটি। এছাড়াও আরো কিছু জিনিস দেখলাম যা খুবই উপভোগ্য।
বিদায়ের পালা:
পড়ন্ত বিকালে আমরা রওনা হলাম বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে। নৌকা ছেড়ে মাঝি জোরে জোরে বৈঠা বাইতে লাগল। অস্তায়মান সূর্যের রক্তিম আভা নদীর স্বচ্ছ বুকে অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করল। সোনালি রঙের ঢেউগুলো দেহমনে দোলা লাগাচ্ছে। আমরা প্রাণভরে নদীর বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছি। সূর্য যেন নদীর কূলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। দূরে মসজিদে মাগরিবের আজানের ধ্বনি শোনা গেল। আমাদের নৌকায় একটা হারিকেন জ্বালানো হলো।
নদীর বুকে রাতের বেলা এরকম শত শত আলো জ্বলছিল। আমাদের মনে পড়ল অমর কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের কথা। যেখানে লেখক এ ধরনের আলোর বর্ণনা দিয়েছেন। ভারতের প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক গৌতম ঘোষের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ ছায়াছবিতেও এ দৃশ্যটি দেখেছি। অপূর্ব সেই দৃশ্য। আমরা প্রায় এসে পড়েছি। নৌকা তীরে ভিড়ল। আমরা সবাই একে একে নেমে পড়লাম। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাড়ির দিকে রওনা হলাম।
উপসংহার:
নৌকা ভ্রমণ ও ঐতিহাসিক বৌদ্ধ মন্দির দর্শনের স্মৃতি আমাদের মনে চির অম্লান হয়ে থাকবে। এমনিভাবে আরো ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় আমাদের ঝোলা হবে পূর্ণ। কিছু কিছু স্মৃতি আছে যা একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার। আমাদের এ ভ্রমণটিও এমনি এক স্মৃতিময়তায় ভাস্বর।