উপস্থাপনা:
বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানবজাতি হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এ মানবজাতিকে নারী-পুরুষ দুটি সত্তায় সৃষ্টি করা হয়েছে। মূলত পুরুষের সহযোগী হিসেবে আল্লাহ তায়ালা নারীকে সৃষ্টি করেছেন, যা দ্ব্যর্থহীনভাবে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ “তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।”
নারীর মর্যাদা বলতে কি বোঝায়:
মর্যাদা শব্দের অর্থ হচ্ছে গৌরব, সম্ভ্রম, মূল্য, সম্মান ইত্যাদি। নারীর মর্যাদা বলতে নারীর ন্যায়সঙ্গত অধিকারের স্বীকৃতিকে বোঝায়। অর্থাৎ সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে একজন নারী তার প্রাপ্য সম্মান, মূল্যায়ন ও অধিকার যথাযথভাবে ভোগ করবে, এটিই তার মর্যাদা। ইসলামে নারীর মর্যাদা বলতে কন্যা, স্ত্রী, মাতা তথা বিভিন্ন পরিচয়ে তার প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাকেও বোঝানো হয়।
ইসলাম পূর্বযুগে নারীর অবস্থান:
ইসলাম পূর্বযুগে নারী সমাজ ছিল সবচেয়ে অবহেলিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত এবং অধিকারহীন। তখন নারীদেরকে ভোগের সামগ্রী মনে করা হতো। কন্যা সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তাকে জীবন্ত সমাধিস্থ করা হতো। নারীদেরকে দাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাদেরকে সম্মান তো দিতই না বরং পণ্যের মতো ব্যবহার করত।
কন্যা হিসেবে মর্যাদা :
ইসলাম পুত্রের তুলনায় কন্যাকে কোনো অংশে খাটো করে দেখেনি। মহানবি (স) বলেছেন, “যাকে কন্যা সন্তান দেওয়া হলো আর সে তাদের সাথে সদাচরণ করল, তার মেয়েরা পিতার বা সে ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির পাথেয় হবে।” এ হাদীসের মাধ্যমে ইসলামে নারীর মর্যাদা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
বিবাহের মাধ্যমে মর্যাদা দান:
ইসলাম পূর্বযুগে বিবাহের ক্ষেত্রে নারীদের কোনো ধরনের স্বীকৃত অধিকার ছিল না। তখন নারীদেরকে পণ্যের মতো ক্রয়-বিক্রয় করা হতো এবং তাদের সম্মতি ছাড়াই বিয়ে দেওয়া হতো। নারীরা নিজের পছন্দমতো বিয়ে করার সুযোগ পেত না। তাদের মতামত ও ইচ্ছার কোনো গুরুত্ব দেওয়া হতো না।
স্ত্রী হিসেবে মর্যাদা :
স্ত্রী হিসেবেও ইসলাম নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ কর।” রাসুল (স) বলেছেন, “নারীর ওপর যেমনি পুরুষের অধিকার রয়েছে, তেমনি নারীরও পুরুষের ওপর অধিকার রয়েছে।”
মাতা হিসেবে মর্যাদা :
মাতা হিসেবে ইসলাম নারীকে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদান করেছে। জনৈক সাহাবী কর্তৃক সদ্ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে রাসুল (স) প্রথম তিন বার বলেছিলেন মায়ের কথা। চতুর্থ বার বলেছেন পিতার কথা। এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, ইসলাম মাতাকে পিতা অপেক্ষা তিন গুণ বেশি মর্যাদা প্রদান করেছে। রাসুল (স) বলেছেন- মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।
নিরাপত্তা বিধান :
ইসলামপূর্ব জাহেলিয়া যুগে নারীদের কোনো ‘সামাজিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তা ছিল না। ইসলাম এসে তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করে, জীবন হরণ করা তো দূরের কথা, তাদের শরীরে সামান্যতম আঘাত করতেও বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (স) নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন- তুমি স্ত্রীর মুখমণ্ডলের উপর আঘাত করো না। তাকে অশ্লীল গালিগালাজ করো না এবং ঘরে ব্যতীত অন্য কোথাও তাকে পৃথক করে রেখো না।
বাইরে গমন:
ইসলাম নারীদেরকে গৃহে অবস্থান করতে বলেছে সত্য, তবে প্রয়োজনে পর্দা করে সংযত হয়ে বাইরে যাওয়ারও অনুমতি দিয়েছে। সুতরাং পর্দাহীন ও খুব সেজেগুজে বাইরে যাওয়া উচিত নয়। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- আর তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান করবে। পূর্বের জাহেলী যুগের ন্যায় নিজেদের সাজিয়ে প্রকাশ্যে চলাফেরা করবে না।
যুদ্ধে অংশগ্রহণ:
প্রয়োজনের তাগিদে ইসলামি বিধান অনুযায়ী নারীগণ ধর্মযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করতে পারবে। যেমন—উহুদের যুদ্ধে বহু মুসলমান নারী যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করেছে এবং আহতদের সেবাযত্ন করেছেন। তারা যোদ্ধাদের সাহস ও উৎসাহও দিতেন। প্রয়োজনে নারীরা দেশের ও মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
সম্পত্তির অধিকার:
ইসলামপূর্ব যুগে নারীদেরকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো, এমনকি বর্তমান যুগেও অন্যান্য ধর্মে সম্পত্তিতে নারীর কোনো অধিকার স্বীকৃত নয়। কিন্তু ইসলামি শরীয়তে নারীদের যথাযোগ্য মর্যাদাসহ তাদের পৈতৃক ও স্বামীর সম্পত্তিতে অংশ নির্ধারিত হয়েছে।
শিক্ষার ও চাকরির অধিকার:
ইসলাম নারীকে শিক্ষার অধিকার দিয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও বিদ্যাশিক্ষা ফরয করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহানবি (স) বলেছেন- প্রত্যেক মুসলিম (নর-নারী)-এর জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরয। ইসলাম নারীকে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে যথাসম্ভব পর্দার সাথে উপার্জন-কর্মে নিয়োজিত হওয়ার অধিকারও প্রদান করেছে।
সেবামূলক কর্মকাণ্ড :
ইসলাম সেবামূলক কর্মকাণ্ডে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরকেও সমান অধিকার প্রদান করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারী চিকিৎসক হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারী অধ্যাপক হতে পারে, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে। অর্থাৎ শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে জীবনের সার্বিক পরিমণ্ডলেই নারীরা সুনিয়ন্ত্রিত পন্থায় অবস্থান করে সেবামূলক কাজে ব্রতী হতে পারে।
সংসারের তত্ত্বাবধান :
ইসলামের দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারী পরস্পরের প্রতিযোগী নয়; বরং সহযোগী। এ প্রসঙ্গে মহানবি (স.) বলেছেন, স্ত্রী তার স্বামীর পরিজনবর্গের এবং সন্তানদের তত্ত্বাবধানকারিণী। (বুখারি ও মুসলিম) নারী ভালোবাসা ও যত্নের মাধ্যমে সংসারকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করেন। পরিবারের সবার সুখ-শান্তি বজায় রাখতে নারীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মোহরানা প্রদান:
জাহেলী যুগে বিয়ের ব্যাপারে কোনো স্থায়ী বিধান না থাকায় নারীদের জীবন ছিল অনিশ্চিত। পরবর্তীতে ইসলাম পুরুষ কর্তৃক নারীকে মোহরানা দিয়ে বিয়ে করার প্রথা প্রচলন করে তাদের মর্যাদাকে উন্নত করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করবে। যদি তারা সন্তুষ্ট চিত্তে মোহরের কিয়দংশ ছেড়ে দেয় তাহলে তোমরা তা সানন্দে ভোগ করতে পারবে।
নারী-উন্নয়ন :
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ইসলামের প্রধানতম এজেন্ডা। বস্তুত মানবতার মুক্তির জন্যই ইসলামের আগমন। বিশেষ করে নারীরা যখন ছিল অধিকারহারা, বঞ্চিত, নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, তখন নারী-উন্নয়নের বার্তা ঘোষণা করেছে ইসলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলামপ্রদত্ত এ অধিকার থেকে নারীদেরকে বঞ্চিত করে তথাকথিত নারীবাদিরা নারী-উন্নয়নের নামে উল্টো পথে যাত্রা শুরু করেছে।
তাদের বক্তব্য, “সম্পত্তিতে পুরুষের চেয়ে নারীকে অর্ধেক দিয়ে নারীকে ঠকানো হয়েছে।” অথচ ইসলাম নারীকে অধিকার দিয়েছে পিতার সম্পত্তিতে, স্বামীর সম্পত্তিতে এবং পুত্রের সম্পত্তিতেও। সম্পত্তিতে অধিকার প্রদানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক যাবতীয় কর্তব্য থেকে নারীকে মুক্তি দিয়েছে ইসলাম। অর্থাৎ নারী অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য নয়।
