ভূমিকা:
চির সবুজের দেশ বাংলাদেশ। ভোরের আলোয় জেগে ওঠে এদেশ। সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়ে এদেশের বুকে সবুজ পাতার আড়ালে দোয়েল শিস দেয়। যে দিকে যাই, পায়ের নিচে পড়ে নরম সবুজ ঘাস। যে দিকে তাকাই, দেখি সবুজের সমারোহ এর প্রকৃতির নানা রূপ নানা রঙ। এদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য নদী। এদেশের মতো এত নদনদী বিশ্বের আর কোনো দেশে চোখে পড়ে না। এ নদীগুলো বাংলা মায়ের পরম সম্পদ।
বাংলাদেশের নদ নদীর পরিচয়:
নদীমাতৃক বাংলাদেশে সর্পিল আকারে রয়ে গেছে অসংখ্য নদী। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র এদেশের বড় নদী। এছাড়াও রয়েছে মাঝারি ও ছোট ছোট অনেক নদী। যেদিকেই আমাদের চোখ যাক না কেন সেদিকেই নদীর মনোরম দৃশ্য চোখে পড়বে।
উৎপত্তি:
বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর উৎপত্তি হিমালয় পর্বত থেকে। তাছাড়া প্রায় সব নদী ভারতের মধ্যদিয়ে এদেশে এসে প্রবেশ করেছে। ভারতের গঙ্গা নদী রাজশাহীর নিকট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে পদ্মা নামে। তিব্বতের মানস সরোবরে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্র নদ আসামের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদী ভারতের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশের প্রধান নদনদী :
বাংলাদেশের সবগুলো নদীর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা বেশ কঠিন। ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া, আঁকাবাঁকা মৌসুমি খাড়ি, কর্দমপূর্ণ খালবিল, যথার্থ দৃষ্টিনন্দন নদ-নদী ও এদের উপনদী এবং শাখানদীর সমন্বয়ে বাংলাদেশের বিশাল নদীব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
কিছু কিছু স্থান যেমন- পটুয়াখালী, বরিশাল এবং সুন্দরবন অঞ্চলে নদীনালা এত বেশি যে সে অঞ্চলে প্রকৃতই নদীজালিকার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদীগুলো হলো- পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, সাঙ্গু, ফেনী ও কর্ণফুলী।
শাখা নদী ও উপনদী :
বড় বড় নদীগুলোর শাখা নদী ও উপনদী এদেশকে করেছে নদীমাতৃক। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও বুড়িগঙ্গা এ চার নদীর অসংখ্য শাখা নদী ও উপনদী সমস্ত দেশকে ঘিরে রেখেছে। কুশিয়ারা, মধুমতি, গড়াই, আত্রাই, রূপসা, আড়িয়াল খাঁ, পশুর, শীতলক্ষ্যা, তিতাস, কুমার, মাথাভাঙা, মহানন্দা, ধানসিঁড়ি, ভৈরব, কপোতাক্ষ, বড়াল ইত্যাদি শাখা নদী ও উপনদী। এদেশের যে দিকেই তাকাই না কেন শুধু নদী আর নদী।
পদ্মা:
পদ্মা বাংলাদেশের প্রধান নদী। উত্তর ভারতের হিমালয়ের গঙ্গোত্রী নামক হিমবাহ থেকে এর উৎপত্তি। এটি ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রাজশাহী জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে এসে পদ্মা নাম ধারণ করে আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। ভারতে এই নদীর নাম গঙ্গা। পদ্মা গোয়ালন্দের কাছে এসে যমুনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এ মিলিত স্রোেত পদ্মা নামেই দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরে মেঘনার সাথে মিশেছে।
মেঘনা:
মেঘনা বাংলাদেশের আরেকটি প্রধান নদী। এ নদী আসামের নাগা-মনিপুর পাহাড়ের দক্ষিণ লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে সিলেট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পরে পদ্মা ও যমুনার সাথে মিলিত হয়ে মেঘনা নামেই বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এই নদীর বেশ কিছু উপনদী ও শাখানদী রয়েছে।
যমুনা:
যমুনা নদীর উৎস হিমালয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী। তিব্বতের সানপু নদীটি আসামের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নাম নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দেওয়ানগঞ্জের কাছে এ নদীটি একটু পূর্ব দিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নামে এবং অপর শাখাটি দক্ষিণ দিক দিয়ে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়ে পদ্মার সাথে এসে মিশেছে। ধরলা, তিস্তা ও করতোয়া যমুনার প্রধান উপনদী। ধলেশ্বরী যমুনার প্রধান শাখানদী। পূর্ব-দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত এর শাখা নদীটির নাম বুড়িগঙ্গা।
ব্রহ্মপুত্র:
হিমালয় পর্বতের কৈলাশ শৃঙ্গের মানস সরোবর হ্রদ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ উৎপন্ন হয়ে তিব্বত ও আসামের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং রংপুর জেলার কুড়িগ্রামের কাছে এসে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর একটি শাখা দক্ষিণ দিকে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়ে পদ্মার সাথে মিলিত হয়েছে। অপর শাখাটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীর সাথে মিশেছে। ব্রহ্মপুত্র নদীর পূর্বনাম লৌহিত্য।
কর্ণফুলী :
কর্ণফুলী আসামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এটি প্রায় ২৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। হালদা, বোয়ালখালী ও কাসালং কর্ণফুলীর প্রধান উপন্দী। কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশের প্রধান নদী বন্দর চট্টগ্রাম এ নদীর তীরে অবস্থিত।
সাঙ্গু ও ফেনী :
সাঙ্গু নদী মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমার আরাকানের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলী নদীর মোহনার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
ফেনী নদী পার্বত্য ত্রিপুরায় উৎপন্ন হয়ে ফেনী জেলার পূর্ব সীমানা দিয়ে সন্দীপের উত্তরে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
নদনদীর সৌন্দর্য :
বাংলাদেশের নদনদীগুলোর রূপ অত্যন্ত নয়নাভিরাম ও মনোরম। সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা, জালের মতো নদীগুলোতে যখন পালতোলা নৌকা চলে তখন সে নয়নাভিরাম দৃশ্যে সবাই মোহিত হয়ে যায়। এদেশের নদীর দুই তীরে ঘরবাড়ি, কাঁশবন ছবির মতো। নদীগুলোর এ রমণীয় সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবি কায়কোবাদ বলেছেন-
‘বাংলার নদী কি শোভাশালিনী
কি মধুর তার কুল কুল ধ্বনি।’
নদ-নদীর অবদান :
বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। নদী এদেশের কৃষিকাজের প্রধান সহায়ক। নদীর পলিমাটি কৃষি উৎপাদনকে বৃদ্ধি করে এবং নদীর পানি কৃষি ভূমিতে সেচের মাধ্যমে বৃষ্টির অভাবকে দূর করে। নদীপথ বাংলাদেশের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম উপায়। নদী বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
ভূমি গঠনে নদী :
বাংলাদেশের বিশাল ভূ-ভাগ উর্বর পলিবাহিত মাটি দ্বারা গঠিত। এ উর্বর মাটি গঠনে নদীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নদনদীর কারণে বন্যার সময় পানিবাহিত মাটি বিভিন্ন জায়গায় এসে পড়ে। এ পলিমাটি ফসল উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণে সাগরতল থেকে বিরাট নতুন চর জেগে উঠেছে। ভবিষ্যতে নদনদীর কারণে এরকম আরও বিরাট ভূখন্ড আমরা পেতে পারি।
নদীর উপকারিতা:
এদেশে অসংখ্য নদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে। আর আমাদের কৃষিপ্রধান দেশের প্রাণ হলো নদ-নদী। বর্ষার সময় নদীবিধৌত পলি এদেশের জমিকে করে উর্বর। এই উর্বর জমিতে ফলে সোনালি ফসল। যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নদীগুলো রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। নৌপরিবহনে খরচ কম হওয়ায় লোকজন খুব সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত ও মালামাল পরিবহন করতে পারে।
এদেশের নদীতে রয়েছে প্রচুর ‘পরিমাণে মৎস্য সম্পদ। নদী থেকে মাছ ধরে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করে। এই মাছই আমাদের আমিষের ঘাটতি পূরণ করে। নদীর প্রবল স্রোত থেকে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ। আর এই বিদ্যুতের আলোতেই আলোকিত সারা দেশ।
অপকারিতা :
নদীর ভাঙনে অনেক শহর, বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদীতে বন্যা হলে জমির ফসল ও জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশার সীমা থাকে না। নদীতে অনেক ময়লা-আবর্জনা, শবদেহ প্রভৃতি পানিকে দূষিত করে এবং এতে জন্ডিস, আমাশয় ও উদরাময়সহ বহু মরণব্যাধি হয়।
নদী রক্ষা ও ভাঙনে করণীয়:
নদীর আবহাওয়া স্বাস্থ্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক। এজন্য বাঁধের মাধ্যমে এর অপকারিতা হতে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। তাই নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত খনন আর নদীভাঙন থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন নদীর তীরে বৃক্ষরোপন।
নদীভাঙনে আর্থ-সামাজিক প্রভাব :
নদীভাঙনের আর্থ-সামাজিক প্রভাব মারাত্মক। উল্লেখ্য, অধিকাংশ নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন একে প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে ধরে নেয়। আবার অনেকে আল্লাহর গজব বলে এই দুর্যোগকে মেনে নিয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরিবর্তে দোয়া-মানত ইত্যাদির শরণাপন্ন হয়। আজ জাতীয় দারিদ্র্যের একটা বড় কারণ এই নদীভাঙন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীভাঙনের কারণে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং বিপদাপন্ন লোকের সংখ্যা আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীভাঙনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত লোকের জমি, বসতভিটা, ফসল, গবাদি সম্পদ, গাছপালা, গৃহসামগ্রী সবকিছুই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নিঃস্ব, রিক্ত, সর্বস্বান্ত মানুষ ভূমিহীনের কাতারে সামিল হয়ে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায়।
নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা :
নদীপথে যাতায়াত সুবিধা এবং নদী উপত্যকাসমূহের পলিমাটি উৎকৃষ্ট কৃষিভূমি হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাসমূহ নদী উপত্যকায় গড়ে উঠেছে। নাব্য নদ-নদীসমূহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নগর গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রধান শহর, নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্রসমূহ বিভিন্ন নদীর তীরে গড়ে উঠেছে, যেমন- বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাকা মহানগরী, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর, কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে ময়মনসিংহ শহর গড়ে উঠেছে। সত্যিই সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা নদীমালা বাংলাদেশের গর্ব।
উপসংহার :
অপকারিতা থাকলেও নদনদী থেকে উপকারিতাই বেশি। নদনদীগুলো বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়েছে। আবার জমিকে উর্বরতা দিয়েছে। নদী আছে বলেই আমাদের কৃষি জমিগুলো এত উর্বর। তাই আমাদের কৃষি অর্থনীতি নদীর কাছে ঋণী। বস্তুত এ নদীগুলোর জন্যই বাংলার জীবনধারা হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত, সজীব ও সতেজ।