কাজী নজরুল ইসলাম রচনা (২০ পয়েন্ট)

উপস্থাপনা :

মানুষ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। প্রতিভাবান মানুষ অন্যকে আকর্ষণ করে, ফলে সে অন্যের নিকট প্রিয় হয়ে ওঠে। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কাব্যের শান্ত সরোবরে সমুদ্রের তরঙ্গ সঞ্চারিত করেছেন। তাই বাঙালি পাঠকের কাছে তাঁর প্রধান পরিচয় বিদ্রোহী কবি। তিনি মুসলিম জাতীয়তাবাদের অগ্রসেনানী। তিনি আমার প্রিয় কবি।

জন্ম ও বংশ পরিচয় :

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ (১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে) এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ ও মাতার নাম জাহেদা খাতুন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, কবির পূর্বপুরুষ চুরুলিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। আট বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান। নজরুলের জীবনে তাঁর চাচা ফজলে করিমের প্রভাব অপরিসীম। তাঁর বাল্যশিক্ষা অসমাপ্ত থেকে যেত যদি তিনি চাচার সহায়তা না পেতেন।

বাল্যকাল :

বাল্যকালে তিনি খুব ডানপিটে ও স্বাধীনচেতা ছিলেন। কোনো বাঁধাধরা নিয়ম-কানুন তিনি পছন্দ করতেন না। এজন্য নিয়মিত স্কুলেও যেতেন না। পিতৃহীন হওয়ার কারণে কবি পরিবারে আয়-রোজগারের কেউ ছিল না। ফলে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন খুব কষ্টে কাটত। সাংসারিক খরচ মেটাতে তাকে বাল্য বয়সেই বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হতে হয়েছে।

শিক্ষাজীবন :

প্রথমে তিনি গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা করেন। বাংলাভাষা ছাড়া তিনি আরবি এবং ফারসি ভাষাও শিক্ষা করেন। তিনি অত্যন্ত সুন্দর করে কুরআন পড়তে পারতেন। নজরুল ১০ বছর বয়সে ঐ মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় পাস করেন। তারপর তিনি রাণীগঞ্জের নিকটবর্তী শিয়ারশোল রাজস্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু স্বাধীনচেতা নজরুলের স্কুলের নিয়মকানুন পছন্দ হলো না।

তাই সেখান থেকে তিনি আসানসোলে পালিয়ে যান এবং একটি রুটির দোকানে মাসিক ৫ টাকা বেতনে কাজ করতে থাকেন। এ সময় ময়মনসিংহ জেলার কাজী রফিক উদ্দীন আসানসোলের দারোগা ছিলেন। তিনি নজরুলের চোখেমুখে বুদ্ধির দীপ্তি দেখে তাঁকে স্বগ্রামে নিয়ে যান এবং ময়মনসিংহ জেলাধীন ত্রিশালের দরিরামপুর হাই স্কুলে ভর্তি করান। তিন বছর পর নজরুল সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে সিয়ারসোল স্কুলে ভর্তি হন।

ছন্নছাড়া জীবন :

পড়ালেখার বাধাধরা নিয়ম তার ভালো লাগত না। এজন্য তিনি আসানসোলে একটি রুটির দোকানে কাজ শুরু করেন। এ সময়ে তিনি নানা ধরনের পুঁথি পড়তেন। সংসারে অভাব-অনটনের কারণে কবিকে অনেক কাজ করতে হয়েছিল। অর্থ উপার্জনের জন্য তিনি লেটোর দলে যোগ দেন। এসব করেও সংসারের অভাব মিটছিল না বলে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। আরম্ভ হয় তাঁর সৈনিক জীবন।

সৈনিক জীবন :

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। কবি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। লেখাপড়া ছেড়ে ১৪নং বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে তিনি করাচি চলে যান। সৈন্য বিভাগে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি হাবিলদার কোয়ার্টার মাস্টার পদে উন্নীত হন। সেখানেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি বিয়ে করেন প্রমীলা দেবীকে। কিন্তু ঘরের মোহ তাঁর সদাচঞ্চল জীবনকে কোনোভাবেই রুদ্ধ করতে পারেনি।

জাতীয় আন্দোলন :

বাংলা সাহিত্যে তিনি সংযোজিত করেছেন এক নতুন মাত্রা- বিদ্রোহ। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষকে তিনি বিদ্রোহের মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী শাসকের যুগেই তাঁর আবির্ভাব। তিনি সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তিমূলে চপেটাঘাত করেন। তাঁর কাব্যিক শক্তি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে এক নতুন আবহ যোগ করেছিল।

চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য :

অসাধারণ প্রাণশক্তি ছিল লেখক-কবি নজরুলের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাঁর হৃদয়বোধ ছিল অসামান্য। এ হৃদয়বোধ থেকেই তিনি চারপাশের মানুষের সমস্যার দিকে তাকিয়েছেন। তাই অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, নির্যাতন, অসাম্য আর অসত্যের বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহ করেছেন। দেশবাসীকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

মুসলমানদের অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের জাগরণের বাণী শুনিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে নজরুল কেবল লেখক-কবি নন, মানবতার একজন সচেতন প্রবক্তা। নজরুল শুধু মননধর্মী লেখক-কবিই নন তিনি হৃদয়ধর্মী লেখক-কবি, ভাবাবেগই তাঁর বৈশিষ্ট্য। তাঁর ভাবাবেগে যা প্রকাশ পেয়েছে তা সর্বজনস্বীকৃত ও সর্বকালের সত্য।

কবি প্রতিভা :

১৯১৮ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ ছাপা হয়। এ কবিতা রচনা করে নজরুল অশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ১৯২০ সালে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ছাপা হয়। এরপর তিনি অজস্র রচনার মাধ্যমে পাঠকদেরকে বিস্ময়াভিভূত করে দেন। অসংখ্য কবিতা ও ইসলামী সংগীত রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তোলেন।

প্রতিভার উৎস:

প্রথম মহাযুদ্ধের অবসান হলে মহাযুদ্ধের স্মৃতি ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দাবাগ্নি জ্বালিয়ে বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন কবি। যুদ্ধক্ষেত্রে বসে রচিত তাঁর কবিতা ‘মুক্তি’ এরই মধ্যে পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এবার তিনি বিদ্রোহের বহ্নিচ্ছটা নিয়ে বাংলা কবিতার আসরে অবতীর্ণ হলেন।

কাব্য সাধনা :

তিনি আজীবন কাব্য সাধনা করে গেছেন। বিদ্রোহী, কামাল পাশা, সর্বহারা, ফণিমনসা, জিঞ্জির প্রভৃতি নজরুলের জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। তাছাড়া ‘আলেয়া’, ‘ঝিলিমিলি’ প্রভৃতি নাটকও তিনি রচনা করেন। ব্যথার দান, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা প্রভৃতি উপন্যাস তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি।

বহুমুখী প্রতিভা :

কবি নজরুল ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, কুরআনের অনুবাদ, ইসলামী সাহিত্য, শ্যামা সংগীত, ইসলামী সংগীত ইত্যাদি সবকিছুতেই তাঁর দখল ছিল। তিনি ভালো গায়কও ছিলেন। তাঁর বহু গানের রেকর্ড আছে। তাঁর গজল আজও বাংলার মুসলমানদেরকে আলোড়িত করে।

অসাম্প্রদায়িক নজরুল:

ভারতবর্ষে একদিকে যখন স্বাধীনতার আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে, অন্যদিকে তখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করেছিল। নজরুল তখন ডাক দিলেন-

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?- ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী, বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’

এভাবে তিনি হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতির মিলনমন্ত্র রচনা করে গেছেন। নজরুলের কাব্য তাই হিন্দু-মুসলমানের মিলনতীর্থ।

সংবর্ধনা, পুরস্কার ও সম্মাননা :

১৯২৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর কলকাতা অ্যালবার্ট হলে মাত্র তিরিশ বছর বয়সে নজরুলকে জাতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়।

১৯৪৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ দিয়ে ও ১৯৬০ সালে ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৭৬ সালে কবিকে দেওয়া হয় ‘একুশে পদক’।

প্রেম ও সৌন্দর্যের পূজারি নজরুল :

কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম ও সৌন্দর্যের পূজারি। প্রেম নজরুল কবিতার এক বিশিষ্ট রূপ। কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহের কথাই বলেননি, প্রেমের কথাও বলেছেন। তাঁর কাব্যে প্রেম প্রতিমা রূপ ধরে এসেছে। এই প্রেম কবিকে তা পাওয়ার জন্য যেমন মশগুল করেছে তেমনই না পাওয়ার বেদনায় করেছে বেদনাহত। তাই কবি শেষ অভিভাষণে বলেছিলেন, “বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি। আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম; সে প্রেম পেলাম না বলে এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।”

বাংলাদেশে নজরুল :

বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ ব্যবস্থাধীনে নজরুলকে ১৯৭২ সালে ঢাকায় আনা হয়। ধানমণ্ডিতে তাঁর বসবাসের জন্য একটি বাড়িও বরাদ্দ করা হয়। তিনি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পান। ওই বছরই ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে জাতীয় পুরস্কার ‘একুশে পদক’-এ সম্মানিত করা হয়। এরপর থেকে তিনি যতদিন বেঁচেছিলেন বাংলাদেশেই ছিলেন। প্রতিদিন কবির বাসায় কবির অসংখ্য ভক্ত তাঁকে দর্শন দিতে আসতেন। তাঁর জন্য বিভিন্ন উপহার আনতেন। কিন্তু কবি ছিলেন নির্বাক। কেবল তাকিয়ে থাকতেন। কোনোপ্রকার কথা বলতে পারতেন না।

তিনি আমার প্রিয় কবি :

আমি অন্যায় পছন্দ করি না। অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দিতে চাই না। সাধ্যানুযায়ী অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করি। আমার প্রিয় কবি, একজন বিদ্রোহী কবি। তিনি তাঁর ভাষা ও শক্তি দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি কবিতা লিখেছেন। একমাত্র নজরুলই নির্ভয়ে বলতে পেরেছেন-

“কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট”, লাথি মার ভাংরে তালা, যত সব বন্দিশালা আগুন জ্বালা’ এসব জ্বালাময়ী কবিতা। তিনি শুধু কবিতাই লেখেননি; বরং বাঙালি পল্টনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে সৈনিক জীবন বরণ করেন। এজন্য তিনি আমার প্রিয় কবি।

দুরারোগ্য ব্যাধি:

১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে কবি মস্তিষ্কের পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রায় তেরো বছর পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় প্রথমে ইংল্যান্ডে, পরে ভিয়েনায়। কিন্তু তাঁর রোগ নিরাময়যোগ্য নয় বলে মত দেন ডাক্তাররা। দীর্ঘদিন ধরে কবি ছিলেন প্রায় জীবন্মত, নির্বাক।

মৃত্যু :

এ মহৎ কবির সুস্থ আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র তেতাল্লিশ বছর। মৃত্যুর পূর্বে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং এতে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

উপসংহার :

নজরুলের সৃষ্টি অনেক। শুধু কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটকই নয়; তিনি অসংখ্য সংগীতও রচনা করে গিয়েছেন। নজরুল নিজেও খুব ভালো গাইতে পারতেন। তার বহু গান রেকর্ড হয়েছে। নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত বিশেষ প্রসিদ্ধ। নজরুল ইসলাম নিঃসন্দেহে বাংলা ও বাঙালির। তিনি শিশুদের জন্য যেমন লিখেছেন তেমনই বড়োদের জন্য লিখেছেন। তিনি প্রচুর ইসলামি গান রচনা করেছেন। তিনি সাম্যের কথা বলেছেন, মানবতা প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন।


Author

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment