হাকিকত ও মাজাজ (حَقِيْقَةٌ ও مَجَازٌ ) উসূলে ফিকহের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। হাকীকত হলো শব্দকে তার মূল অর্থে ব্যবহার করা, আর মাজাজ হলো শব্দকে তার রূপক অর্থে ব্যবহার করা। উভয়টিই পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বিদ্যমান। নিচে হাকিকত ও মাজাজ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো –
হাকিকত অর্থ কি ?
আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে حَقِيْقَةٌ শব্দটি فَعِيْلَةٌ-এর ওজনে صِفَةٌ مُشَبَّهَةٌ-এর সীগাহ । শব্দটি একবচন, বহুবচন حَقَائِقُ; এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে—
- الْأَسَاسِيَّةُ তথা প্রকৃত, মূল।
- الْوَاقِعِيَّةُ তথা বাস্তব।
- أَصْلُ তথা মৌলিক নীতিমালা।
- الْخَالِصُ তথা আসল বা খাঁটি।
- ضِدُّ الْمَجَازِ তথা মাজাযের বিপরীত।
- الْمُوَسَّسُ তথা প্রতিষ্ঠিত।
- যথাযথ।
- ইংরেজিতে বলা হয় Real, Right, Exact, absolute ইত্যাদি।
হাকিকত কাকে বলে ?
حَقِيْقَةٌ-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে উসূলিবদগণের বক্তব্য নিম্নরূপ—
১. আল্লামা আবুল বারাকাত আননাসাফি (র.) বলেন—কোনো শব্দকে যে অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে, সে অর্থে ব্যবহার হওয়াকে حَقِيْقَةٌ নামে আখ্যায়িত করা হয়।
২. দুরসুল বালাগাত গ্রন্থকার বলেন— শব্দকে যে অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে, সে অর্থে ব্যবহার হওয়াকে হাকীকত বলে।
৩. আল্লামা নিযামুদ্দিন শাশি (র.) বলেন— অভিধান প্রণেতা শব্দকে যে অর্থের জন্য গঠন করেছেন, যদি ঠিক সে অর্থে ব্যবহার হয়, তবে তাকে حَقِيْقَةٌ বলে।
৪. আবার কারো মতে—
الْحَقِيْقَةُ كُلُّ لَفْظٍ وَضَعَهُ وَاضِعُ اللُّغَةِ
আরও জানুন : সরীহ ও কেনায়া কাকে বলে? অর্থ, হুকুম ও উদাহরণ বিস্তারিত
হাকীকতের উদাহরণ:
যেমন أَسَدٌ শব্দটিকে মূলত সিংহ বোঝানোর জন্য গঠন করা হয়েছে; কিন্তু এটা مَجَازٌ তথা রূপকার্থে الرَّجُلُ الشُّجَاعُ তথা বীরপুরুষ অর্থেও ব্যবহার হয়; কিন্তু শব্দটি যখন কেবল সিংহ অর্থেই ব্যবহার হয়, তখন এটাকে বলা হয় হাকীকত।
হাকীকতের হুকুম:
حَقِيْقَةٌ-এর হুকুম প্রসঙ্গে আল মানার প্রণেতা বলেন— হাকীকতের হুকুম হলো, শব্দকে যে অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে, সেই অর্থই সাব্যস্ত হবে; হোক তা খাস অথবা আম। এতে করে বোঝা যায়, হাকীকত خَاصٌّ কিংবা عَامٌّ উভয়ের সাথে সংযুক্ত হতে পারে। যেহেতু খাস ও আম অকাট্যভাবে আমলযোগ্য, সেহেতু হাকীকতের মর্মানুপাতে আমল করাও অপরিহার্য। যেমন আল্লাহ তায়ালার বাণী— يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا ارْكَعُوْا অর্থাৎ, হে মুমিনগণ! তোমরা রুকু কর।
আল্লাহ তায়ালার আরেকটি বাণী— وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا অর্থাৎ, তোমরা যেনার নিকটবর্তী হয়ো না। এ আয়াতে দুটি فِعْلٌ বা কর্ম হিসেবে خَاصٌّ এবং فَاعِلٌ তথা কর্তা হিসেবে عَامٌّ; আর সে ফায়েল হলো শরিয়ত দ্বারা আদিষ্ট বান্দাগণ। আবার হাকীকতও বটে। তাই নামাযে রুকু করা যেমন আবশ্যক, তেমনিভাবে যেনার নিকটবর্তী না হওয়াও আবশ্যক।
আরও জানুন : নস(نَص) কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি? উদাহরণ সহ বিস্তারিত
হাকিকত কত প্রকার ও ক কি ?
