‘রচনা’ বলতে কোন বিষয় সম্পর্কে যুক্তি বা তথ্য দিয়ে সুন্দরভাবে সহজ ও সরল ভাষায় সম্পূর্ণ করে কিছু লিখে প্রকাশ করাকে বুঝায়। রচনা কথাটির মূল অর্থ ‘বিন্যাস’ বা ‘সৃষ্টি’।
‘প্রবন্ধ’ শব্দের মৌলিক অর্থ প্রকৃষ্ট বন্ধনযুক্ত রচনা। একে গদ্য লেখা বুদ্ধি বা জ্ঞানমূলক রচনা বুঝায়। সুন্দর করে মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করাই প্রবন্ধ রচনার মূল লক্ষ। চিন্তার কথা বা স্মৃতির কথা যখন গদ্যের আকারে লেখা হয় এবং যা পড়ে আনন্দ পাওয়া যায় বা জ্ঞান লাভ করা যায়, তখনই তা রচনা বা প্রবন্ধ হয়ে ওঠে। চিন্তা যতো পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট হবে রচনাও তত সুন্দর হবে।
রচনা কাকে বলে?
কোনো একটি বিষয়কে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে কয়েকটি অনুচ্ছেদে লিখে প্রকাশ করাকে রচনা বলে। রচনাকে প্রবন্ধও বলে। উপকরণ, ভাব ও ভাষা-এই তিনটি প্রবন্ধ বা রচনার জীবন।
রচনার প্রকারভেদ :
বিষয়বস্তুর প্রকৃতি ও বর্ণনাভঙ্গি অনুসারে রচনা তিন প্রকার। যথা-
ক. বর্ণনামূলক;
খ. ঘটনামূলক এবং
গ. চিন্তামূলক।
১. বর্ণনামূলক বা বিবৃতিমূলক রচনা: কোন প্রাণী, বস্তু, স্থান, প্রাকৃতিক দৃশ্য প্রভৃতি বিষয়ের বর্ণনা করে যে প্রবন্ধ রচিত হয়, তাকে বর্ণনা বা বিবৃতিমূলক প্রবন্ধ বলা হয়।
যেমন- ধান, পাট, গরু, ঢাকা প্রভৃতি। এ জাতীয় রচনায় বিষয়বস্তুর বর্ণনা ও সুন্দর চিত্র প্রাধান্য লাভ করে।
২. ঘটনামূলক রচনা : কোন ঐতিহাসিক ঘটনা, বিখ্যাত লোকের জীবনী, ভ্রমণ কাহিনী, উৎসব, সমসাময়িক ঘটনা প্রভৃতি অবলম্বনে যে প্রবন্ধ রচিত হয়, তাকে ঘটনামূলক প্রবন্ধ বলে।
যেমন- পলাশীর যুদ্ধ, কারবালা, হাজী মুহম্মদ মহসীন, ময়নামতি, ভ্রমণ, দুর্গোৎসব, উদুল-ফিতর, বন্যা, একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভৃতি। এ জাতীয় রচনার একদিকে থাকে বিষয়ের বর্ণনা, অন্যদিকে থাকে লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। লেখকের বর্ণনাগুলোতে ঘটনাটি সন্ধ্যার প্রথম তারাটির মত পাঠকের মনের আকাশে ভেসে ওঠে।~
৩. চিন্তা বা ভাবমূলক রচনা : মানবজীবনের দোষ-গুণ, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বা অনুরূপ কোন বিষয় সম্পর্কে লেখকের ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণা অবলম্বনে যে প্রবন্ধ রচনা করা হয়, তাকে চিন্তা বা ভাবমূলক প্রবন্ধ বলে।
যেমন- আলস্য, অধ্যবসায়, দেশপ্রেম, মাতৃভাষাই শিক্ষার বাহন ইত্যাদি। এ জাতীয় রচনায় লেখকের স্বাধীন চিন্তা ও ব্যক্তিহৃদয়ের স্পর্শই প্রধান- বিষয়বস্তু এখানে গৌণ।
প্রবন্ধ রচনা লেখার নিয়ম :
প্রবন্ধ বা রচনা লেখার সময় কতকগুলো নিয়ম মেনে চলতে হয়। রচনা লেখতে কোন বিষয়ে মনের ভাবের বা চিন্তাধারার সঙ্গে পর পর সঙ্গতি রেখে এক একটি ভাবকে এক একটি অনুচ্ছেদে লিখতে হবে। পরস্পর সম্পর্কহীন ভাবের প্রকাশ রচনার সৌন্দর্যকে নষ্ট করে। একটি সম্পূর্ণ রচনা লেখার কিছু নিয়ম নিচে দেয়া হল:
ক. যে বিষয় নিয়ে রচনা লিখতে হবে, সে বিষয় সম্বন্ধে ভালভাবে জেনে নিতে হবে। বিষয়টি সম্বন্ধে ভালভাবে জেনে ঠিক করতে হবে, বিষয়টির কোন কোন দিক নিয়ে লিখলে রচনা সুন্দর ও স্বার্থক হবে।
খ. বিষয়বস্তু সম্বন্ধে প্রধান প্রধান সব বক্তব্য চিন্তা করে সুন্দরভাবে সাজাতে হবে। রচনায় যে সব তথ্য বা উপকরণ ব্যবহৃত হবে, সংকেত স্বরূপ তার নোট রাখবে।
গ. বক্তব্যগুলো এমনভাবে সাজিয়ে লেখতে হবে যাতে তাদের মধ্যে একটা স্বাভাবিক সঙ্গতি বজায় থাকে।
ঘ. এক একটি ভাব নিয়ে এক একটি অনুচ্ছেদ রচনা করবে। অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে আবার ভাব ও ভাষার সামঞ্জস্য থাকতে হবে।
ঙ. প্রত্যেকটি ভাব উপযুক্ত যুক্তির সাহায্যে প্রকাশ করতে হবে। কোন অবান্তর বিষয়ের আলোচনা করা ঠিক হবে না।
চ. রচনা খুব দীর্ঘ বা খুব ছোট হবে না। বিষয় অনুসারে তা বড় বা ছোট হবে।
ছ. রচনায় একটি আরম্ভ ও একটি সমাপ্তি অর্থাৎ উপস্থাপনা ও উপসংহার থাকবে। এ দুটো বিষয় রচনার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সূচনাটি এমন হবে যে, সমগ্র রচনাটির মোটামুটি একটি আভাষ তাতে ফুটে ওঠে। উপসংহার এমন হবে যে, তাতে যেন রচনাটির সমস্ত বক্তব্যের সমাপ্তি ঘোষণা করে।
জ. রচনার ভাষা সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল হবে। ভাষার সরলতা, সরসতার ওপর এর স্বার্থকতা অনেকটা নির্ভর করে।
ঝ. প্রয়োজনে কোন পৌরণিক বা ঐতিহাসিক কাহিনী বা ব্যক্তিগত মতামত অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা যেতে পারে।
ঞ. বর্তমান পাঠ্যক্রমে চলিত ভাষায় রচনা লেখতে বলা হয়েছে। চলিত ভাষায় ক্রিয়া ও সর্বনামের সমাপ্তি রূপগুলো জেনে নিতে হবে। চলিত ভাষায় বড় বড় শব্দ বা কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার না করে ছোট ছোট সহজ শব্দাবলী লেখাই উত্তম।
ট. উপসংহার লিখতে খুব চিন্তা করে সাজিয়ে লেখতে হবে। মনে রাখবে উপসংহারই রচনার মান নির্ণয়ের আসল দিক।
প্রবন্ধ রচনার কৌশল :
১. মালা গাঁথতে হলে যেমন নানারকম ফুল সংগ্রহ করতে হয়, তেমনই প্রবন্ধ রচনা করতে হলেও নানা চিন্তা-ভাবনা ও তথ্য জোগাড় করতে হয়। কোনো বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে হলে সে বিষয়ে যেসব চিন্তা ও তথ্য মাথায় আসে সেগুলো সংকেত সূত্র হিসেবে প্রথমে খসড়াভাবে টুকে রাখবে। ঐ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কোনো বই, পত্র-পত্রিকা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, মা-বাবা বা অন্য কারও সঙ্গে আলোচনা করে তথ্য সংগ্রহ করে তাও টুকে রাখবে। এগুলো হলো তোমার প্রবন্ধ রচনার উপকরণ।
২. মালা গাঁথার সময় যেমন এক রঙের ফুলকে অন্য রঙের সঙ্গে মিলিয়ে সাজাতে হয়, তেমনই প্রবন্ধ লেখার সময় প্রবন্ধের এক একটা দিককে গুরুত্ব অনুযায়ী সাজাতে হয়। প্রবন্ধ লেখার আগে তাই তোমার এলোমেলো সংকেত সূত্রগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে নেবে।
৩. প্রবন্ধ রচনার একটা সাধারণ কাঠামো রয়েছে। এর তিনটি অংশ: ভূমিকা, মূল অংশ ও উপসংহার। প্রবন্ধ রচনার সময় এই কাঠামোটি অনুসরণ করা দরকার।