ইজমায়ে মুরাক্কাব, লাহিক ও সুকুতি কাকে বলে? উদাহরণ সহ

উম্মতের ইজমার ভিত্তিতে স্থিরকৃত সিদ্ধান্ত ইসলামি শরিয়তের তৃতীয় উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। আর ইজমা কয়েক প্রকার। যেমন-ইজমায়ে মুরাক্কাব, ইজমায়ে লাহিক ও ইজমায়ে সুকুতি। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

ইজমায়ে মুরাক্কাব কাকে বলে ও অর্থ কি :

ক. আভিধানিক অর্থ : إِجْمَاعٌ শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐকমত্যে পৌঁছা আর مُرَكَّبٌ শব্দটি تَرْكِيْبٌ মাসদার হতে اِسْمُ مَفْعُوْلٍ-এর সিগাহ। যার অর্থ যৌগিক। অতএব, এর সমষ্টিগত অর্থ হচ্ছে— যৌগিক ঐকমত্য ।

খ. পারিভাষিক সংজ্ঞা : পরিভাষায় إِجْمَاعٌ مُرَكَّبٌ নিম্নরূপ—

১. আল-মানার গ্রন্থকার এর সংজ্ঞায় বলেন—

وَالْأُمَّةُ إِذَا اخْتَلَفُوْا عَلَى أَقْوَالٍ أَوْ قَوْلَيْنِ كَانَ إِجْمَاعًا مِنْهُمْ عَلَى إِنَّمَا عَدَاهَا بَاطِلٌ وَيُسَمَّى إِجْمَاعًا مُرَكَّبًا

অর্থাৎ, মুজতাহিদগণ যদি কোনো বিষয়ের দুটি বা কয়েকটি অভিমতের ওপর মতপার্থক্য করেন, তবে তা তাদের পক্ষ হতে এ কথার ওপর ইজমারূপে গণ্য হবে, যে এগুলোর উর্ধ্বে সব মতবাদ বাতিল। একেই إِجْمَاعٌ مُرَكَّبٌ বলা হয়।

২. কারো মতে—

اَلْإِجْمَاعُ الْمُرَكَّبُ هُوَ إِجْمَاعُ عُلَمَاءِ الْعَصْرِ عَلَى قَوْلَيْنِ أَوْ أَقْوَالٍ فِيْ مَسْأَلَةٍ

উদাহরণ : যেমন সাহাবিগণ حَامِلٍ مُتَوَفًّى عَنْهَا زَوْجُهَا-এর ইদ্দতের ব্যাপারে দুটি মতের ওপর ইজমা করেছেন। যথা— ১. عِدَّةُ الْحَمْلِ ও ২. أَبْعَدُ الْأَجَلَيْنِ।তাই এমতাবস্থায় এ নারীর عِدَّةٍ-এর ব্যাপারে তৃতীয় আরেকটি অভিমত পেশ করা যাবে না; বরং দু’অভিমতের কোনো একটি অনুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে। কেননা, তৃতীয় আরেকটি মত সৃষ্টি করা হলে মূর্খতা ও হক গোপন করার অপরাধে অভিযুক্ত হবে। তাই তৃতীয় অভিমত বাতিল।

সম্পর্কিত পোস্ট : ইজমা (إِجْمَاعٌ )কাকে বলে? অর্থ, শর্ত, রুকন ও হুকুম

ইজমায়ে লাহিক কাকে বলে ও অর্থ কি :

ক. আভিধানিক অর্থ : اَلْإِجْمَاعُ اللَّاحِقُ দুটি শব্দ নিয়ে গঠিত একটি যৌগিক শব্দ। শব্দ দুটি যথাক্রমে اَلْإِجْمَاعُ ও اَللَّاحِقُ .শব্দ দুটির আলাদা আলাদা অর্থ নিম্নরূপ—
اَلْإِجْمَاعُ শব্দটি বাবে أَفْعَالٌ-এর মাসদার, যা ج – م – ع ধাতুমূল থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হলো— ঐকমত্য পোষণ করা।

আর اَللَّاحِقُ শব্দটি বাবে سَمِعَ থেকে এসেছে। মাসদার اَللُّحُوْقُ, অর্থ— ১. পরবর্তী, ২. মিলিত বিষয়।

অতএব, اَلْإِجْمَاعُ اللَّاحِقُ-এর সমষ্টিগত অর্থ হলো, পরবর্তী সময়ে সংঘটিত ঐকমত্য।