পক্ষান্তরে পুরুষকে সম্পত্তিতে কেবল অধিকার দিয়েই তাকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়নি; বরং পিতামাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়দের প্রতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্তব্য পালন তার জন্য অবধারিত করা হয়েছে। এভাবে নারী-পুরুষের অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য ও ভারসাম্য রক্ষার জন্যই মূলত পুরুষের তুলনায় নারীকে সম্পত্তিতে অর্ধেক অংশ প্রদান করা হয়েছে।
কিন্তু পুরুষশাসিত বর্তমান সমাজের অধিকাংশ মুসলিম পরিবারই নারীর জন্য ইসলামপ্রদত্ত এই অংশ হতে বঞ্চিত করে নারী-উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। নারী অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সুতরাং নারী-উন্নয়নের জন্য ইসলামপ্রদত্ত অধিকার আদায়ের বিকল্প নেই।
বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার :
ইসলাম ও নারীর মর্যাদা বিষয়টি সাম্প্রতিক বিশ্বপরিক্রমায় ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত একটি বিষয়। ইসলামে নারীর মর্যাদা, এর যথার্থ প্রতিফলন বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এর বাস্তবতা ইত্যাদি বিষয়ে রয়েছে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার। এহেন বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের পিছনে কতিপয় কারণ ও বাস্তবতা রয়েছে। যেমন-
ক. নারীর যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি সম্বন্ধে যথাযথ জ্ঞানের অভাব।
খ. সেক্যুলার গণতন্ত্র ও রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত ও শাসিত মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে নারীর ভূলুণ্ঠিত ও মিশ্র মর্যাদা।
গ. অশিক্ষা ও কুসংস্কার কবলিত মুসলিম সমাজে নারীর যথাযথ মর্যাদার প্রতিফলন না থাকা।
ঘ. সর্বোপরি পুরুষশাসিত সমাজে নারীর অধিকার মেনে না নেয়ার প্রবণতা।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নেতিবাচক প্রভাব:
আল কুরআন, সুন্নাহ এবং রাসূল (স)-এর যুগের বাস্তবতায় নারীনেতৃত্ব ও তাদের মর্যাদার বিষয়টি ছিল সর্বজনবিদিত। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রতিরক্ষাসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু বর্তমান মুসলিম বিশ্বের প্রেক্ষাপটে নারীরা যারপরনাই পশ্চাৎপদ, অবহেলিত ও অধিকারবঞ্চিত। ফলে আধুনিক ও উন্নত বিশ্ব বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। যার ফলে ইসলাম ও মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ইস্যু খুঁজে পায় ইসলামদ্রোহীরা।
বিভ্রান্ত মুসলিম জাতি :
নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার, গণতন্ত্রায়ন ইত্যাদি ইস্যুসহ নারীর মর্যাদার ব্যাপারে ইসলামী নীতির অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ইসলামের শত্রুরা বিভ্রান্ত করছে মুসলিম জাতিকে। পুরুষের সমকাতারে এনে উলঙ্গ বেহায়াপনার মাধ্যমে নারীকে সর্বোচ্চ ভোগ্য সামগ্রী করে তোলার সর্বাত্মক প্রয়াস চালাচ্ছে পশ্চিমা ইহুদিবাদী শক্তি। আদর্শচ্যুত মুসলিম জাতি সে বিভ্রান্তির গোলক-ধাঁধায় ঘুরছে দিগ্বিদিক।
উপসংহার :
ইসলাম একটি শাশ্বত জীবনবিধান। তাই এ জীবনবিধানে নারীর মর্যাদা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যেখানে নারীকে যথাযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান দেয়া হয়েছে। তাই নারীর যথাযোগ্য মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখেই ড. আল্লামা ইকবাল বলেছেন –
“পৃথিবীর তসবীরকে রঙিন করেছে নারী,
জীবন চিত্তের উষ্ণতা তারই সেতারের ধ্বনি।”