ভূমিকা :
সুজলা-সুফলা এই দেশে প্রকৃতির এক অনবদ্য দান হচ্ছে ফুল। প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এই ফুল। সব মানুষের মনে ফুল আনন্দের বন্যা বয়ে আনে। এ জন্যই পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ভিন্ন ভিন্ন ফুলকে দেয়া হয়েছে জাতীয় মর্যাদা। তেমনি আমাদের দেশে শাপলাকে দেয়া হয়েছে জাতীয় ফুলের মর্যাদা।
প্রকারভেদ :
শাপলা জলজ ফুল। এর জন্ম জলে। আমাদের দেশে সচরাচর সাদা শাপলা বেশি দেখা যায়। সাদা শাপলা ছাড়াও আরও দুই ধরনের লাল ও নীল শাপলা দেখতে পাওয়া যায়। তাই সাদা শাপলাকেই বাংলাদেশের ‘জাতীয় ফুল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শাপলার জন্ম :
বর্ষা ঋতুতে যখন মাঠ-ঘাট, খাল-বিল পানিতে ভরে যায় তখনই তা মাটির ভিতর থেকে অঙ্কুরিত হয়। মাটির ভিতরে এর মূল থাকে। শুকনো মৌসুমে এর মূল মাটির নিচে লুকানো থাকে। শাপলা জলে জন্মে। বর্ষা মৌসুমে সর্বত্র জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বিল-ঝিল, পুকুর-হাওর, দিঘি-ডোবা, ছোট-বড় জলাশয়ে শাপলা ফুল দেখতে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে অসংখ্য শাপলার সৌন্দর্যে ভরে ওঠে বাংলার জলাভূমি।
বিবরণ :
বর্ষাকালে পানির সংস্পর্শে শাপলার কান্ড বা ডাঁটা বের হয়। মূলের ভিতর থেকে সরু নলের মতো একটি করে দন্ড জন্মাতে থাকে এবং তা পানির উপরে ওঠে পাতা গজায়। দীর্ঘ এ দণ্ডটি দেখতে সবুজ ও নরম। এ দণ্ডটি সাধারণত পানির নিচে থাকে। পানির গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে শাপলা বৃদ্ধি পায়। শাপলার একটি স্তবকে কয়েকটি পাপড়ি থাকে। আর পাপড়িগুলোর মাঝখানে থাকে হলুদ রঙের পরাগধানী।
শাপলা গাছের পাতাগুলো পানির ওপর ভাসতে থাকে। এ পাতা দেখতে মসৃণ ও গাঢ় সবুজ। শাপলা ফুল যখন পরিপূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়, তখন সে সৌন্দর্য সত্যিই অপূর্ব। এ অপরূপ সৌন্দর্যে সবাই মুগ্ধ ও বিস্মিত। এভাবে শাপলা তার সৌন্দর্য বিতরণ করতে করতে একসময় ম্লান হয়ে পড়ে। ঝরে পড়ে তার পাপড়ি। শাপলা তখন ফুল থেকে ফলে রুপান্তরিত হয়। এ ফলের স্বাদ পেতে চায় সবাই।
শাপলার ব্যবহার :
শাপলার সৌন্দর্য শুধু আমাদের মুগ্ধই করে না, শাপলা যখন ফলে রুপান্তরিত হয়, তখন তা মানুষের উপাদেয় খাদ্য রূপে বিবেচিত হয়। শাপলার দণ্ড আমাদের দেশে সুস্বাদু তরকারি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। এছাড়াও শাপলা ফল, দন্ড ও শিকড় দ্বারা নানারকম কবিরাজি ওষুধ তৈরি করা হয়।
জাতীয় মর্যাদায় শাপলা:
প্রকৃতির সাবলীল দান হিসেবে শাপলা অনন্য-সাধারণ। হাজারো ফুলের ভিরে শাপলা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। শাপলার মতো সরল অথচ নয়নাভিরাম সৌন্দর্যমণ্ডিত বৈশিষ্ট্য অন্য কোনো ফুলে নেই। শাপলার স্নিগ্ধ নরম সুরভী অতি বিস্ময়কর।
বাংলাদেশের সকল জায়গায় শাপলা পাওয়া যায়। তাই শাপলাকে জাতীয় ফুলের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আমাদের জাতীয় প্রতীক হলো উভয় পাশে ধান শীষ বেষ্টিত পানিতে ভাসমান শাপলা। আমাদের মুদ্রায়ও শাপলার প্রতিচ্ছবি রয়েছে। ডাক টিকিট ও মুদ্রায় ব্যবহৃত হয় শাপলা ফুলের ছবি। শাপলা তাই আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
শাপলার রঙ ও বৈচিত্র্য :
শাপলা বিভিন্ন জাতের হয়। এক রকম ফুল হয় লাল এবং ডাঁটা বেশ লম্বা, মোটা ও সতেজ। বড় পুকুর ও দিঘিতে এ ধরনের শাপলা জন্মে। আরেক প্রকার বেগুনি রঙের শাপলা ফুল রয়েছে, যেগুলোর ডাঁটা খুবই সরু। খাল, বিল, ডোবা, লেক প্রভৃতি অগভীর পানিতে এ ধরনের শাপলা জন্মে।
এছাড়া আমাদের দেশে লাল, নীল, শ্যামল ও সাদা শাপলা ফুল রয়েছে। সাদা শাপলার পাপড়ি বিভিন্ন ধরনের। প্রথমে পাপড়িগুলো বাইরের দিকে সবুজ কিন্তু ভেতরের দিকে সাদা অবস্থায় থাকে। মাঝখানে সরু চিকন চিরুনির দাঁতের মতো পাপড়িগুলো অনেকটা হলুদ রঙের। শাপলা ফুলের বিশেষ কোনো সুবাস নেই, কিন্তু পানির উপর তার মৌন অবস্থান আমাদেরকে মুগ্ধ করে।
শাপলা যেথায় ফোটে :
এদেশের খাল, বিল, পুকুর, ডোবা, নালা, ঝিল ইত্যাদি পানিময় স্থানে শাপলা জন্মাতে পারে। নিম্নভূমিতে যেখানে পাট চাষ হয় সেখানেও শাপলা জন্মাতে দেখা যায়। শাপলার চাষ করতে হয় না। বর্ষার স্পর্শ পেয়ে চিকন সুতোর মতো একটি দণ্ড গজাতে থাকে।
শাপলার মূলের গোড়ায় গোল আলুর মতো একটি পিণ্ড গজায়, এটাকে শালুক বলে। এজন্য শাপলা ফুলের অপর নাম শালুক ফুল। মূল অংশটি থেকে শাপলার দণ্ড বা ডাঁটা এবং ডাঁটার মাথায় নীলাভসবুজ গোলাকার পাতাগুলো পানির উপরে ভাসতে থাকে। ডাঁটার মাথায় ফোটে শাপলার ফুল।
শাপলার সৌন্দর্য:
বর্ষার মাঝামাঝি থেকে পুরো শরৎ কালটায় শাপলা ফুলের সমাহার দেখা যায়। এ ফুল রাতের বেলায় ফোটে। দিগন্তব্যাপী বিলের পানিতে বর্ষার সকালে ফুটন্ত শাপলা যে শোভা এবং সৌন্দর্য ছড়ায় তা সত্যিই উপভোগ্য। এই মনোহর নয়নাভিরাম রূপময় শোভা দেখেই বোধ হয় পল্লিকবি গেয়েছিলেন-
‘দিনে সেথায় ঘুমিয়ে থাকে লাল শালুকের ফুল
রাতের বেলা চাঁদের সনে হেসে না পায় কূল।’
শাপলার শুভ্র হাসি :
টলমল দিঘির পানিতে; বদ্ধ পুকুরের পানিতে, ধানের ক্ষেতে, দিগন্ত বিস্তৃত বিলের পানিতে প্রস্ফুটিত শাপলা ফুলের এক অপূর্ব শোভা জলময় প্রশস্ত বিলের পানিতে সবুজ পাতার গালিচার উপর হাজার হাজার শাপলা ফুলের শুভ্র হাসি প্রাকৃতিক শোভার এক অনুপম রূপ, এক অতুলনীয় ছবি।
কবিগুরু বলেছেন- “নিস্তরঙ্গ গঙ্গায় নৌকা ভাসিয়ে সূর্যোদয়ের শোভা দেখে নাই, বাংলার শোভা সে দেখে নাই বলিলেও চলে।” তাঁর কথার অনুসরণ করে বলা চলে, বাংলাদেশের টলমল বিলের জলে হাজার হাজার প্রস্ফুটিত শাপলা ফুলের শুভ্র হাসি যে দেখেনি বাংলার রূপ পুরাপুরি সে দেখেনি বললেও চলে। মনে হয় যেন আকাশের অগণিত তারকারাজি বিলের জলে ঝরে পড়ে ভাসছে।
দেশজ ফুল :
দেশজ ও বিদেশি বহু প্রকারের ফুল গৃহের আঙ্গিনায় শোভাবর্ধন করে। কত লোকের বাগিচায় কত বর্ণাঢ্য গন্ধময় ফুলের সমাবেশ। বহু গৃহে বহু অর্থ ব্যয়ে তার চাষাবাদ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। তাদের মধ্যে গোলাপ, চাঁপা, সূর্যমুখী, জুঁই, শেফালী, গন্ধরাজ, কামিনী, হাসনাহেনা ইত্যাদি।
এদের সুগন্ধ ও সুষমা অফুরন্ত; এদের রূপ প্রাণ মাতানো। তা সত্ত্বেও এদের কোনটাই জাতীয় ফুলের মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। কারণ, তারা সংখ্যায় অল্প, তারা অনেকেই এ দেশের সম্পদ নয়, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত।
খাদ্য হিসেবে এর ব্যবহার:
বর্ষা মৌসুমে গ্রামের হাটে বিলাঞ্চল থেকে নৌকা ভর্তি হয়ে শাপলার আমদানি হয় এবং তরকারি হিসেবে বিক্রি হয়। এটি কৃষিজাত তরকারির তুলনায় খুবই সস্তা। শাপলা শহরের বাজারেও প্রচুর আমদানি হয় এবং অনেকেই এ তরকারিটি আগ্রহ সহকারে ক্রয় করে থাকে। হয়ত তার সাথে অনেকের মনে পড়ে ফেলে আসা গ্রামের স্মৃতি, শাপলা বিলের অপরূপ স্মৃতি।
শাপলার জাত :
শাপলার কয়েকটি জাত আছে, যেগুলোর মধ্যে খাদ্যগুণ ও ব্যবহারে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা যায়। লাল ও মোটা ডাঁটাযুক্ত জাতটি সাধারণত রান্নার জন্য বেশি ব্যবহৃত হয়, কেননা এর ডাঁটা তুলনামূলক নরম ও সুস্বাদু। অন্যদিকে বেগুনি রঙের সরু জাতটির ফলন কম হওয়ায় তা খাদ্য হিসেবে ততটা ব্যবহৃত হয় না, তবে এটি বিভিন্ন কবিরাজি ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
শাপলার পরিস্ফুটন কাল :
বর্ষা ও শরৎ শাপলা ফোটার ভরা মৌসুম। এসময় বাংলার মাঠ-ঘাট-পুকুরে সর্বত্রই শাপলার সমারোহ দেখতে পাওয়া যায়। বর্ষায় মেঘময় প্রহরে শাপলা তার অপূর্ব সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেয়। শরতের জোছনামাখা রাত শাপলার পরিস্ফুটনে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
উপসংহার :
শাপলা একান্তভাবেই বাংলাদেশের ফুল। এ ফুল গ্রামবাংলার সাদাসিধে মানুষের প্রতীক। এ ফুল জাতীয় মর্যাদা পেয়ে সব শ্রেণির ফুলকে ছাড়িয়ে গেছে। আর তাই আমাদের সরকারি মুদ্রায়, ডাকটিকিটে, সরকারি দলিলপত্রে শাপলা ফুলের মর্যাদাপূর্ণ আসন। শরতের জোছনায় শাপলার শুভ্র হাসি যে দেখেনি, সে বাংলার রূপও পুরাপুরি বুঝতে পারেনি।