শরিয়ত প্রবর্তনের উদ্দেশ্য হলো, মানবতার কল্যাণ সাধন, মানুষের জীবন ও কর্মকে সহজ ও সাবলীল করা, মানুষের ক্ষতি প্রতিরোধ করা। নিচে মাসলাহা(مَصْلَحَةٌ) আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ ও প্রকারভেদ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো –
مَصْلَحَةٌ আভিধানিক অর্থ কি ?
مَصْلَحَةٌ শব্দটি صُلْحٌ শব্দ থেকে গঠিত। এর আভিধানিক অর্থ—
- الْخَيْرِيَّةُ তথা কল্যাণকর।
- ضِدُّ الْفَسَادِ তথা ক্ষতির বিপরীত।
- الصَّلَاحُ তথা মঙ্গল।
- النَّفْعُ তথা উপকার।
- السَّلَامَةُ مِنَ الْعَيْبِ তথা দোষমুক্ত।
- هَيْئَةٌ إِدَارِيَّةٌ تَتَوَلَّى مَرْفَقًا عَامًّا তথা জনস্বার্থ পরিচালনাকারী সংষ্ঠা।
- خِلَافًا لِلْفَسَادِ তথা বিশৃঙ্খলার বিপরীত।
- الدَّفْتَرُ তথা দফতর, অফিস।
- مَرْفَقٌ তথা সার্থ।
- الْقِسْمُ তথা বিভাগ।
مَصْلَحَةٌ কাকে বলে ?
مَصْلَحَةٌ-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে মনীষীগণ নিম্ন বর্ণিত অভিমত পোষণ করেন—
১. ইমাম গাযালি (র.) বলেন—
هِيَ عِبَادَةٌ فِيْ الْأَصْلِ عَنْ جَلْبِ مَنْفَعَةٍ أَوْ مَضَرَّةٍ
অর্থাৎ, উপকারিতা লাভ কিংবা ক্ষতি প্রতিরোধ করাকে مَصْلَحَةٌ বলে।
২. আল্লামা আবদুল আযিয ইবনে সালাম (র.) বলেন—
الشَّرِيْعَةُ كُلُّهَا مَصَالِحُ فَهِيَ إِمَّا تَدْرَأُ مَفَاسِدَ أَوْ تَجْلِبُ مَصَالِحَ
অর্থাৎ, সকল শরয়ি বিধান উপকারী, হয়তোবা কোনোটি ক্ষতি দূর করে এবং কোনোটি কল্যাণ সাধন করে।
৩. التَّيْسِيْرُ وَالتَّحْرِيْرُ গ্রন্থপ্রণেতা বলেন—
مَا شُرِعَ الْحُكْمُ عِنْدَهُ لِحُصُوْلِ الْحِكْمَةِ أَوْ جَلْبِ مَصْلَحَةٍ أَوْ تَكْمِيْلِهَا أَوْ دَفْعِ مَفْسَدَةٍ أَوْ تَقَبَّلَهَا
অর্থাৎ, যে উদ্দেশ্যের জন্য বিধান প্রণীত হয়েছে। যেমন, কল্যাণ অর্জন করা বা পূর্ণ করা কিংবা অনিষ্ট প্রতিহত করা বা হ্রাস করা, তাকে مَصْلَحَةٌ বলে।
৪. আল-মুনজিদ অভিধানে বলা হয়েছে—
যা কল্যাণের প্রতি উৎসাহিত করে। মানুষ তার নিজের বা তার সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য যে সব কাজ চর্চা করে, তাকে মাসলাহা(مَصْلَحَةٌ)বলে।
সম্পর্কিত পোস্ট : মাকাসিদুশ শরীয়াহ অর্থ,সংজ্ঞা,প্রকার,দলিল ও উসুলুল ফিকহের সম্পর্ক
মাসলাহা(مَصْلَحَةٌ) কত প্রকার ও কি কি ?
শরিয়ত মানুষের জন্য কল্যাণকর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কতিপয় প্রকার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিচে তিনটি দিক থেকে প্রকার দেখানো হলো—
১. দলিলের দিক থেকে مَصْلَحَةٌ প্রকারভেদ :
مَصْلَحَةٌ- এর পক্ষে দলিল বিদ্যমান না থাকার দৃষ্টিতে তা তিন প্রকার। যথা –
ক. مَصَالِحُ مُعْتَبَرَةٌ তথা নির্ভরযোগ্য উপকারিতা।
খ. مَصَالِحُ مُلْغَاةٌ তথা বর্জনীয় উপকারিতা।
গ. مَصَالِحُ مُرْسَلَةٌ তথা নসের দলিলমুক্ত উপকারিতা।
ক. مَصَالِحُ مُعْتَبَرَةٌ (নির্ভরযোগ্য উপকারিতা) : এ প্রসঙ্গে আল্লামা আবদুর রহিম মায়মুন বলেন- যে উপকারিতা লাভ করার ব্যাপারে শরিয়ত প্রণেতার দলিল রয়েছে, তাকে مَصَالِحُ مُعْتَبَرَةٌ মসলা বলে।
খ. مَصَالِحُ مُلْغَاةٌ (বর্জনীয় উপকারিতা) : أُصُوْلُ الْفِقْهِ-এর গ্রন্থকার বলেন- শরিয়ত যে উপকারিতা বাতিল করে দিয়েছে এবং তার প্রতি তাকিয়ে থাকে না, তাকে مَصَالِحُ مُلْغَاةٌ বলে।
গ. مَصَالِحُ مُرْسَلَةٌ (নসের দলিলমুক্ত উপকারিতা) : مُذَاكَرَةٌ فِي أُصُولِ الْفِقْهِ গ্রন্থপ্রণেতা বলেন- শরিয়তে যে مَصْلَحَةٌ গ্রহণ করার ব্যাপারে কোনো বিশেষ দলিলপেশ করেনি এবং তা বাতিরের ব্যাপারেও কোনো বিশেষ দলিল পেশ করেনি, তাকে مَصَالِحُ مُرْسَلَةٌ বলে।
সম্পর্কিত পোস্ট : إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ মাসয়ালাটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
২. সত্তাগত দিক থেকে مَصَالِحُ তিন প্রকার। যথা—
ক. ضَرُوْرِيَّاتٌ তথা অপরিহার্য উপকারিতা।
খ. حَاجِيَّاتٌ তথা প্রয়োজনীয় উপকারিতা।
গ. تَحْسِيْنِيَّاتٌ তথা সৌন্দর্যমূলক উপকারিতা।
ক. ضَرُوْرِيَّاتٌ (অপরিহার্য উপকারিতা) : ضَرُوْرِيَّاتٌ-এর বহুবচন। আভিধানিক অর্থ— প্রয়োজনীয়, আবশ্যিক, অপরিহার্য।
আল্লামা আবু ইসহাক শাতেবি (র.) الْمُوَافَقَاتُ فِيْ أُصُوْلِ الشَّرِيْعَةِ গ্রন্থে বলেছেন—
অর্থাৎ, ضَرُوْرِيَّتٌ -এর অর্থ হলো, দীন-দুনিয়ার কল্যাণ লাভের জন্যে তা প্রয়োজন এমনভাবে, যদি তা হারিয়ে যায় তাহলে পার্থিব কল্যাণ বিনষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত হ এবং পার্থিব জীবন নষ্ট হয়। আর পরকালের মুক্তি ও নেয়ামত লাভ করা থেকে বঞ্চিত হয় এবং প্রকাশ্য ক্ষতিগ্রস্তের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়।
আর এ ضَرُوْرِيَّتٌ চারটি জিনিসের মধ্যে জারি হয়। এ চারটি হলো-
ক. الْعِبَادَاتُ ইবাদত । যেমন— ঈমান, নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ ইত্যাদি।
খ. الْعَادَاتُ অভ্যাস। যেমন— পানাহার করা, পরিধান করা, অবসান ইত্যাদি।
গ. الْمُعَامَلَاتُ লেনদেন। যেমন— ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি।
ঘ. الْجِنَايَاتُ অপরাধ। যেমন— কেসাস, দিয়ত, হদ, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি।
ضَرُوْرِيَّاتٌ সামষ্টিকভাবে পাঁচ প্রকার। যথা-
১. حِفْظُ الدِّيْنِ তথা দীনের হেফাজত করা।
২. حِفْظُ الْعَقْلِ তথা বুদ্ধি-বিবেকের হিফাজত করা।
৩. حِفْظُ النَّسَلِ তথা বংশ হিফাজত করা।
৪. حِفْظُ النَّفْسِ তথা জীবন রক্ষা করা।
৫. حِفْظُ الْمَالِ তথা সম্পদ হিফাজত করা।
৩. মর্যাদার দিক দিয়ে مَصَالِحُ-এর প্রকারভেদ:
মর্যাদার দিক দিয়ে مَصْلَحَةٌ তিন প্রকার। যথা—
১. الْمَصْلَحَةُ الْوَاجِبَةُতথা আবশ্যক উপকারিতা।
২. الْمَصْلَحَةُ الْمَنْدُوبَةُতথা মুতা যুতাযাব উপকারিতা।
৩. الْمَصْلَحَةُ الْمُبَاحَةُ তথা বৈধ উপকারিতা।
৪. ব্যক্তি ও সামাজিক দিক দিয়ে প্রকারভেদ:
ব্যক্তিগত দিক ও সামাজিক দিক দিয়ে তা দুই প্রকার। যথা—
ক. الْمَصْلَحَةُ الْخَاصَّةُ তথা নিদিষ্ট কল্যাণ। এটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাথে খাস।
খ. الْمَصْلَحَةُ الْعَامَّةُ তথা সর্বজনীন কল্যাণ। এটি কোনো ব্যক্তির জন্য খাস নয়; বরং তা সকল মানুষের জন্য উপকারী।
৫. মানবগত দিক থেকে প্রকারভেদ:
মানবগত দিক দিয়ে مَصْلَحَةُ দুপ্রকার। যথা—
ক. قَطْعِيَّةٌ তথা অকাট্যমূলক উপকারিতা।
খ. ظَنِّيَّةٌ তথা ধারণামূলক উপকারিতা।
৬. উদ্দেশ্য সাধনের দিক থেকে প্রকারভেদ :
উদ্দেশ্য লাভ হওয়ার দিক বিবেচনায় مَصَالِحُ পাঁচ প্রকার। যথা—
ক. يَقِيْنِيٌّ তথা দৃঢ়তাপূর্ণ।
খ. ظَنِّيٌّ তথা ধারণামূলক।
গ. مَشْكُوْكٌ তথা সন্দেহপূর্ণ।
ঘ. وَهْمِيٌّ তথা আন্দাজমূলক।
ঙ. আকাট্য হওয়া।