মূলভাব: সত্যকে পেতে হলে মিথ্যার ও ভ্রান্তির সকল বাধা অতিক্রম করতে হবে। তাহলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
সম্প্রসারিত ভাব: সত্যই জীবনের সৌন্দর্য, সত্যই পরম আরাধ্য। সত্যের সিঁড়ি বেয়েই জীবনের বিকাশ সাধিত হয়। অপরদিকে অসত্য জীবনে ধ্বংস ডেকে আনে। সত্য-সন্ধানী মানুষ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সুন্দর ও কল্যাণের সাধনা করেন। অসত্যের অকল্যাণ থেকে মুক্ত থাকার প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও আমাদের একে অস্বীকার করলে চলে না। প্রকৃতপক্ষে সত্য কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। আলোর উদ্দীপক যেমন অন্ধকার তেমনি অসত্যই সত্যের সৌন্দর্যকে মহিমান্বিত করে তোলে। বস্তুত সত্য ও মিথ্যা মিলেই জীবনের বাস্তবতা। সত্য কাঙ্ক্ষিত হলেও তা মিথ্যার সাথে মিশেল হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। আমাদের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে মিথ্যার ভিড় থেকে সত্যকে গ্রহণ করতে হয়। কখনো কখনো সত্য-মিথ্যা আমাদের বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। তা সত্ত্বেও আমাদের সত্যকেই খুঁজে বের করতে হয়। মিথ্যার ভয়ে যদি আমরা দ্বার রুদ্ধ করে গৃহবন্দি হয়ে থাকি তাহলে সেটা যৌক্তিক ও বাস্তবানুগ হবে না। তাহলে মিথ্যাকে পরিহার করতে গিয়ে আমরা সত্যকেও হারিয়ে ফেলতে পারি। কেননা সত্য ও মিথ্যার অবস্থান অবিচ্ছিন্ন। তাই আমাদের দ্বার উন্মুক্ত করেই সত্য ও মিথ্যাকে প্রবেশাধিকার দিতে হবে। বিবেক, বুদ্ধি ও শিক্ষার কষ্টিপাথরে যাচাই করে মিথ্যাকে উপেক্ষা করে সত্যের রজ্জু আঁকড়ে ধরতে হবে। সত্য সূর্যের মতো ধ্রুব। আর সূর্যের আলো পেতে হলে আমাদের দ্বার উন্মোচিত করতে হবে। অন্ধকারের প্রাচীর ডিঙিয়ে পৌছাতে হবে সোনালি উষার দিগন্তে। বিশ্বব্যাপী যে প্রাণের মেলা বসেছে তাতে কোনোকিছুই নির্ভেজাল সত্য কিংবা মিথ্যা নয়। তাই সত্য-মিথ্যার সমন্বিত উপস্থিতিই জীবনবাস্তবতা।
মন্তব্য: ভুল-ভ্রান্তি সত্যকে পাওয়ার পথের প্রতিবন্ধক বা অন্তরায় নয়; ভুল-ভ্রান্তি হতে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেই মানুষ প্রকৃত সত্যকে উদ্ঘাটন করে।
এই ভাবসম্প্রসারণের ভিন্ন প্রতিলিপন
মূলভাব : জীবনে সত্য-মিথ্যা চিরন্তন। একটি ছাড়া অন্যটি উপলব্ধি করা যায় না। জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সত্য-মিথ্যা চিনে নিতে হবে।
সম্প্রসারিত ভাব: মানবজীবনের পথ সত্য-মিথ্যায় আকীর্ণ। তাই মানবজীবনে সত্যের সন্ধান অত্যাবশ্যকীয়। ‘সত্য’ মানুষের জীবনে অমৃতের মতো; কিন্তু এটি সহজলভ্য নয়, সত্য সন্ধানী মানুষ মিথ্যার কুহকে পথ ভ্রান্ত হতে চান না। কিন্তু সত্য ও মিথ্যা-এ দুটো এমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়। আলোর সঙ্গে অন্ধকার যেমন জড়িত তেমনি সত্যও মিথ্যা দ্বারা আবৃত। জীবনের কণ্টকিত পথে চলতে চলতে মানুষ ভুলভ্রান্তি ও মিথ্যাকে অতিক্রম করে একসময় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ায়, জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা দ্বারা অর্জন করে পরম সত্যকে। তাই মিথ্যার ভয়ে জগৎ ও জীবনবিমুখ হয়ে কেউ যদি কর্মজীবনে পা না বাড়ান তবে মিথ্যাকে হয়তো ঠেকানো যাবে কিন্তু সত্যকে উপলব্ধি করা যাবে না। সত্যকে আবিষ্কারের জন্য কঠিন পথে বাস্তবের কঠিন দৃপ্ত পদচারণা প্রয়োজন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেমন বিষধর সাপের মস্তক থেকে মূল্যবান মণি উদ্ধার করতে হয় তেমনি ভুলভ্রান্তি এবং পঙ্কিলতা থেকে উদ্ঘাটন করতে হয় হিরন্ময় সত্যকে। যারা মিথ্যাকে অস্বীকার করে সত্যকে লাভ করতে চায় তারা সত্যের সন্ধান কখনো পায় না। কেননা মিথ্যা ছাড়া সত্যের অস্তিত্ব নেই। মানুষ ভুল করতেই পারে। আর এই ভুল করতে করতেই একসময় মানুষ সত্যের অন্দরমহলে প্রবেশ করার সিংহদ্বারটির সন্ধান পায়। সাঁতার শিখতে হলে যেমন পানিতে নামতে হয় তেমনি সত্যকে পেতে হলে জীবনের পথে নামতে হয়। ভুলের ভয়ে, মিথ্যার আশঙ্কায় মনের দরজা বন্ধ রেখে যদি বাইরের অভিজ্ঞতাকে দূরে সরিয়ে রাখা হয় তবে কোনোদিনই সত্যের সন্ধান পাওয়া যাবে না। বিজ্ঞ লোকমান হেকিমকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি এত জ্ঞান কোথায় পেলেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘অজ্ঞানের কাছে।’ বস্তুত অজ্ঞানের কাছে যেমন জ্ঞান লুকিয়ে থাকে তেমনি মিথ্যার সঙ্গে মিশে থাকে সত্য।
মন্তব্য: সত্য, অবিনশ্বর ও দুর্লভ। সত্য এবং মিথ্যাকে তাই বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়।
