ইলমে তাসাউফ কাকে বলে? এর অর্থ,গুরুত্ব , লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ইলমুত তাসাউফ (عِلْمُ التَّصَوُّفِ) হচ্ছে ইলমুল ইহসানের অন্তর্ভুক্ত, যার সূচনা হলো ইখলাসের সাথে আমলকে সুন্দর করা, আর শেষ গন্তব্য হলো আল্লাহকে যেন দেখে ইবাদত করা। যদি দেখার সক্ষমতা না হয়, তাহলে একীনের এ মাকামে পৌছা যে তিনি আমাকে দেখছেন।

ইলমে তাসাউফ অর্থ কি ?

عِلْمُ التَّصَوُّفِ-এর আভিধানিক অর্থ: التَّصَوُّفُ শব্দটি বাবে تَفَعُّلٌ-এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সুফিত্ব গ্রহণ করা, আধ্যাত্মিকতা লাভ করা, আত্মশুদ্ধি অর্জন করা, মার্জিত রূপ লাভ করা ইত্যাদি।

ইলমে তাসাউফ কাকে বলে?

শায়খুল ইসলাম যাকারিয়া আল আনসারী (র.) ইলমে তাসাউফের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন—

যে ইলমের দ্বারা অনন্ত সৌভাগ্য লাভের উদ্দেশ্যে আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের প্রক্রিয়া এবং মানুষের বাহির ও ভিতর গঠন করা সম্বন্ধে অবগত হওয়া যায়, তাকে ইলমে তাসাউফ বলা হয়।

ইলমুত তাসাউফের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য :

তাসাউফের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, নিজের মধ্যে আখলাকে হামীদা তথা অভ্যন্তরীণ সৎগুণাবলি সৃষ্টি করা। বলা বাহুল্য, অভ্যন্তরীণ সৎগুণাবলি নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা এবং বাস্তব জীবনে তা প্রতিফলিত করার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা প্রদান করেছেন। পক্ষান্তরে অভ্যন্তরীণ দোষ-ক্রটি থেকে আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করা এবং মন্দ চরিত্র পরিহার করা ও এগুলোর চাহিদা মোতাবেক কোনোক্রমেই আমল না করার নির্দেশও স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা প্রদান করেছেন।

আরো পড়ুন : মুরশিদ(مُرشِد )অর্থ কি ? কাকে বলে। কামিল মুর্শিদ হওয়ার শর্তাবলী

তাসাউফের মূল উদ্দেশ্য তিনটি। যথা—

১. আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ধর্ম বিশ্বাস, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিক জীবন, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন, অর্থ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সালাত, যাকাত, সাওম, হজ্জ, জেহাদ ইত্যাদি সম্বন্ধে যা কিছু আদেশ উপদেশ ও বিধান দিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ (স.) আজীবন এসবকে কাজে পরিণত করে বাস্তবে রূপায়িত করে একটি প্রতিষ্ঠিত আদর্শ স্থাপন করে গিয়েছেন। সাহাবীগণ সঙ্গে সঙ্গে রাসূলের কার্য ও বাক্যগুলোকে—

  • নিজে আমল করেছেন।
  • অন্যদের কাছে প্রচার করে আমল করিয়েছেন।
  • নিজে মুখস্থ করেছেন।
  • অন্যদেরকে তালীম দিয়ে মুখস্থ করিয়েছেন।
  • যারা লিখতে জানতেন তারা নিজেরা লিখে রেখেছেন।
  • অন্যদেরকে লিখে দিয়েছেন। তাসাউফের প্রথম উদ্দেশ্য রাসূলের জীবনের সেই সুন্নাত তথা আল্লাহর সব আদেশ উপদেশ ও নীতিগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত ও কায়েম রাখা।

২. তাসাউফের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো নৈতিক চরিত্র, বিশিষ্ট উস্তাদের হাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে জীবন গঠন করা।

৩. তাসাউফের তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরাত্মাকে সজাগ ও সজীব করে তার ভিতরে আল্লাহর যিকির দ্বারা আল্লাহ প্রেম ও আল্লাহর তত্বজ্ঞান জাগ্রত করে আল্লাহর পথে দীনের জন্য জীবন উৎসর্গ করার মতো যোগ্যতা ও দৃঢ়তা সৃষ্টি করা।

তাসাউফের মধ্যে চার প্রকার বিষয় শিক্ষা দেওয়া এবং আমল করা হয়। যথা—

১. কামিল পীরের হাতে হাত দিয়ে বাইয়াত হওয়া তথা শিষ্যত্ব গ্রহণ করা।
২. কামিল পীরের সংস্রবে থাকা।
৩. অন্তরাত্মার পরিশুদ্ধি করা।
৪. কামিল পীরের তরীকা অনুযায়ী খাস যিকির করা।

ইলমে তাসাউফ অর্জনের গুরুত্ব:

عِلْمُ التَّصَوُّفُ তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অত্যাধিক। শরীয়ত ও মারেফাত বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীয়তের ইলম শিক্ষা করা যেভাবে ফরযে আইন, অনুরূপ যে পরিমাণ তাসাউফ শিক্ষার ফলে মানুষের চরিত্র বিশুদ্ধ ও মার্জিত হতে পারে, ততটুকু তাসাউফ শিক্ষা করাও ফরযে আইন। এ বিষয়ে ইমাম মালেক (র.) বলেছেন—

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক ইলম অর্জন করল; কিন্তু ফিকহের ইলম অর্জন করেলা না সে ধর্মচ্যুত। আর যে ফিকহের ইলম অর্জন করল; কিন্তু তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক ইলম অর্জন করেলা না সে ফাসেক বা সত্যভ্রষ্ট। আর যে ব্যক্তি উভয় ইলম অর্জন করল সেই গ্রহণযোগ্য বা মুহাক্কিক হলো। (মিরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ)

আরো পড়ুন : প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য। কুরআন ও হাদিসের আলোকে

আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সূচনা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে পাওয়ার চেতনা মনে জাগরুক করার মাধ্যমে। যেমন এদিকে ইঙ্গিত করে রাসূল (স.) বলেন—

أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ

অর্থাৎ, আল্লাহর ইবাদত করো এমনভাবে, যেন তাঁকে দেখছ। আর যদি দেখতে না পাও (দেখার যোগ্যতা না হয়), তবে এমনভাবে মনকে তৈরি কর যেন তিনি তোমাকে দেখছেন। (বুখারী)

আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে মারেফাত অর্জন। আর মারেফাত হলো অন্তরের কাজ। এ ব্যাপারে ইমাম বুখারী (র.) বলেন— إِنَّ الْمَعْرِفَةَ فِعْلُ الْقَلْبِ অর্থাৎ, মারেফাত হলো অন্তরের কাজ। (বুখারী)

যে কর্মের মাধ্যমে গুনাহমুক্ত হয়ে আল্লাহর যিকির, ফিকির, ধ্যান ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের বন্ধুতে পরিণত হয়, তাই মারেফাত বা আধ্যাত্মিকতা। যেহেতু এ কাজটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তব প্রশিক্ষণ নির্ভর, তাই একজন কামেল পীর ও মুরিশদের মাধ্যমে নিজের প্রচেষ্টায় এ ইলম অর্জন করতে হয়।

ইলমে তাসাউফ অর্জনের বিরোধিতার পরিণাম :

عِلْمُ التَّصَوُّفُ তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করা শরীয়তের ইলম অর্জন করার মতোই ফরয। যারা এ ইলম অর্জনের বিরোধিতা করে, তারা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিতে চায়।

দীনের মৌলিক তিনটি স্তম্ভ। যথা— ১. ঈমান, ২. ইসলাম ও ৩. ইহসান। ঈমান বা আকিদা বিশ্বাস দীনের প্রথম রোকন। ইসলাম বা ফিকহ আমলী জীবন। আর ইহসান, তাযকিয়া, মারেফাত, হাকীকত সব মিলিয়ে ইলমে তাসাউফ; যা অস্বীকার করলে দীনের তিন ভাগের একভাগ অস্বীকার করা হয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ

অর্থাৎ, সে ব্যক্তির অনুসরণ করবে না, যার অন্তর আমার যিকির থেকে গাফেল এবং যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসারী। (সূরা কাহাফ : ২৮)

ইমাম মালেক (র.) বলেছেন—

যে ব্যক্তি তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক ইলম অর্জন করল; কিন্তু ফিকহের ইলম অর্জন করেলা না সে ধর্মচ্যুত। আর যে ফিকহের ইলম অর্জন করল; কিন্তু তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক ইলম অর্জন করেলা না সে ফাসেক বা সত্যভ্রষ্ট। আর যে ব্যক্তি উভয় প্রকার ইলম অর্জন করল সেই গ্রহণযোগ্য বা মুহাক্কিক হলো। (মিরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ)

শিক্ষাগার

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে লাখো শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment