উপস্থাপনা :
ব্যক্তি যেখানে জন্মগ্রহণ করে এবং বসবাস করে তাই তার দেশ। দেশ বা মাতৃভূমি আল্লাহর নি’আমাত। উহা মায়ের মত। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ মাকে যেমন ভালবাসে তেমনি মাতৃভূমিকে ভালবাসে। ইসলাম দেশকে ভালোবাসা এবং তার নিরাপত্তা বিধান করা ওয়াজিব করেছে। এ জন্য বলা হয়- “দেশকে ভালবাসা ঈমানের অংশ।”
স্বদেশ প্রেম কী :
যে ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের মধ্যে মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং বড় হয়ে ওঠে; তার প্রতি, সেখানকার মানুষের প্রতি তার একটা স্বাভাবিক অন্তর আকর্ষণ গড়ে ওঠে। স্বদেশের পশুপাখি, তরুলতা থেকে শুরু করে তার প্রতিটি ধূলিকণা পর্যন্ত তার পরম কামনার ধন। সে তখন আবেগবিহ্বল কণ্ঠে গেয়ে ওঠে—– “আমার এই দেশেতেই জন্ম যেন এই দেশেতেই মরি।” দেশের প্রতি এই আজন্ম আকর্ষণ থেকেই স্বদেশপ্রেমের উন্মেষ।
আরও পড়ুন :– স্বদেশ প্রেম রচনা ১৫ পয়েন্ট [ SSC এবং HSC ]
স্বদেশের প্রতি ভালবাসার মর্ম:
স্বদেশের প্রতি ভালবাসা স্বভাবগত ভালবাসার অংশ বিশেষ। প্রত্যেক মানুষই নিজের দেশকে অন্য দেশের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। যদিও নিজের দেশ গরীব আর অন্য দেশ ধনী হয়। কেউ যদি দেশের বাইরে ভ্রমণে যায় তবে তার অন্তর দেশের প্রতি আকৃষ্ট থাকে। তখন সে দেশের দৃশ্য ও পরিবেশকে স্মরণ করে। তার অন্তর দেশে ফিরে আসার জন্য তেমনিভাবে কেঁদে ওঠে যেমনটি সন্তান তার মায়ের কোলে ফিরে আসার জন্য কাঁদে।
দেশকে ভালোবাসার গুরুত্ব:
দেশ হলো মায়ের মতো। মা তার সন্তানকে লালন-পালন করে তেমনিভাবে দেশ তার নাগরিককে লালন-পালন করে। দেশ তাকে জিবীকা, ফল-মূল ও অনেক প্রকার নেয়ামত উজাড় করে দেয়। দেশ তার নাগরিকদেরকে আরাম আয়েশের সকল প্রকার বিষয় প্রদান করে। দেশের ভালোবাসার গুরবত্ব সম্পর্কে বলা হয়, দেশকে ভালবাসা ঈমানের অংশ।” এ ভালোবাসা রাসূল (সা) এর মক্কা থেকে হিজরতের সময় যখন তাকে বের করে দেয়া হয় তখন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, যদি আমাকে বের করে দেয়া না হতো তবে আমি কখনওই স্বদেশ থেকে বের হতাম না।
দেশের প্রতি নাগরিকদের কর্তব্য :
লালন-পালনের দিক থেকে দেশ হলো মায়ের মতো। দেশ তার নাগরিককে জীবিকা, আলো-বাতাস এবং আরাম আয়েশের সকল উপাদান প্রদান করে নাগরিকদের লালন-পালন করে। প্রত্যেক নাগরিককে তার দেশকে কথায় ও কাজে ভালবাসা অবশ্য কর্তব্য।
আরও পড়ুন :- স্বদেশ প্রেম – বাংলা রচনা [ Class – 6, 7, 8 ,9 ,10] hsc
তার উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য চেষ্টা করা, সকল প্রকার অনিষ্ট ও বিপর্যয় থেকে রৰা করা এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করাও তাদের কর্তব্য। স্বদেশ আল্লাহর একটি নেয়ামত। তাই প্রত্যেকের দেশের প্রতি দায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করা উচিৎ।
স্বদেশ প্রেমের দৃষ্টান্ত :
স্বদেশকে ভালোবাসতে গিয়ে যুগে যুগে বহু নেতা ও মনীষী নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। উপমহাদেশের তিতুমীর, রানা প্রতাপ, শিবাজী, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্লচাকী, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী প্রমুখ নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত রেখে – গেছেন।
বাংলাদেশে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ মোঃ রুহুল আমিন, মতিউর রহমান, মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর, মোস্তফা কামাল, মুন্সী আবদুর রব, নূর মোহাম্মদ শেখ, হামিদুর রহমান প্রমুখ অকাতরে জীবন দিয়ে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত হিসেবে অমর হয়ে আছেন।
এছাড়া শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী, ড.ই. – লেনিন, মাও সেতুং, গ্যারিবন্ডি, জর্জ ওয়াশিংটন, কামাল পাশা, হো চি মিন, সাদ্দাম হোসেন, মাহাথির মোহাম্মদ প্রমুখ দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ।
অন্ধ স্বদেশ প্রেম :
স্বদেশ প্রেম দেশ এ জাতির গৌরবের বস্তু। কিন্তু অন্ধ স্বদেশপ্রেম ধারণ করে ভয়ঙ্কর রূপ, তা জাতিতে জাতিতে অনিবার্য করে তুলে সংঘাত ও সংঘর্ষ । অন্ধ স্বদেশপ্রেম কেবল স্বদেশের কথাই চিন্তা করে।
আবার স্বদেশের জয়গান যদি অপরের স্বদেশপ্রেমকে আহত করে, তবে সেই অন্ধ স্বদেশপ্রেম বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে ডেকে আনে ভয়াবহ রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত। হিটলারের জার্মানি ও মুসোলিনীর ইতালি উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণে বিশ্বের শান্তি ও মানবতার জন্য বড় বিপদ সৃষ্টি করেছিল।
আরও পড়ুন : স্বদেশ প্রেম রচনা ২০ পয়েন্ট | SSC HSC | PDF
স্বদেশ প্রেম ও বিশ্বপ্রেম :
স্বদেশপ্রেমের সঙ্গে বিশ্বপ্রেমের কোন অমিল নেই, কোনো সংঘাত নেই। স্বদেশপ্রেম তো বিশ্বপ্রেমেরই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। বলাবাহুল্য, স্বদেশ বিশ্বেরই অন্তর্ভুক্ত। স্বদেশের মধ্যস্থতায় বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। স্বদেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে আমরা বিশ্বপ্রেমের জগতে উপনীত হতে পারি। স্বদেশবাসীকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে পারলে আমরা বিশ্ববাসীকেও মনে প্রাণে ভালোবাসতে পারি। আবার যে স্বদেশবাসী, সে বিশ্ববাসীও বটে।
তোমাতে বিশ্বময়ীর- তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।”
স্বদেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্য :
স্বদেশপ্রেম মানবচরিত্রের এক স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ যেমন দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে, তেমনি সাহিত্য, শিল্পকলা বা অন্যান্য জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে কাজ করাও দেশপ্রেমের লক্ষণ। তাই প্রত্যেকের কাজ হবে যার যার ক্ষেত্রে দেশের কল্যাণের কথা চিন্তা করে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করা—যাতে স্বদেশের সবরকম উন্নতি সাধিত হয়। দেশপ্রেম নিজের দেশকে জানতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়। স্বদেশপ্রেমের মাধ্যমেই বিশ্বপ্রেমে এগিয়ে যাওয়া যায়। ফলে মানবতার মহান আদর্শের সম্প্রসারণ ঘটে।
উপসংহার :
স্বদেশ প্রেম একটি স্বভাবগত বিষয়, সুতরাং প্রত্যেকের উচিত উহার হক আদায় করা। সাধারণভাবে প্রত্যেক নাগরিকের আর বিশেষভাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দেশকে মনে-প্রাণে ও কাজে ও কথায় ভালোবাসা অবশ্য কর্তব্য। আর দেশকে অভ্যন্তরীণ বহিঃশত্রু এবং বিদ্রোহীদের হাত থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে সজাগ থাকা কর্তব্য। আমাদের সকলকে স্বার্থহীন দেশপ্রেমিক হতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে স্বদেশপ্রেমকে। তবেই স্বাধীন জাতির মর্যাদা নিয়ে আনন্দের সাথে বেঁচে থাকা যাবে ।