উপস্থাপনা:
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতু বৈচিত্র্য ও আবহাওয়ার বিভিন্নতায় বাংলাদেশ বিশ্ব ভৌগোলিক মানচিত্রে এক বিস্ময়কর দেশ। ছয়টি ঋতু নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে পর্যায়ক্রমে আবির্ভূত হয় এ দেশে। এসব ঋতুর অন্যতম হলো শীতকাল। শীতকাল একদিকে ঋতুরাজ বসন্তের পূর্বাভাস, অন্য দিকে বৈচিত্র্য, ঐশ্বর্য, হরেক রকমের নবান্ন, পিঠা, পায়েস, সুমিষ্ট খেজুর রসসহ চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যের স্মারক।
শীতকালে বাংলাদেশের আবহাওয়া:
বাংলাদেশের অবস্থান ২০°৩৫′ উত্তর অক্ষাংশ হতে ২৬°৩৮′ পর্যন্ত। এ দেশের মাঝামাঝি দিয়ে কর্কট ক্রান্তি রেখা অতিক্রম করায় এ দেশের ওপর মৌসুমী ৰায়ুর প্রভাব খুবই বেশি। ফলে উষ্ণ ও আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এবং শুষ্ক আরামদায়ক শীতকাল বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
শীতকালের বিস্তৃতি :
ষড়ঋতুর হেমন্তকালের পর বাংলাদেশে শীত আসে। সাধারণত বাংলা পৌষ ও মাঘ মাস এবং ইংরেজি ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাস এ দেশে শীতকালের বিস্তৃতি ঘটে। সমভাবাপন্ন বৈশিষ্ট্যের জলবায়ুর বাংলাদেশে শীতকালে শীতের তীব্রতার পাশাপাশি নানাবিধ প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যও প্রতিভাত হয়।
শীতের তীব্রতা :
বাংলাদেশ মোটামুটি নাতিশীতোষ্ণ দেশ। শীতপ্রধান দেশসমূহের তুলনায় এ দেশের শীতকাল মোটামুটি আরামদায়ক। এ দেশে শীতকালে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ২৯° ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ১১° ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে এ দেশে বরফ পড়ে না এবং তেমন তীব্র শীতও অনুভূত হয় না।
শীতকালে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য:
শীতকালে গ্রীষ্মের দাবদাহ নেই। নেই বর্ষার রুমঝুম নৃত্য। শীতের ভোরে কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে চতুর্দিকে রূপালি আলোক ছড়িয়ে পড়ে। তখন বাড়িঘর, গাছপালা পথ-প্রান্তর ঝলমল করে ওঠে। কুয়াশার পানিতে সদ্যস্নাত প্রকৃতি যেন তখন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। মাঠে মাঠে পাকা ধান, গ্রামে গ্রামে খেজুর গাছ কাটা এ ঋতুর বৈশিষ্ট্য।
শীতকালের নবান্নসমূহ:
শীতকাল বাংলাদেশের নবান্নের মাস। সুপ্রাচীনকাল থেকে এ ঋতুতে এ দেশে নবান্নের উৎসব বসে। নানা ধরনের পিঠা, পায়েস, ফিরনি তৈরি হয়। সুমিষ্ট খেজুর রস, খেজুর গুড়, পাটালী বাংলাদেশের শীতকালের চিরন্তন ঐতিহ্য। শীতকালের নবান্নের উৎসব স্মরণ করে কবি বলেন-
পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে
আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনী পেয়ে।
শীতকাল ও প্রকৃতির বেদনা:
শীতকালে বাংলাদেশে শীতের তীব্রতায় প্রকৃতির বেদনা শুরু হয়। বৃক্ষ, তরুলতার পত্রপল্লব ঝরে পড়ে। শ্যামল প্রকৃতি সহসা রুক্ষ মূর্তি ধারণ করে। পত্রহীন বৃক্ষরাজি যেন নীরবে কাঁদতে থাকে। কবির ভাষায়, হিম হিম শীত শীত/শীত বুড়ি এলোরে, কনকনে ঠাণ্ডায়/দম বুঝি গেলোরে।
তবে শীতে প্রকৃতির এ চিত্র নব সৃষ্টির প্রসব বেদনারই নামান্তর। শীত শেষে তাই সমগ্র প্রকৃতি জুড়ে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। গাছপালা নতুন পত্র পল্লবে ভরে ওঠে।
শীতের উপহার :
বাংলাদেশে শীতের প্রধান উপহার খেজুর রস। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি উৎপাদিত হয় এ মৌসুমে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম, পালং শাক, লাল শাক, গাজর, মূলা ইত্যাদিতে ভরে ওঠে বাজার। শস্যক্ষেতের হলুদ ফুল বিশাল হলুদ সাগরের মতো বাতাসে তরঙ্গায়িত হয়। এছাড়াও এ মৌসুমে ডাল এবং তেল বীজ জাতীয় বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়।
বনভোজনের পালা :
শীতকাল বাংলাদেশে বনভোজন তথা পিকনিকের শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ পিকনিকে বের হয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহে ভ্রমণের আনন্দে মেতে ওঠে। দলে দলে অতিথি পাখিরা বাংলার বিল-ঝিলে মেলা বসায়।
শীতকালের অনুষ্ঠানাদি :
শীতকালে সমগ্র বাংলাদেশ উল্লসিত থাকে। গ্রামে-গঞ্জে বসে পৌষ মেলাসহ বিভিন্ন মেলা। বিভিন্ন স্থানে জারি-সারি ও যাত্রাগানের পালা অনুষ্ঠিত হয়। মাদরাসা মসজিদে বসে ওয়ায মাহফিল, হালকায়ে যিকির, ওরস ইত্যাদি। ঢাকার টঙ্গীতে বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত তাবলীগী বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় শীতকালে।
শীতকালের ট্র্যাজেডি:
শীতকাল বাংলাদেশে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি হয়ে আসে দারিদ্র্য কবলিত মানুষের ঘরে। ঘরহারা, ফুটপাত ও বস্তির নিঃস্ব জনগণের নিকট শীত এক ভয়াল মূর্তি ধারণ করে আসে। এ সময় রাস্তার পাশের অসংখ্য বস্ত্রহীন লোক শীতের প্রকোপে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এমনি বস্ত্রহীন লোকের কল্যাণে কবির প্রার্থনা-
হে সূর্য! তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে
উত্তাপ আর আলো দিও
আর উত্তাপ দিও
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
উপসংহার:
নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশে শীতকাল ততটা তীব্র নয়। তবে মাঝে মধ্যে তীব্র শীত ও ঝড়ো হাওয়ায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তথাপি বলা যায়, দূষণ কবলিত পৃথিবীর গ্রীষ্মপ্রধান বায়ুমণ্ডলের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের শীতকাল যথেষ্ট আরামদায়ক ও শ্রেষ্ঠ ঋতু হিসেবে পরিগণিত।