বাংলাদেশের ষড়ঋতু রচনা (১৫ পয়েন্ট)

ভূমিকা :

অপরূপ প্রাকৃতিক লীলাবৈচিত্র্য নিয়ে বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুর আবির্ভাব ঘটে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত— এই ছয় ঋতুতে অপরূপ সাজে সেজে থাকে আমাদের দেশ। প্রত্যেকটি ঋতুর আগমনী ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় প্রকৃতিতে। নতুন নতুন রঙ-রেখায় প্রকৃতি আলপনা আঁকে মাটির বুকে, আকাশের গায়ে, মানুষের মনে। তাই ঋতু বদলের সাথে সাথে এখানে জীবনেরও রঙ বদল হয়। সে-কারণেই বুঝি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়— “জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে, তুমি বিচিত্র রূপিণী।”

বিশ্বের অন্য দেশের সাথে তুলনা :

পৃথিবীর প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সূর্যের চারদিকে পরিভ্রমণ— এই দুটি কারণে ঋতু পরিবর্তন ঘটে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে সাধারণত চারটি অথবা মাত্র দুটি ঋতুর পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশে ছয়টি ঋতু পালা করে নিজস্বতা নিয়ে উপস্থিত হয়। তাই পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ঋতুর সংখ্যা চারটি হলেও বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ।

ষড়ঋতুর পরিচয় :

বাংলাদেশের ছয়টি ঋতু হলো— গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। প্রতি দুই মাস অন্তর একটি নতুন ঋতুর আবির্ভাব ঘটে। ঋতুগুলো চক্রাকারে আবর্তিত হয় এবং পালাক্রমে আসে। প্রকৃতি তখন রং ও রূপ বদলায়। ঋতুর এমন বিচিত্র সমাহার আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

গ্রীষ্মকাল – আবহাওয়া :

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ এ দু’মাস নিয়ে গ্রীষ্মকাল। একে ষড়ঋতুর প্রথম ঋতু হিসেবে গণনা করা হয়। আগুনের মশাল হাতে মাঠ-ঘাট পোড়াতে পোড়াতে গ্রীষ্মরাজের আগমন ঘটে। প্রচণ্ড সূর্যকিরণে চারদিক পুড়ে খাঁ খাঁ করে। আকাশ-বাতাস ধুলায় ধূসরিত হয়ে ওঠে, প্রকৃতি হারায় তার শ্যামল-স্নিগ্ধ রূপ।

নদীনালা, খাল-বিল শুকিয়ে যায়। অসহ্য গরমে সমস্ত প্রাণিকুল একটু শীতল পানি ও ছায়ার জন্য কাতর হয়ে পড়ে। এ সময় হঠাৎ ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যায় এবং শুরু হয় কালবৈশাখীর দুরন্ত তাণ্ডব। প্রবল ঝড়ে ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, ফসল নষ্ট হয়, তখন মানুষের দুঃখের সীমা থাকে না।

গ্রীষ্মকাল – ফল :

তবে গ্রীষ্ম শুধু পোড়ায় না, অকৃপণ হাতে দান করে অনেক সুস্বাদু ফল। জাতীয় ফল কাঁঠালসহ আম, জাম, জামরুল, লিচু, তরমুজ ও নারকেল প্রভৃতি ফলের সমারোহ ঘটে। রসময় ফলের প্রাচুর্য থাকে বলে এ সময়কে ‘মধুমাস’ বলা হয়। ঝড়ের সময় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আম কুড়ানোর ধুম পড়ে যায়।

বর্ষাকাল – আবহাওয়া :

আষাঢ়-শ্রাবণ এ দু’মাস নিয়ে বর্ষাকাল। প্রচণ্ড সূর্যতাপে প্রকৃতি যখন পুড়ে চৌচির, জনজীবন যখন উদ্বিগ্ন, তখন দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার বেশে বর্ষার আবির্ভাব হয়। পিপাসার্ত ধরণীকে সরস করার জন্য আসে বর্ষা। মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জনে প্রকৃতি শিউরে ওঠে। কখনো সারা দিনভর অবিরাম ধারায় বৃষ্টি হয়, আবার কখনো মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়।

সজল বারিবর্ষণে থৈ থৈ পানিতে ভরে যায় নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও ডোবা। মাঠ-ঘাট পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। প্রকৃতিতে দেখা দেয় মনোরম সজীবতা, জনজীবনে ফিরে আসে প্রশান্তি। কৃষকেরা জমিতে ধানের চারা রোপণ ও পাটের বীজ বপন করে।

বর্ষাকাল – ফুল ও ফল :

নানা ফুল ও ফলের সমাগম ঘটে বর্ষায়। এ সময় শাপলা, পদ্ম, কেয়া, কদম, জুঁই ইত্যাদি ফুলের সমারোহ ঘটে। বর্ষায় পাওয়া যায় আনারস, পেয়ারা প্রভৃতি ফল। এসব ফুল ও ফলের সমাহারে বর্ষার প্রকৃতি আরও সজীব ও মনোরম হয়ে ওঠে।

শরৎকাল – প্রকৃতি :

বর্ষার পরই ভাদ্র-আশ্বিন মাস নিয়ে শরতের আগমন ঘটে। শুভ্র মেঘের পালকিতে চড়ে আসে শরৎকাল। এ সময় বর্ষার কালো মেঘ সাদা হয়ে স্বচ্ছ নীল আকাশে তুলোর মতো ভেসে বেড়ায়। শরতের প্রধান বৈশিষ্ট্য আকাশে সাদা মেঘ, জ্যোৎস্নাময় পরিপূর্ণ রাত আর শিশিরসিক্ত সকাল।

নদীর তীরে তীরে বসে সাদা কাশফুলের মেলা, মাঠে-ঘাটে কাশফুলের শোভা চোখ জুড়িয়ে দেয়। বিকেল বেলা মালা গেঁথে উড়ে চলে সাদা বকের সারি। সবুজ ঢেউয়ের দোলায় দুলে ওঠে ধানের ক্ষেত। রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে অজস্র তারার মেলা। শাপলার হাসিতে বিলের জল ঝলমল করে।

শরৎকাল – ফুল ও উপাধি :

শেফালি ও কামিনী ফুলের সৌরভে ভরে ওঠে চারদিক। বাংলার ঋতু রঙে তাই সবচেয়ে প্রসন্ন ঋতু শরৎ। তাই তো কবি গেয়েছেন— “আজিকে তোমার মধুর মুরতি হেরিনু শারদ প্রভাতে। হে মাতঃ বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ ঝলিছে অমল শোভাতে।” শরতের এই অপরূপ রূপের জন্যই শরৎকে বলা হয় ঋতুর রানি।

হেমন্তকাল :

কার্তিক-অগ্রহায়ণ এ দু’মাস নিয়ে হেমন্তকাল। শরৎ বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঘরে নবান্নের উৎসবের আনন্দ নিয়ে হেমন্তের আগমন ঘটে। প্রকৃতিতে হেমন্তের রূপ হলুদ। সরষে ফুলে ছেয়ে যায় মাঠের বুক। মাঠে মাঠে পাকা ধান। এ ঋতু নতুন ধানের পসরা নিয়ে হাজির হয়। কৃষক ফসল কেটে ঘরে আনে, কৃষাণীর ব্যস্ততা বেড়ে যায়।

সোনালি ধানে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে, মুখে ফোটে আনন্দের হাসি। নবান্নের উৎসবে মুখরিত হয় বাংলার গ্রামগুলো। হেমন্তের শিশিরঝরা প্রভাত বয়ে আনে শীতের আভাস। হেমন্ত আসে নীরবে; আবার শীতের কুয়াশার আড়ালে গোপনে হারিয়ে যায়।

শীতকাল – আবহাওয়া :

পৌষ-মাঘ মাসে চলে শীতের রাজত্ব। কুয়াশার চাদর গায়ে উত্তর দিক থেকে কনকনে হিমেল হাওয়া বইতে থাকে। শীতের আগমনে শ্যামল প্রকৃতি যেন সহসা রুক্ষমূর্তি ধারণ করে। শীত রিক্ততার ঋতু। শরীরে শীতের হাওয়া কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ঘন কুয়াশায় সূর্য ঢাকা থাকে অনেকক্ষণ। অনেক গাছের পাতা ঝরে পড়ে।

কনকনে শীতের দাপটে মানুষ ও প্রকৃতি অসহায় হয়ে পড়ে, তবে রকমারি শাক-সবজি, ফল ও ফুলের সমারোহে বিষণ্ণ প্রকৃতি ভরে ওঠে। শীতকালে বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি, আলু, গাজর, টমেটো প্রভৃতি শাকসবজি প্রচুর জন্মে।

শীতকাল – উৎসব :

শীত থেকে রক্ষা পাবার জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গ্রামে গ্রামে শুরু হয় পৌষ পার্বণের উৎসব। পিঠেপুলির সৌরভে ও খেজুরের রসের আস্বাদে গ্রামীণ উৎসবের আমেজ আসে। বাতাসে ভাসে খেজুরের রসের ঘ্রাণ। ক্ষীর, পায়েস আর পিঠা-পুলির উৎসবে মাতোয়ারা হয় গ্রামবাংলা।

বসন্তকাল :

ফাল্গুন ও চৈত্র দু’মাস বসন্তকাল। সবশেষে ঋতুরাজবেশে অনুপম নৈসর্গিক সৌন্দর্য নিয়ে আবির্ভূত হয় বসন্ত। শীতের শুষ্কতায় প্রকৃতি বিবর্ণ হয়ে যায়, বসন্তের আগমনে তা আবার সবুজ হয়ে ওঠে। গাছপালা নতুন পাতায় ভরে ওঠে, শাখায় শাখায় ফুল ফোটে— মহুয়া, শিমুল, বকুল, পলাশ, অশোক। বাতাসে মৌ মৌ ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে।

গাছে গাছে কোকিল-পাপিয়ার সুমধুর গান, কোকিলের কুহুতানে মনে অপূর্ব শিহরন জাগে, প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। দখিনা বাতাস বুলিয়ে দেয় শীতল পরশ, মানুষের প্রাণে বেজে ওঠে মিলনের সুর। এ সময়ের আবহাওয়া অত্যন্ত আরামদায়ক। আনন্দে আত্মহারা কবি গেয়ে ওঠেন— “আহা আজি এ বসন্তে, এত ফুল ফোটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়।” এ জন্যই বসন্তকে বলা হয় ‘ঋতুরাজ’।

ষড়ঋতুর প্রভাব :

বছরের ছয়টি ঋতু নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি বাংলাদেশের জনজীবনও বৈচিত্র্যময়। প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলে এদেশের মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবন। বিভিন্ন ঋতু প্রকৃতিতে রূপ-রসের বিভিন্ন সম্ভার নিয়ে আসে, তার প্রভাব পড়ে বাংলার মানুষের মনে। বিচিত্র ষড়ঋতুর প্রভাবেই বাংলাদেশের মানুষের মন উদার ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।

উপসংহার :

বাংলাদেশের ষড়ঋতু এভাবে পর্যায়ক্রমে নানা রূপ, রস ও বর্ণ নিয়ে আসে। ছয় ঋতুর এ পালাবদলের খেলা আমাদের দেশকে করেছে অপরূপ। এই লীলা অবিরাম চলছে। তাইতো এদেশ এত সুন্দর, এত রূপময়। ষড়ঋতুর কারণেই আমাদের প্রকৃতির এত রং। কবির ভাষায়— “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।”


Author

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment