আহলে ইজমা কারা? ইজমার স্তর সমূহ ও যোগ্য হওয়ার শর্ত

আহলে ইজমা কারা :

এ প্রসঙ্গে আবুল বারাকাত আন-নাসাফি (র.) বলেন—

أَهْلُ الْإِجْمَاعِ مَنْ كَانَ مُجْتَهِدًا صَالِحًا إِلَّا فِيْمَا يَسْتَغْنِيْ فِيْهِ عَنِ الِاجْتِهَادِ لَيْسَ فِيْهِ هَوًى وَلَا فِسْقٌ

অর্থাৎ, আহলে ইজমা হচ্ছে— সে সকল মুজতাহিদ, যারা পুণ্যবান এবং প্রবৃত্তি ও পাপাচারিতার অনুকরণ করেন না। কেননা, পাপাচারিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে عَدَالَة নষ্ট হয়ে যায়। তবে শর্ত হচ্ছে, বিষয়টি ইজতিহাদি হতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সাধারণত লোক ও ফাসেকের কথা গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্য যে বিষয়টি ইজতিহাদি নয়, এমন ক্ষেত্রে ইজমার জন্য أَهْلُ اجْتِهَاد হওয়া শর্ত নয়; বরং এ ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের ঐকমত্য আবশ্যক। এমনকি একজনও মতিবিরোধ করলে ইজমা হবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—

ক. أَحْكَامُ الْبَيْعِ এটা ইজতিহাদি বিষয়। এ ধরনের ইজমার ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের কোনো দখল নেই।

খ. নামাযের রাকাত সংখ্যা, পবিত্র কুরআনের বর্ণনা— এগুলো ইজতিহাদি বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে خَوَاص ও عَوَام সকলের ঐকমত্য আবশ্যক। এ ধরনের ইজমার জন্য মুজতাহিদ হওয়া শর্ত নয়।

ইমাম আবু বকর বাকিল্লানি (র.)-এর মতে, কোনো সমস্যা ইজতিহাদি বিষয় হোক অথবা না হোক, যে কোনো ক্ষেত্রে ইজমার أَهْلِ-এর জন্য মুজতাহিদ হওয়া আবশ্যক নয়। বরং তিনি বলেন—

وَيَكْفِيْ قَوْلُ الْعَوَامِ فِيْ انْعِقَادِ الْإِجْمَاعِ

প্রতুত্তর : ইমাম আবু বকর বাকিল্লানির কথার জবাবে বলা হয়, সাধারণ লোক পশুতুল্য। তাদের ওপর تَقْلِيْدُ مُجْتَهِدِ অত্যাবশ্যক। তাই ইজতিহাদি বিষয়ে তাদের মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই।

সম্পর্কিত পোস্ট : ইজমা (إِجْمَاعٌ )কাকে বলে? অর্থ, শর্ত, রুকন ও হুকুম

ইজমার স্তর কয়টি ও কি কি ?

শক্তি, দুর্বলতা, দৃঢ়তা ও সংশয় বিচারে ইজমার স্তর ৪টি। যথা—

১. إِجْمَاعُ جَمِيْعِ الصَّحَابَةِ তথা সকল সাহাবিদের ইজমা।

২. اَلْإِجْمَاعُ السُّكُوْتِيُّ তথা নীরবতামূলক ইজমা।

৩. اَلْإِجْمَاعُ اللَّاحِقُ তথা পরবর্তীকালীন ইজমা।

৪. إِجْمَاعُ الْآخِرِيْنَ عَلَى الْمُخْتَلَفِ فِيْهِ তথা মতিবিরোধপূর্ণ বিষয়ের ওপর পরবর্তী লোকদের ইজমা।

১। إِجْمَاعُ جَمِيْعِ الصَّحَابَةِ পরিচিতি : সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্য দ্বারা সংঘটিত ইজমা। এটা হচ্ছে ইজমার সর্বাধিক শক্তিশালী স্তর। যেমন তারা সকলে মিলে এরূপ বলেছেন—اِجْمَعْنَا عَلَى هَذَا অর্থাৎ আমরা এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছি। আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত প্রশ্নে সংঘটিত ইজমা এ শ্রেণিভুক্ত।

উদাহরণ : যখন আবু বকর—اَلْأَئِمَّةُ مِنْ قُرَيْشٍ এ হাদিসটি বলেছিলেন, তখন বিনা মতপার্থক্যে সবাই মেনে নিয়েছেন। এ ধরনের ইজমা কুরআন ও خَبَرِ المُتَوَاتِرُ -এর সমপর্যায়ের। তাই এটা عِلْمُ الْيَقِيْنِ-এর উপকারিতা দেবে এবং অস্বীকারকারীকে কাফির বলা যাবে। তাই এটাকে إِجْمَاعٌ قَوْلِيٌّ ও বলা হয়।

২। اَلْإِجْمَاعُ السُّكُوْتِيُّ পরিচিতি : নীরবতামূলক ইজমা বলা হয়— অর্থাৎ, যে ইজমার ওপর কতিপয় সাহাবি প্রকাশ্য উক্তি করেছেন এবং অবশিষ্ট সাহাবিগণ নীরবতা অবলম্বন করেছেন। এটা إِجْمَاعٌ قَوْلِيٌّ-এর ন্যায় গ্রহণযোগ্য। তবে অস্বীকারকারীকে কাফের বলা যাবে না।

৩। اَلْإِجْمَاعُ اللَّاحِقُ পরিচিতি : সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী প্রত্যেক যুগের ইজমা এবং এ বিষয়ে ইজমা যার মধ্যে সাহাবিদের কোনো মতপার্থক্য ছিল না। এটা خَبَرُ الْمَشْهُوْرِ-এর পর্যায়ের। যা عِلْمُ طُمَأْنِيْنَةٌ তথা আত্মতৃপ্তিমূলক জ্ঞান দান করে। তবে এর দ্বারা عِلْمُ الْيَقِيْنِ অর্জিত হবে না।

৪। إِجْمَاعُ الْآخِرِيْنَ عَلَى الْمُخْتَلَفِ فِيْهِ পরিচিতি : পরবর্তী লোকদের ইজমা ঐ বিষয়ে যার মধ্যে সাহাবায়ে কেরামের মতপার্থক্য ছিল এবং পরবর্তী যুগে কোনো এক মতের ওপর ইজমা সংঘটিত হয়েছে। এটাই ইজমার নিম্নস্তর।

সম্পর্কিত পোস্ট : কিয়াস(قِيَاس) সংজ্ঞা, অর্থ, শর্ত, রুকন, হুকুম ও দলিল

ইজমার যোগ্য হওয়ার শর্ত :

আহলে ইজমার জন্য সাহাবি অথবা মদিনাবাসী অথবা নবি-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়া শর্ত কি-না, এ বিষয়ে মতৈনক্য বিদ্যমান।

১. শায়খ মহিউদ্দিন আল-আরাবির মতে, আহলে ইজমার জন্য সাহাবি হওয়া শর্ত। কেননা, তারাই ইসলামের মূল। স্বয়ং রাসূল (স.) তাদের প্রশংসায় বলেন-

١. خَيْرُ الْقُرُوْنِ قَرْنِيْ
٢. اَلصَّحَابَةُ كُلُّهُمْ عُدُوْلٌ

এটা আবার ইমাম আহমেদেরও অভিমত।

২. ইমাম মালেকের মতে, মদিনাবাসী হওয়া শর্ত। কেননা, তারাই নবি ও সাহাবিদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন। আর তাদের শানেই রাসূল (স.)-এর নিম্নোক্ত বাণী প্রণিধানযোগ্য—

١. إِنَّ الْمَدِيْنَةَ كَالْكِيْرِ تَنْفِيْ خَبَثَهَا
٢. إِنَّ الْمَدِيْنَةَ تَنْفِيْ خَبَثَهَا كَمَا يَنْفِي الْكِيْرُ خَبَثَ الْحَدِيْدِ

৩. শিয়াদের আকিদা হচ্ছে আহলে ইজমার জন্য নবির-পরিবারবর্গ হওয়া শর্ত। তাদের দলিল হচ্ছে—

قَالَ النَّبِيُّ ﷺ : إِنِّيْ تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا إِنْ تَمَسَّكْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوْا كِتَابَ اللهِ وَعِتْرَتِيْ

৪. ইমাম শাফেয়ি (র.)-এর মতে, আহলে ইজমার জন্য মুজতাহিদগণের যুগ শেষ হওয়া এবং সে মতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে ইন্তেকাল করা পূর্বশর্ত।

তাই তাদের মৃত্যু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ইজমা দলিল হবে না। কারণ, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত رَجَعَتْ তথা পূর্ব মত হতে ফিরে আসার اِحْتِمَال-সম্ভাবনা রয়েছে।

৫. আহনাফের বক্তব্য: আহনাফের মতে, সাহাবি হওয়া, মদিনাবাসী হওয়া, নবীর পরিবার হওয়া ও যুগ শেষ হওয়া কোনো কিছুই শর্ত নয়; বরং أَهْلُ الْإِجْمَاعِ-এর জন্য সত্যিষ্ঠ মুজতাহিদগণ হওয়াই যেষ্ঠ।

সম্পর্কিত পোস্ট : ইজমায়ে মুরাক্কাব, লাহিক ও সুকুতি কাকে বলে? উদাহরণ সহ

আহনাফের পক্ষ থেকে জবাব :

১. শায়খ মহিউদ্দিন, ইমাম মালেক ও শিয়াদের দলিলের উত্তরে বলা যায়, উক্ত হাদিসগুলোতে মদিনাবাসী ও নবি-পরিবারের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর ভাব এটা নয়, তারাই আহলে ইজমা হবে, অন্যরা হবে না। বস্তুত হাদিসগুলোতে ইজমার কোনো কথাও নেই; এমনকি ইঙ্গিতও নেই।

২. ইমাম শাফেয়ি (র.)-এর দলিলের জবাবে বলা যায়, ইজমা সাব্যস্ত হওয়ার জন্য مَوْتُ الْمُجْتَهِدِيْنَ এবং عَدَمُ مَوْتِهِمْ-এর কোনো শর্ত নেই। এতদ্ব্যতীত চিন্তা-গবেষণার মধ্যে مَوْتُ সংঘটিত হলে اِحْتِمَالُ দূরীভূত হয়ে যায়।

শিক্ষাগার

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে লাখো শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment