ইসলামী বিধানে যিহার (ظِهَارٌ )একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে অথবা স্ত্রীর বিশেষ কোনো অঙ্গকে রক্ত সম্পর্কিত কিংবা স্তন্যপান সম্পর্কিত কোনো বিবাহ নিষিদ্ধ মহিলার সাথে বা তার কোনো অঙ্গের সাথে তুলনা করাকে ظِهَارٌ বলে। ظِهَارٌ-এর ফলে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয় না; কিন্তু কাফফার আদায় না করা পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে সহবাস নিষিদ্ধ। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
যিহার (ظِهَارٌ) অর্থ কি ও কাকে বলে ?
আভিধানিক অর্থ: ظِهَارٌ শব্দটি ظَهْرٌ শব্দমূল থেকে উদ্ভূত মাসদার। এর অর্থ— পিঠের সাথে তুলনা করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: الْمَوْسُوْعَةُ الْفِقْهِيَّةُ গ্রন্থে বলা হয়েছে—
الظِّهَارُهُوَ تَشْبِيْهُ الرَّجُلِ زَوْجَتَهُ أَوْ جُزْءٍ مِنْهَا بِامْرَأَةٍ مُحَرَّمَةٍ عَلَيْهِ مُؤَبَّدَةٍ
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার স্ত্রীকে বা স্ত্রীর কোনো অঙ্গকে তার কোনো রক্ত সম্পর্কিত স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ মহিলার সঙ্গে তুলনা করাকে যিহার বলা হয়।
এককথায়, কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার স্ত্রীকে মুহাররামাত (বিবাহ চির নিষিদ্ধ মহিলা)-এর সাথে বা তার কোনো অঙ্গের সাথে তুলনা করাকে যিহার বলে।
আরও জানুন : মুশতারাক(مُشْتَرَكٌ) ও মুআওয়াল(مُؤَوَّلٌ) অর্থ, সংজ্ঞা, হুকুম, পার্থক্য
যিহার-এর কাফফারা :
যিহারের কাফফারা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَالَّذِيْنَ يُظَاهِرُوْنَ مِنْ نِسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُوْدُوْنَ لِمَا قَالُوْا فَتَحْرِيْرُ رَقَبَةٍ الْخ
অর্থাৎ, যারা তাদের স্ত্রীর সঙ্গে যিহার করে এবং পরে নিজেদের ব্যক্ত করা বিষয়ের সংশোধন করতে চায়, তারা যেন পরস্পরের স্পর্শ করার পূর্বে একটি গোলাম আযাদ করে দেয়। আর সে যদি গোলাম না পায়, তাহলে যেন উভয়ের স্পর্শের পূর্বে একাধারে দু’মাস রোযা রাখে এবং তাতেও সক্ষম না হলে সে যেন ষাটজন মিসকিনকে খাদ্য দান করে।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, যিহারের কাফফারা তিনটি উপায়ে আদায় করা যায়। ১. গোলাম আযাদ করা, ২. এক নাগাড়ে দু’মাস রোযা রাখা, ৩. ষাটজন মিসকিনকে খাদ্য দান করা।
আলোচ্য মাসয়ালার বিশ্লেষণ :
ইসলামের বিধান হচ্ছে, যিহারকারী كَفَّارَةٌ আদায় না করা পর্যন্ত স্ত্রী সহবাস করতে পারবে না, যা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু كَفَّارَةٌ আদায়ের ক্ষেত্রে কেউ যদি মিসকিনকে খাদ্য দান করে, তাহলে খাদ্য দান প্রদানকালে সহবাস বৈধ হবে কিনা? এটাই আলোচ্য প্রশ্নের চাহিদা।
ظِهَارٌ-এর কাফফারা তিনভাবে আদায় করা যায়। মিসকিনকে ষাট দিন খাদ্যদান করা তার তৃতীয় পন্থা। আর মিসকিনকে খাদ্যদান অবস্থায় সহবাস বৈধ কিনা, এ ব্যাপারে ইমামগণের মাঝে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। যেমন—
১. আবু হানীফার অভিমত: ইমাম আবু হানীফা (র.) বলেন, যদি যিহারকারী মিসকিনকে খাদ্য প্রদান অবস্থায় আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, তবে তাকে পুনঃ নতুন করে মিসকিনদের খানা খাওয়াতে হবে না; বরং যা অবশিষ্ট রয়েছে তা পূর্ণ করলেই চলবে।
দলীল: আল্লাহর বাণী— فَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّيْنَ مِسْكِيْنًا আয়াতে مِسْكِيْنٌ শব্দটি মুতলাক; তাতে স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে পারবে না, এমন কোনো শর্তারোপ করা হয়নি। পক্ষান্তরে দু’মাস যাবৎ রোযার মাধ্যমে কাফফারা আদায় করার ক্ষেত্রে স্ত্রীসহবাস বর্জনের শর্তারোপ করা হয়েছে। সুতরাং রোযার মাধ্যমে কাফফারার ওপর কেয়াস করে মিসকিন খাওয়ানোর ক্ষেত্রে স্ত্রী সহবাস বর্জনের শর্তারোপ করা যাবে না। অতএব নতুন করে খাদ্য খাওয়াতে হবে না।
আরও জানুন : মুতলাক ও মুকাইয়াদ কাকে বলে? অর্থ, হুকুম ও উদাহরণ
২. শাফেয়ীর অভিমত: ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, যিহারের কাফফারা যদি মিসকিনকে খাদ্যদান উপায়ে আদায় করা হয় এবং ঐ খাদ্যদানের মধ্যে সহবাস করা হয়, তবে নতুন করে আবারও খাদ্য খাওয়াতে হবে।
দলীল: রোযার কাফফারায় খাদ্যদানে মধ্যে স্পর্শ তথা সহবাস করার শর্ত রয়েছে। যেমন কুরআনে রয়েছে—
فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا
উপসংহার: যিহারের কাফফারা খাদ্য দ্বারা আদায় করাকে রোযার কাফফারার ওপর কেয়াসের ভিত্তিতে খাদ্য প্রদানকালে সহবাসহীনতার শর্ত দ্বারা মুকাইয়াদ করা যাবে না; বরং مُطْلَقٌ-কে مُطْلَقٌ-ই রাখতে হবে।