حَقِيْقَةٌ প্রথমত তিন প্রকার। যথা—
১. حَقِيْقَةٌ لُغَوِيَّةٌ তথা আভিধানিক হাকীকত।
২. حَقِيْقَةٌ شَرْعِيَّةٌ তথা শরয়ী হাকীকত।
৩. حَقِيْقَةٌ عُرْفِيَّةٌ তথা ব্যবহারিক হাকীকত।
১. حَقِيْقَةٌ لُغَوِيَّةٌ তথা আভিধানিক হাকীকত: শব্দ তার আভিধানিক অর্থে প্রয়োগ হওয়াকে حَقِيْقَةٌ لُغَوِيَّةٌ বলা হয়।
উদাহরণ: যেমন— إِنْسَانٌ; এ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো حَيَوَانٌ نَاطِقٌ তথা বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। শব্দটি এ অর্থে প্রয়োগ হলে তা হবে حَقِيْقَةٌ لُغَوِيَّةٌ তথা আভিধানিক হাকীকত।
২. حَقِيْقَةٌ شَرْعِيَّةٌ তথা শরয়ী হাকীকত: শব্দটি তার শরয়ী অর্থে প্রয়োগ হওয়াকে حَقِيْقَةٌ شَرْعِيَّةٌ বলা হয়।
উদাহরণ: যেমন— صَلَوةٌ; শব্দটির শরয়ী অর্থ হলো عِبَادَةٌ مُعَيَّنَةٌ তথা সুনির্দিষ্ট ইবাদত। শব্দটি এ অর্থে প্রয়োগ হলে তা হবে حَقِيْقَةٌ شَرْعِيَّةٌ তথা শরয়ী হাকীকত।
৩. حَقِيْقَةٌ عُرْفِيَّةٌ তথা ব্যবহারিক হাকীকত: শব্দ তার ব্যবহারিক অর্থে প্রয়োগ হওয়াকে حَقِيْقَةٌ عُرْفِيَّةٌ বলা হয়।
উদাহরণ: যেমন— دَابَّةٌ; এ শব্দের ব্যবহারিক অর্থ— চতুষ্পদ জন্তু; শব্দটি এ অর্থে প্রয়োগ হলে তা হবে حَقِيْقَةٌ عُرْفِيَّةٌ তথা ব্যবহারিক হাকীকত।
হাকিকত পুনরায় আবার তিন প্রকার। যথা—
১. حَقِيْقَةٌ مُتَعَذِّرَةٌ তথা কষ্টসাধ্য হাকীকত।
২. حَقِيْقَةٌ مَهْجُوْرَةٌ তথা পরিত্যক্ত হাকীকত।
৩. حَقِيْقَةٌ مُسْتَعْمَلَةٌ তথা প্রচলিত হাকীকত।
১. حَقِيْقَةٌ مُتَعَذِّرَةٌ তথা কষ্টসাধ্য হাকীকত: যে শব্দের প্রকৃত অর্থ উদ্দেশ্য নেয়া বা উদঘাটন করা কষ্টসাধ্য, তাকে حَقِيْقَةٌ مُتَعَذِّرَةٌ বলে। এক্ষেত্রে শব্দের রূপক অর্থ গ্রহণ করতে হবে।
উদাহরণ: যেমন কেউ শপথ করে বলল— আল্লাহর শপথ আমি এ গাছ হতে খাবো না। প্রকৃত অর্থে গাছ খাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং এর দ্বারা রূপকার্থে ফল খাওয়া উদ্দেশ্য হবে এবং শপথকারী ফল খেলেই শপথ ভঙ্গকারী হবে।
২. حَقِيْقَةٌ مَهْجُوْرَةٌ তথা পরিত্যক্ত হাকীকত: যে শব্দের প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব, কিন্তু মানুষ সাধারণত একে ব্যবহার করে না, তাকে حَقِيْقَةٌ مَهْجُوْرَةٌ তথা পরিত্যক্ত হাকীকত বলে। এক্ষেত্রে রূপক অর্থ প্রাধান্য পাবে।
উদাহরণ: যেমন কেউ শপথ করে বলল— আল্লাহর শপথ আমি অমুকের ঘরে পা রাখবো না। এখানে পা রাখা দ্বারা ঘরে প্রবেশ করা উদ্দেশ্য। সুতরাং শপথকারী যদি বাইরে থেকে ঘরে পা প্রবেশ করায়, তাহলে সে শপথ ভঙ্গকারী হবে না।
৩. حَقِيْقَةٌ مُسْتَعْمَلَةٌ তথা প্রচলিত হাকীকত: যে শব্দের প্রচলন বিদ্যমান এবং মানুষ তা ব্যবহার করছে, তাকে حَقِيْقَةٌ مُسْتَعْمَلَةٌ তথা প্রচলিত হাকীকত বলে।
উদাহরণ: যেমন— أَسَدٌ শব্দকে সিংহ এবং خَالِدٌ শব্দকে ব্যক্তি অর্থে ব্যবহার করাই حَقِيْقَةٌ مُسْتَعْمَلَةٌ তথা প্রচলিত হাকীকত।
মাজাজ অর্থ কি?
مَجَاز শব্দটি مَفْعَل-এর ওযনে اِسْم ظَرْف -এর সীগাহ। এটি এখানে اِسْمِ فَاعِل অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ হলো:
- অতিক্রমকারী।
- সীমা অতিক্রমকারী।
- রূপক অর্থ প্রদানকারী।
- হাকীকতের বিপরীত।
- স্থান অতিক্রমকারী।
- স্থানচ্যুত।
- ইংরেজিতে বলা হয় — Corridor, Expression, Passage ইত্যাদি।
মাজাজ কাকে বলে ?
১. আল মানার প্রণেতা আল্লামা নাসাফী (র) বলেন: প্রকৃত ও রূপক উভয় অর্থের মধ্যে সাদৃশ্য থাকার কারণে প্রকৃত অর্থ ব্যতীত অন্য কোনো অর্থ উদ্দেশ্য করাকে মাজাজ বলা হয়।
২. আল্লামা নিযামুদ্দীন শাশী (র) বলেন:
كُلُّ لَفْظٍ اسْتُعْمِلَ فِي غَيْرِ مَا وُضِعَ لَهُ
অর্থাৎ, প্রত্যেক ঐ শব্দকে মাজায বলা হয়, যাকে لَهُ مَوْضُوعٌ বাতীত অন্য অর্থে ব্যবহার করা হয়।
মোটকথা, কোনো শব্দকে যে অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে, সে অর্থে ব্যবহার না করে অন্য কোনো রূপক তথা অপ্রকৃত অর্থে ব্যবহার করাকে মাজায বলা হয়।
মাজাজ এর উদাহরণ:
যেমন — বাঘ বা সিংহকে আরবিতে বলা হয় أَسَدٌ; কিন্তু এ শব্দটিকে কখনো কখনো الرَّجُلُ الشُّجَاعُ তথা বীরপুরুষ অর্থেও রূপকভাবে ব্যবহার করা হয়। তখনই এটাকে মাজায বলা হয়।
মাজাজ-এর হুকুম :
মাজায-এর হুকুম বর্ণনা করে আল মানার প্রণেতা আল্লামা নাসাফী (র) বলেন:
حُكْمُهُ وُجُودُ مَا اسْتُعِيرَ لَهُ خَاصًّا كَانَ أَوْ عَامًّا
অর্থাৎ, মাজায-এর হুকুম হচ্ছে — তাকে যে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, তার অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকা; চাই তা খাস হোক কিংবা আম।