কিয়াস (قِيَاس) ইসলামি শরিয়তের চতুর্থ মূলনীতি। কুরআন, হাদিস ও ইজমায়ে উম্মতের সমাধান নেই এমন ক্ষেত্রে নেককার মুজতাহিদ কর্তৃক তিন দলিলের আলোকে চিন্তাপ্রসূত যে বিধান দেয়া হয়, তাই শরিয়তে কিয়াস নামে পরিচিত।
কিয়াস শব্দের অর্থ কি ও কাকে বলে?
আভিধানিক অর্থ : আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে اَلْقِيَاسُ শব্দটি বাবে ضَرَبَ মাসদার। আবার বাবে مُفَاعَلَةٌ থেকেও ব্যবহৃত হয়। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে—
- اَلْمُوَازَنَةُ তথা তুলনা করা।
- اَلتَّقْدِيْرُ তথা পরিমাপ করা।
- اَلْمُسَاوَاةُ তথা সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
- اَلْاِجْتِهَادُ তথা সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা।
- اَلْمُنَاظَرَةُ তথা দুটি বস্তুকে পরস্পর তুল্য সাব্যস্ত করা।
- অনুমান করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা : কেয়াসের শরয়ি অর্থ বর্ণনায়—
১. আল-মানার গ্রন্থপ্রণেতা আবুল বারাকাত আন-নাসাফি (র.) বলেন—
اَلْقِيَاسُ فِي الشَّرْعِ هُوَ تَقْدِيْرُ الْفَرْعِ بِالْأَصْلِ فِي الْحُكْمِ وَالْعِلَّةِ
অর্থাৎ, শাখাকে মূল বিষয়ের হুকুম এবং ইল্লতের সাথে তুলনা করাকে শরিয়তে কেয়াস বলা হয়।
২. আত-তানকিহ গ্রন্থপ্রণেতার মতে—
هُوَ تَعْدِيَةُ الْحُكْمِ مِنَ الْأَصْلِ إِلَى الْفَرْعِ
অর্থাৎ, মূল হতে শাখার দিকে হুকুম স্থানান্তর করাকে কেয়াস বলা হয়।
সম্পর্কিত পোস্ট : ইজমা (إِجْمَاعٌ )কাকে বলে? অর্থ, শর্ত, রুকন ও হুকুম
কিয়াসের রুকন কয়টি ও কি কি ?
যে উপাদান দ্বারা বস্তুটি অস্তিত্ব লাভ করে, তাকেই বস্তুর রোকন বলা হয়। এ মূলনীতির ভিত্তিতে কিয়াসের রোকন চারটি। যথা—
১. اَلْأَصْلُ যার ওপর অনুমান করা হয়।
২. اَلْفَرْعُ যাকে অনুমান করা হয়।
৩. اَلْحُكْمُ অনুসিদ্ধান্ত।
৪. اَلْعِلَّةُ الْجَامِعَةُ তথা এমন ইল্লত যা أَصْلٌ এবং فَرْعٌ-এর মধ্যে পাওয়া যায়।
আহনাফের মতে, কেয়াসের রোকন হচ্ছে أَصْلٌ, وَصْفٌ, جَامِعٌ তথা مَقِيْسٌ عَلَيْهِ এবং مَقِيْسٌ- فَرْعٌ -এর চতুষ্টয়ের সংযোগ সাধনকারী দিক নির্দেশনা যাকে عِلَّةٌ করে নামকরণ হয়েছে।
কিয়াসের শর্তাবলি:
১. أَصْلٌ তথা مَقِيْسٌ عَلَيْهِ-এর হুকুমটি তার জন্য অপর কোনো নস দ্বারা বিশেষিত না হওয়া। যেমন খুযাইমা (রা.) সম্পর্কে রাসূল (স.)-এর হাদিস— مَنْ شَهِدَ لَهُ خُزَيْمَةُ فَهُوَ حَسْبُهُ-এর ওপর অন্যদের জন্য কেয়াস করা যাবে না।
উদাহরণ : ইসলামে সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপারে মূলনীতি হলো অন্তত দুজন ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে হবে। কিন্তু খুযাইমা (রা.) যদি কোনো ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করেন, তাহলে তার একার সাক্ষাতেই সে বিষয়টি প্রমাণিত হবে। এর কারণ হলো হাদিসে এসেছে— قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ : مَنْ شَهِدَ لَهُ خُزَيْمَةُ فَهُوَ حَسْبُهُ
এখন এ হাদিসের ওপর অন্য সাহাবিকে কেয়াস করা যাবে না। যদিও ঐ সাহাবি তার তুলনায় অধিক মর্যাদাসম্পন্ন। কেননা, এটা শুধু খুযাইমা (রা.)-এর জন্য নির্দিষ্ট।
২. أَصْلٌ তথা مَقِيْسٌ عَلَيْهِ টি অন্য কোনো নস দ্বারা কেয়াস পরিপন্থি না হওয়া।
উদাহরণ : রোযার মধ্যে ভুলবশত খাদ্য গ্রহণ করা সত্ত্বেও রাসূল (স.)জনৈক গ্রাম্য লোককে বললেন, খাদ্য খাওয়ার পরেও রোযা ভঙ্গ হবে না এটা কেয়াস বিরোধী। অতএব, এর ওপর কেয়াস করে জোর পূর্বক কাউকে কোনো কিছু খাওয়ানো হলে তার রোযাও অবশ্যই থেকে যাবে, তা কেয়াস করা যাবে না।
সম্পর্কিত পোস্ট : আহলে ইজমা কারা? ইজমার স্তর সমূহ ও যোগ্য হওয়ার শর্ত
৩. আসলের মধ্যে নস দ্বারা যে হুকুম শরয়ি সাব্যস্ত হয়, তা أَصْلٌ-এর হবহু নযির فَرْعٌ-এর দিকে تَعَدِّيٌ হবে। তবে فَرْعٌ-এর মধ্যে অন্য কোনো নস থাকতে পারবে না। উক্ত শর্তের আরো চারটি শর্ত রয়েছে।
ক. হুকুমটি শরয়ি হওয়া; শাব্দিক না হওয়া।
খ. হুকুমটি হবহু فَرْعٌ-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হওয়া।
গ. فَرْعٌ টি أَصْلٌ-এর সদৃশ হওয়া।
ঘ. فَرْعٌ-এর মধ্যে نَصٌّ থাকা।
৪. কেয়াসের পূর্বে হুকুমটি যেমন ছিল تَعْلِيْلٌ-এর পরেও তেমনি অবশিষ্ট থাকা।
৫. কেয়াসটি نَصٌّ-এর বিপরীত না হওয়া।
উদাহরণ : তায়াম্মুমের ওপর কেয়াস করে অযুতে ইমাম শাফেয়ি (র.)-এর নিকট নিয়ত শর্ত । ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে, অযুতে নিয়ত শর্ত করা যাবে না।
কিয়াসের হুকুম:
কেয়াসের বিধান হলো, বিবেকের প্রবল সমর্থনের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। কুরআন ও হাদিসের قَطْعِيٌّ দলিলের নির্দেশিত কার্যবিলির কারণে قِيَاسٌ করা হলে এর ওপর আমল করা ওয়াজিব, এর দ্বারা ধারণাভিত্তিক জানাজিত হয়ে থাকে।
কিয়াস দলিল হওয়ার আকলি ও নকলি প্রমাণ:
আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের মতে, কেয়াস ইসলামি শরিয়তের অকাট্য দলিল। কেয়াসের মাধ্যমে নির্গত মাসযালা অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। আসহাবে জাওয়াহের কিয়াস -এর حُجِّيَّةٌ-কে অস্বীকার করেন। দলিলে নকলি ও আকলি দ্বারা প্রমাণিত হয়, কেয়াস হুজ্জত। নিচে দলিলগুলো পেশ করা হলো—
১. কেয়াস দলিল সাব্যস্ত হওয়ার নকলি প্রমাণ:
কেয়াস হুজ্জত হিসেবে গ্রহণীয় হওয়ার ব্যাপারে নকলি দলিলসমূহ নিম্নরূপ—
ক. আল্লাহর বাণী— فَاعْتَبِرُوْا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ অর্থাৎ, হে দৃষ্টিশক্তির অধিকারীগণ! তোমরা বিবেচনা গ্রহণ করবে। এ আয়াতের اَلْاِعْتِبَارُ শব্দের অর্থ হচ্ছে رَدُّ الشَّيْءِ إِلَى نَظِيْرِهِ তথা কোনো বস্তুকে তার সমপর্যায়ের বস্তুর প্রতি প্রতাবর্তিত করা। সুতরাং, উক্ত আয়াতে এটা বলা হয়েছে—قِيْسُوا الشَّيْءَ إِلَى نَظِيْرِهِ
খ. আল্লাহ তায়ালার বাণী— إِنْ كُنْتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُوْنَ
গ. হাদিসে মাশহুর দ্বারাও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। হাদিসটি হচ্ছে নিম্নরূপ—
رُوِيَ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ حِيْنَ بَعَثَ مُعَاذًا إِلَى الْيَمَنِ قَالَ: لَهُ بِمَ تَقْضِيْ يَا مُعَاذُ ؟ فَقَالَ: بِكِتَابِ اللهِ قَالَ: فَإِنْ لَمْ تَجِدْ قَالَ: بِسُنَّةِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ قَالَ: فَإِنْ لَمْ تَجِدْ قَالَ: أَجْتَهِدُ بِرَأْيِيْ فَقَالَ: اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ وَفَّقَ رَسُوْلَ رَسُوْلِهِ بِمَا يَرْضَى بِهِ رَسُوْلُهُ
এ হাদিসের أَجْتَهِدُ بِرَأْيِيْ উক্তি দ্বারা প্রতীয়মান হয়, কেয়াস অকাট্য দলিল। কেননা, মুয়াযে (রা.) আল্লাহর তায়ালার প্রশংসা ও শোকরিয়া আদায় করে বললেন, কেয়াস যদি حُجَّةٌ না হতো, তবে রাসূল অবশ্যই মুয়াযের বক্তব্য أَجْتَهِدُ بِرَأْيِيْ-এর প্রতিবাদ করতেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করতেন না।
২. কেয়াস দলিল সাব্যস্ত হওয়ার আকলি প্রমাণ:
কেয়াস হুজ্জত হিসেবে গ্রহণীয় হওয়ার ব্যাপারে আকলি দলিলসমূহ নিম্নরূপ—
ক. আল্লাহ তায়ালার বাণী— فَاعْتَبِرُوْا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ এ আয়াতটি পূর্ববর্তী উম্মতগণের অন্যায়ের কারণে যে সকল শাস্তি হয়েছে সে ব্যাপারে বলা হয়েছে। অতএব আয়াতটির অর্থ হচ্ছে, হে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমরা তোমাদের অবস্থাকে পূর্ববর্তীদের অবস্থার ওপর বিবেচনা কর। সুতরাং, দেখা গেল عَدَاوَةٌ হচ্ছে عِلَّةٌ আর عُقُوْبَةٌ হচ্ছে হুকুম। অতএব, যে জাতির মধ্যে الرَّسُوْلِ عَدَاوَةُ পাওয়া যাবে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।
আর শরিয়ি কেয়াস হলো এরূপ চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে عِلَّةٌ তথা এর মাধ্যমে হুকুম আবিষ্কার করারই নাম। সুতরাং مَقِيْسٌ عَلَيْهِ হতে مَقِيْسٌ-এর প্রতি হুকুম সম্পর্কিত হবে। আর এটাই কেয়াস حُجَّةٌ হওয়ার পক্ষে যুক্তিভিত্তিক দলিল।
খ. قِيَاسٌ হুজ্জত হওয়ার যুক্তিমূলক দ্বিতীয় দলিল হলো, আরবি ভাষায় কখনো কখনো শব্দকে প্রকৃত অর্থ হতে স্থানান্তর করে রূপকে অর্থে ব্যবহার করা হয়। এটাকে বালাগাতের পরিভাষায় اِسْتِعَارَةٌ বলা হয়। আর কেয়াস তারই অনুরূপ। কেননা, عَلَاقَةٌ তথা عِلَّةٌ جَامِعَةٌ থাকার কারণে مَقِيْسٌ عَلَيْهِ থেকে مَقِيْسٌ-এর প্রতি হুকুম স্থানান্তর করা হয়। যেভাবে عَلَاقَةٌ থাকার কারণে শব্দকে আসল অর্থ হতে রূপক অর্থমধ্যে স্থানান্তর করা হয়।
গ. কেয়াসকে হুজ্জত হিসেবে বিবেচনা না করা হলে ইসলামে যে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা তা প্রমাণ করা সম্ভব হবে না। কেননা, কুরআন ও হাদিসে জীবনের সব খুঁটিনাটি দিকে উল্লেখ নেই। বরং তাতে সংক্ষিপ্তাকারে মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। মুজতাহিদগণ সে মূলনীতি পর্যালোচনা করে নতুন সমস্যাগুলোকে মূলনীতির সাথে তুলনা করে রায় দেন। একেই قِيَاسٌ বলা হয়।