উপস্থাপনা:
সমগ্র বিশ্ব যখন অজ্ঞানতা, অনাচার, কুসংস্কার ও পাপপঙ্কিলতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, যখন পৃথিবীর সর্বত্র মানবতা ভূলুণ্ঠিত, তখন মানবতার মুক্তির আলোকবর্তিকা হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করেন সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স)। এ মহামানব মানবতার মুক্তি ও শান্তির যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তার তুলনা সত্যিই বিরল। তিনি ইতিহাসে অতুলনীয়, অসাধারণ ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মহামানব।
জন্ম ও বংশ পরিচয়:
হযরত মুহাম্মদ (স) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে আগস্ট মোতাবেক ১২ই রবিউল আউয়াল, মতান্তরে ৫৭১ সালের ২০শে এপ্রিল, মোতাবেক ৯ই রবিউল আউয়াল সোমবার আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের হাশেমী গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ ও মাতার নাম আমেনা।
আল আমিন উপাধি লাভ:
Morning shows the day. তেমনি বাল্যকালেই প্রতীয়মান হয়েছিল যে, হযরত মুহাম্মদ (স) একদিন সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মানুষ হিসেবে মানবতাকে আলোকিত করবেন। সত্যবাদিতা, কর্মনিষ্ঠা, আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার কারণে বাল্যকালেই অধঃপতিত আরববাসীদের নিকট থেকে তিনি ‘আল আমীন’ উপাধি লাভ করেন।
সম্পর্কিত পোস্ট : মহানবী সাঃ এর জীবনী-রচনা: ৫০০,৭০০,১০০০ শব্দ- PDF (৩টি)
হারবুল ফুজ্জারে অংশগ্রহণ ও ‘হিলফুল ফুযুল’ গঠন
কিশোর মুহাম্মদ (স) পনেরো বছর বয়সে নিজের জাতিকে শত্রুকর্তৃক আক্রান্ত দেখে হারবুল ফুজ্জারে তাঁর চাচাদের সাথে অংশগ্রহণ করেন। তবে তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে আঘাত করেননি।
হারবুল ফুজ্জারের ঘটনা কিশোর মুহাম্মদ (স)-এর কোমল মনকে নাড়া দেয়। তাই তিনি আরবের বুকে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে একটি শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন।
নবুয়ত লাভ:
৬১০ খ্রিস্টাব্দে চল্লিশ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (স) আল্লাহর দূত হযরত জিবরাঈল (আ) মারফত অহীপ্রাপ্ত হন। আল্লাহর বিধান উচ্চকিত করার মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর কাঁধে।
ইসলাম প্রচার ও কুরাইশদের নির্যাতন:
নবুয়ত প্রাপ্তির পর মহানবি (স) সর্বপ্রথম গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিলে তাঁর নিকটাত্মীয় কয়েকজন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন। এরপর তিনি প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজ শুরু করেন। এ কারণে তাঁর ও নওমুসলিমদের ওপর শুরু হয় অত্যাচারের স্টিমরোলার।
মদিনায় হিজরত:
কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মহানবি (স) আল্লাহর নির্দেশে স্বদেশ ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন। ফলে ইসলাম প্রচারে যোগ হয় নতুন মাত্রা। শুরু হয় মহানবি (স)-এর মাদানি জীবন।
সম্পর্কিত পোস্ট : মহানবী সাঃ এর জীবনী রচনা : ৪০০ শব্দ
রাজনীতিবিদ:
হযরত মুহাম্মদ (স) ছিলেন একজন অতুলনীয় বিচক্ষণ, প্রজ্ঞাবান ও অনন্য আদর্শ রাজনীতিবিদ। মদিনা সনদ, হোদায়বিয়ার সন্ধি, বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভ তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় বহন করে।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা:
মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স) ছিলেন মানবাধিকারের শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা। ইসলাম নির্দেশিত মানবাধিকারের নীতিমালা বাস্তবায়নে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে বিশ্বের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা:
মানবতার মহান আদর্শ, নারী অধিকারের স্থাপক মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স) পরিবার ও সমাজজীবনে নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তোমাদের একের ওপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। রাসুল (স) ঘোষণা করেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করে।” সূরা নিসা-৩২
অর্থনৈতিক সংস্কার:
মহানবি (স)-এর আবির্ভাবকালে আরব উপদ্বীপে কোনো সুষ্ঠু অর্থনীতি ছিল না। সমাজের কমসংখ্যক লোকই ছিল বিত্তশালী। মদ, জুয়া, প্রতারণা, লুটতরাজ ছিল অর্থোপার্জনের প্রধান উপায়। তাই মহানবি (স) সুষ্ঠু অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কার সাধন করেন।
তাঁর প্রবর্তিত রাজস্ব ব্যবস্থায় আয়ের উৎস ছিল মালে গনীমাহ, ফাই, যাকাত, জিযিয়া ও খারাজ। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সব রকমের বিপন্ন লোকদের জন্য বায়তুলমাল থেকে স্থায়ীভাবে সাহায্যের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ‘মিতব্যয়িতা ও শস্য ফলাও’ নীতি ছিল মহানবি (স)-এর অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম দিক।
সম্পর্কিত পোস্ট : রচনা : বিদায় হজ (২০ পয়েন্ট)
দাস প্রথার উচ্ছেদ:
মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স) আরবসমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা দাস প্রথার উচ্ছেদ সাধনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে মানবতার মর্যাদাকে সমুন্নত করেন। তিনি ঘোষণা করেন, “দাসকে মুক্তিদানের চেয়ে সর্বোত্তম কাজ আল্লাহর কাছে আর কিছুই নেই।”
সামাজিক বৈষম্যের অবসান:
রাসুল (স) আরবসমাজে বিদ্যমান ধনী-গরিব, উঁচু-নীচু, সাদা-কালোর ব্যবধান ও বৈষম্যের অবসান ঘটান। তিনি “হাবশি গোলাম আর কুরাইশদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই বলে ঘোষণা করেন।”
জীবন, সম্পত্তি ও বিধর্মীদের নিরাপত্তা বিধান:
মহানবি (স) সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান করেন। তিনি দুনিয়ার সকল ধর্মানুসারীদের সমমর্যাদা প্রদান করেন।
শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তার:
শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারের প্রতি মহানবি (স) সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। কেননা মানব সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি জীবনীশক্তি। তিনি ঘোষণা করেন, “প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর জ্ঞানার্জন করা ফরজ।”
শ্রেষ্ঠ আদর্শবান :
রাসুল (স) ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদর্শ মানুষ। স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন, “রাসুল (স)-এর জীবনেই রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।”
শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক:
মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ, পরকালে একমাত্র সুপারিশকারী ও সর্বশেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (স) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর মতো দক্ষ, সুযোগ্য, বিচক্ষণ ও সফল রাষ্ট্রনায়ক তাঁর আগেও ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না।
সামরিক সংস্কার:
সামরিক ক্ষেত্রেও মহানবি (স)-এর সংস্কার লক্ষণীয়। একজন দক্ষ রণকুশলী হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। যুদ্ধ ও সংগ্রামে নেতৃত্ব দান করেই তিনি দ্বীনকে বিজয়ী শক্তির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। খোদাদ্রোহী ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতি ইঞ্চি ভূমি রক্ষার জন্য তিনি নিয়মিত সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।
উপসংহার:
সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স) পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি যিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাফল্য ও শ্রেষ্ঠত্বের নজির স্থাপন করেছেন। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। তাই তিনি আমার সর্বাধিক প্রিয় মহাপুরুষ। Encyclopedia Britanica-তে স্পষ্টতই বলা হয়েছে- Of all the religious personalities Hazrat Muhammad (sm) was the most successful.