মানুষ সামাজিক জীব। সমাজজীবনে একে অপরের সাথে মিলে মিশে চলবে এটাই স্বাভাবিক। তাই কুরআন ও হাদিসে প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন— وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ। নিচে প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য :
বিপদাপদে অতি সহজে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর একমাত্র কাছের লোক হলো প্রতিবেশী। এজন্য ইসলামে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এ সম্পর্কে নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
১. নিরাপত্তা প্রদান: প্রতিবেশীকে নিরাপদে বসবাস করার অধিকার দিতে হবে। সুতরাং তাকে হাত কিংবা মুখ অথবা অন্য কোনো উপায়ে কষ্ট দেয়া যাবে না। যেমন রাসূল (স.) বলেন—
قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ قِيْلَ مَنْ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ الَّذِيْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
২. খাদ্য প্রদান: প্রতিবেশী অভুক্ত থাকলে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি প্রতিবেশীর খাদ্যের ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে গুনাহগার হতে হবে। যেমন রাসূল (স.)-এর বাণী—
قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ قِيْلَ مَنْ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ مَنْ أَشْبَعَ وَجَارُهُ جَائِعٌ
৩. উপহার প্রদান: উপহার প্রদানের মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নতি হয়। তাই প্রতিবেশীদের পরস্পর পরস্পরকে উপহার প্রদানের নির্দেশ দিয়ে মহানবী (স.) বলেন— تَهَادَوْا تَحَابُّوْا।
আরো পড়ুন : মানবাধিকার কি? ইসলামে মানবাধিকার ও এর প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা
৪. মান-সম্মান রক্ষা করা: কোনো প্রতিবেশী যদি ভুলবশত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো অপরাধ করে ফেলে, তাহলে অবশ্যই সে দোষ গোপন করে প্রতিবেশীর মানসম্মান রক্ষা করতে হবে। যেমন মহানবী (স.) বলেন—
مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
৫. প্রতিবেশীর সাহায্য করা: প্রতিবেশীকে সুখে দুঃখে সাহায্য সহযোগিতা করা অপর প্রতিবেশীর নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে প্রতিবেশী যখন বিপদে পড়ে যায় তখন তার সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া উচিত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
تَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
৬. সদ্ব্যবহার করা: ইসলামি ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। এ ধর্মের মূলনীতি হলো, পরস্পরের সাথে সদ্ব্যবহার করা। আর এ দায়িত্ব প্রতিবেশীর প্রতি অত্যধিক জরুরি।
৭. সম্মান করা: এক প্রতিবেশীকে সম্মান করা অপর প্রতিবেশীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ অপরকে সম্মান করলে নিজেও সম্মান লাভ করতে পারে।
৮. কষ্ট না দেওয়া: প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ ধনী কেউ গরিব হতে পারে। এ সুযোগে দুর্বল প্রতিবেশীকে কথা ও কাজে কোনোভাবে কষ্ট দেয়া যাবে না। যেমন রাসূল (স.) বলেন—
إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُؤْذِ جَارَهُ
৯. অসুস্থের সেবা করা: কোনো প্রতিবেশী অসুস্থ হলে দ্রুত তার আরোগ্যের জন্য দোয়া করা এবং সরাসরি তার সেবা শুশ্রূষা করা উচিত।
আরো পড়ুন : মুরশিদ(مُرشِد )অর্থ কি ? কাকে বলে। কামিল মুর্শিদ হওয়ার শর্তাবলী
১০. সাক্ষাতে সালাম বিনিময় করা: প্রতিবেশীর সাথে সাক্ষাৎ হলে সালাম বিনিময় করা এবং পারস্পরিক কুশলাদি জিজ্ঞেস করা উচিত।
১১. প্রতিবেশীর মৃত্যুতে সমবেদনা জ্ঞাপন: কোনো প্রতিবেশী মারা গেলে অপর প্রতিবেশীর অন্যতম দায়িত্ব হলো তার জানাযায় শরীক হওয়া ও শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানানো।
১২. অগ্রাধিকার দেয়া: প্রতিবেশীকে সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অগ্রাধিকার দেয়া অন্য প্রতিবেশীর কর্তব্য। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَيُؤْثِرُوْنَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
১৩. মঙ্গল কামনা করা: উপস্থিত অনুপস্থিত সকল প্রতিবেশীর সর্বাবস্থায় মঙ্গল কামনা করা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভেরও অন্যতম মাধ্যম। যেমন রাসূল (স.) বলেন—
خَيْرُ الْجِيْرَانِ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ
১৪. প্রতিবেশীর হকের প্রতি যত্নবান হওয়া: আল্লাহর হক এবং পিতামাতার হক আদায়ের পরই প্রতিবেশীর হকের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। একজন প্রতিবেশীই আরেকজন প্রতিবেশীর ভালোমন্দ হওয়ার ব্যাপারে যথাযোগ্য দলীল।
পরিশেষে : প্রতিবেশীদের প্রতি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা ইসলামি সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আরো পড়ুন : দোয়া অর্থ কি ? কাকে বলে। দোয়ার আদব ও গুরুত্ব বিস্তারিত