খ. পারিভাষিক সংজ্ঞা : পরিভাষায় اَلْإِجْمَاعُ اللَّاحِقُ হলো—

هُوَ أَنْ يَجْتَمِعَ الْمُجْتَهِدُوْنَ بَعْدَ الصَّحَابَةِ عَلَى مَسْئَلَةٍ وَقَعَ اِخْتِلَافُ السَّابِقِيْنَ فِيْهَا عَلَى أَقْوَالٍ

অর্থাৎ, পরবর্তী সময়ের মুজতাহিদগণের এমন মাসয়ালায় ঐকমত্য পোষণ করা, যে মাসয়ালায় পূর্ববর্তী মুজতাহিদগণ একাধিক মত পোষণ করেছেন। এরূপ ইজমায়ে লাহিক বলা হয়।

উদাহরণ : আল্লামা নাসাফি (র) اَلْإِجْمَاعُ اللَّاحِقُ-এর উদাহরণে أُمُّ وَلَدٍ-এর ক্রয়-বিক্রয়ের মাসয়ালার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন।

أُمُّ وَلَدٍ-এর ব্যাপারে সাহাবিগণের যুগে ওমর (রা) ও আলি (রা)-এর মধ্যে মতপার্থক্য ছিলো। ওমর (রা) বলেছিলেন: أُمُّ وَلَدٍ ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে না। আলি (রা) বলেছিলেন: أُمُّ وَلَدٍ ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। পরবর্তীকালে তাবেঈদের ইজমা হয়ে যায় যে, أُمُّ وَلَدٍ ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়।

তাই পরবর্তীতে কোনো কাজি ক্রয়-বিক্রয়ের পক্ষে মতামত দিলেও তা কার্যকর হবে না। এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, আলি (রা) পরবর্তীতে স্বীয় মত থেকে বেরিয়ে ওমর (রা)-এর মতের সমর্থন করেছেন।

সম্পর্কিত পোস্ট : আহলে ইজমা কারা? ইজমার স্তর সমূহ ও যোগ্য হওয়ার শর্ত

ইজমা এর জন্য পূর্ববর্তীদের মতবিরোধ না থাকা শর্ত কি-না?

এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (র)-এর সঠিক অভিমত হলো, পূর্ববর্তীগণ যদি কোনো মাসয়ালায় একাধিক মত পোষণ করেন, অতঃপর পরবর্তীকালের মুজতাহিদগণ সে মতসমূহের যে কোনো একটির ওপর ঐকমত্য পোষণ করেন, তবে সে ইজমা গ্রহণযোগ্য হবে এবং পূর্ববর্তীগণের মতপার্থক্যের অবসান ঘটবে; কিন্তু পূর্ববর্তীদের অভিমতের বাইরে নতুন কোনো মতের ওপর ঐকমত্য পোষণ করলে সে ইজমা গ্রহণীয় হবে না।

ইজমায়ে সুকুতি কাকে বলে ও অর্থ কি :

ক. আভিধানিক অর্থ : اَلْإِجْمَاعُ السُّكُوْتِيُّ দুটি পদ নিয়ে গঠিত একটি মুরাক্কাব শব্দ। একটি হচ্ছে اِجْمَاعٌ যা বাবে اِفْعَالٌ-এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে— একত্রিত হওয়া, দৃঢ় সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, ইচ্ছে করা ইত্যাদি।

খ. পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইজমায়ে সুকূতির সংজ্ঞা বর্ণনায় আল-মানার গ্রন্থপ্রণেতা আবুল বারাকাত আন-নাসাফি (র) বলেন—

ইজমায়ে সুকূতি বলা হয় ঐ ইজমাকে, যাতে কোনো যুগের মুজতাহিদগণের মধ্য হতে একদল কোনো কথা বিষয়ে কিংবা কাজে ঐকমত্য পোষণ করেন এবং অন্যান্য মুজতাহিদ সে ক্ষেত্রে নীরবতা অবলম্বন করেন; চিন্তা-ভাবনা করার সময়কাল- তিন দিন অতিবাহিত হওয়া, অথবা জানার বৈঠক ঠিক শেষ হওয়ার পরও তাদের পক্ষ হতে প্রতিবাদ পাওয়া যায়নি। এরূপ ইজমাকে ইজমায়ে সুকুতি তথা মৌনসম্মতিমূলক ইজমা বলে।

সম্পর্কিত পোস্ট : ইসতিহসান(اِسْتِحْسَانٌ )কাকে বলে? কত প্রকার ও এটার বিধান

শিক্ষাগার

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে লাখো শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment