ইজমা (إِجْمَاعٌ )ইসলামি শরিয়তের তৃতীয় মূলনীতি। এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে অগণিত ইসলামি আইন রচনা করা হয়েছে। ইসলামি গবেষকদের ঐকমত্যে স্থিরকৃত সিদ্ধান্ত শরিয়তের দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। নিচে ইজমার পরিচয়, রুকন, শর্ত, বিধান ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা তুলে ধরা হলো।
ইজমা শব্দের অর্থ কি ?
আভিধানিক অর্থ : إِجْمَاعٌ (ইজমা) শব্দটি বাবে أَفْعَال-এর মাসদার তথা শব্দমূল। جَمَعَ মূলধাতু থেকে উৎকলিত। শব্দটির অর্থ হচ্ছে—
- الِاتِّحَادُ তথা ঐক্যবদ্ধ হওয়া
- الِاتِّفَاقُ তথা একত্রিত হওয়া
- الْعَزْمُ তথা দৃঢ় সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া
- الِاشْتِرَاكُ তথা অংশগ্রহণ করা
- ضَمُّ مَا كَانَ مُتَفَرِّقًا তথা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বিষয়কে একত্রিত করা।
ইজমা কাকে বলে?
১. আল্লামা আবুল বারাকাত আন-নাসাফি বলেন—
هُوَ اِتِّفَاقُ مُجْتَهِدِيْنَ صَالِحِيْنَ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ﷺ فِيْ عَصْرٍ وَاحِدٍ عَلَى أَمْرٍ قَوْلِيٍّ أَوْ فِعْلِيٍّ
অর্থাৎ, মুহাম্মদ (স.)-এর উম্মতের নেককার মুজতাহিদগণের একই যুগের মধ্যে কথা কিংবা করণীয় কোনো বিষয়ের ওপর একমত হওয়াকে ইজমা বলে।
২. আল-মুজামুল ওয়াসিত অভিধান প্রণেতার মতে—
هُوَ اِتِّفَاقُ الْمُجْتَهِدِيْنَ فِيْ عَصْرٍ عَلَى أَمْرٍ دِيْنِيٍّ
সংক্ষেপে : ইসলামের পরিভাষায় একই যুগের মুসলিম উম্মাহর পুণ্যবান মুজাহিদগণের শরীয়তের কোন বিষয়ে ঐক্যমত্য পোষণ করাকে ইজমা বলা হয়।
সম্পর্কিত পোস্ট : কিয়াস(قِيَاس) সংজ্ঞা, অর্থ, শর্ত, রুকন, হুকুম ও দলিল
ইজমার রুকন কয়টি কি কি?
ইজমার রোকন দুটি। যথা—
১। রুখসত (الرُّخْصَةُ)
২। আযিমত (الْعَزِيْمَةُ)
নিচে উভয়ের পরিচয় তুলে ধরা হলো—
রুখসত শব্দের অর্থ কী ও কাকে বলে?
আভিধানিক অর্থ : রুখসত (رُخْصَةٌ) শব্দের অর্থ হচ্ছে—
- অবকাশ (Vacation)
- বিরতি (Interval)
- ঐচ্ছিক (Elective)
- অনুমোদন (Approval)
পারিভাষিক সংজ্ঞা : পরিভাষায়, কষ্ট বা বিশেষ অবস্থার কারণে শরীয়তের মূল কঠিন বিধান থেকে সাময়িক সময়য়ের জন্য সহজ বিধান গ্রহণ করাকে রুখসাত বলে।
আযিমত শব্দের অর্থ কী ও কাকে বলে?
আভিধানিক অর্থ : عَزِيْمَةٌ শব্দটি একবচন। বহুবচন عَزَائِمُ; এর আভিধানিক অর্থ দৃঢ়তা বা Determination। আর عَزَائِمُ অর্থ হলো-ফরযসমূহ যা তিনি আবশ্যক করেছেন।
পারিভাষিক সংজ্ঞা : পরিভাষায়, কোনো ওযর বা বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়াই শরীয়তের মূল ও স্থায়ী বিধান যেভাবে নির্ধারিত আছে সেভাবে পালন করাকে আযীমত বলে।
সম্পর্কিত পোস্ট : আহলে ইজমা কারা? ইজমার স্তর সমূহ ও যোগ্য হওয়ার শর্ত
ইজমার শর্তগুলো :
ইজমার শর্তের ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যথা—
১। জুমহুরের মতে, ইজমা সংঘটিত হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে ‘মুজতাহিদদের ঐকমত্য হওয়া।’ একজন মুজতাহিদও যদি মতিবিরোধ করেন, তাহলে ইজমা সংঘটিত হবে না। কেননা, রাসূল (স.) ইরশাদ করেন—لَا تَجْتَمِعُ أُمَّتِيْ عَلَى الضَّلَالَةِ
এ হাদিসে أُمَّتِي বলতে সকলকে বোঝায়।
২। ইমাম শামসুল আয়িম্মা সারাখসির মতে, ইজমা সংঘটিত হওয়ার জন্য কমপক্ষে তিনজন মুজতাহিদের একমত হওয়া শর্ত।
৩। ইমাম শাফেয়ি (র.)-এর মতে, মুজতাহিদদের ইজমা হুজ্জত হওয়ার জন্য তাদের মৃত্যুবরণ করা শর্ত। কারণ, জীবদশায় তাদের মত পরিবর্তন করার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪। মুতাযিলাদের মতে, অধিকাংশ মুজতাহিদের ঐকমত্য হলেই চলবে। কেননা, হক তথা সত্য জামায়াতের সাথে বিদ্যমান। আর রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন
يَدُ اللهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ فَمَنْ شَذَّ شَذَّ فِي النَّارِ
মুতাযিলাদের দলিলের জবাব : মুতাযিলাদের দলিলের জবাবে বলা হয়, হাদিসের মর্মার্থ হচ্ছে ইজমা সংঘটিত হওয়ার পর যে ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন হবে, সে জাহান্নামে প্রবিষ্ট হবে।
ইজমার হুকুম :
ইজমার হুকুম সম্পর্কে আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে—
১. আল-মানার গ্রন্থপ্রণেতার মতে—এর দ্বারা শরিয়তের বিধান দৃঢ়তার সাথে সাব্যস্ত হবে।
২. ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর অনুসারি বুখারা ও বলখের মাশায়েখদের মতে, ইজমার অস্বীকারকারীকে কাফের বলা যাবে। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক কারণে এটা عِلْمُ الْيَقِيْنِ তথা অকাট্য জ্ঞানের উপকারিতা দেয় না।
৩. ইমাম বায়যাভি (র.)-এর মতে, আমল ও ইলম ওয়াজিব হওয়ার দিক দিয়ে ইজমা খবরে মুতাওয়াতিরের হুকুমের ন্যায়। অতএব, এর অস্বীকারকারীকে কাফের সাব্যস্ত করা যাবে।
৪. শায়খ মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি বলেন, ইজমা অস্বীকারকারীকে অবশ্যই কাফের বলা যাবে।
সম্পর্কিত পোস্ট : ইজমায়ে মুরাক্কাব, লাহিক ও সুকুতি কাকে বলে? উদাহরণ সহ
ইজমার অস্বীকারকারী কাফির কি-না ?
এ ব্যাপারে মতিবিরোধ রয়েছে। যথা—
১. বুখারা ও বলখের আলেমগণ বলেন, ইজমার অস্বীকারকারী কাফের বলে গণ্য হবে। কেননা, ইজমা দ্বারা অকাট্যতা প্রমাণিত হয়।
২. ওলামায়ে আহনাফ, জুমহুর ফোকাহা ও উসূলশাস্ত্রবিদদের মতে, মূলত ইজমার অস্বীকারকারী কাফের। কেননা, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা কুরআনের আয়াত এবং খবরে মুতাওয়াতিরের মত। আর তাদের পরবর্তীকালের ইজমা خَبَرٌ مَشْهُوْرٌ-এর মত। তা ছাড়া প্রিয়নবি (স.) ইরশাদ করেছেন—
١. لَا تَجْتَمِعُ أُمَّتِيْ عَلَى الضَّلَالَةِ
٢. لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِيْ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِيْنَ
ইজমার অস্বীকারকারী কাফের না হলে আবু বকর ও ওমর (রা.)-এর খেলাফত অস্বীকারকারীদেরকে কাফির বলা যাবে না। অথচ তাদের খেলাফত অস্বীকারকারীরা উম্মতে মুহাম্মাদির ঐকমত্যে কাফের। কেননা, তাদের খেলাফত ইজমায়ে সাহাবা দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং, ইজমা অস্বীকারকারী কাফের।
পরিশেষে বলা যায়, ইজমা উম্মতে মুহাম্মদির শরাফত ও কারামাতের প্রতি লক্ষ্য রেখে শরিয়াতের মূলনীতি সাব্যস্ত হয়েছে। এটা দলিল চতুষ্টয়ের মধ্যে তৃতীয়। অতএব এর অস্বীকারকারী কাফের বলে বিবেচিত হবে।