আমাদের অজ্ঞতাবশত শরিয়তের কোনো কোনো বিধানের ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদিসের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দেখতে পাই। অথচ বাস্তবে কোনো বিরোধ নেই; বরং বিরোধ হলো সময়ের ব্যবধান, পরিবেশ ও পরিস্থিতির ব্যতিক্রম। সুতরাং এ তিন বিষয় উদঘাটন করতে পারলে বিরোধপূর্ণ একাধিক হাদিসের একটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়। এ বিষয়টিই আলোচ্য প্রশ্নোত্তরের প্রতিপাদ্য প্রসঙ্গ।
الْمُرَجِّحَاتُ অর্থ কি ও কাকে বলে ?
আভিধানিক অর্থ : مُرَجَّحَاتٌ শব্দটি বাবে تَفْعِيْلٌ-এর تَرْجِيْحٌ মাসদার থেকে গঠিত اسْمُ مَفْعُوْلٌ-এর جَمْعُ مُؤَنَّثٍ-এর সিগাহ। مُرَجَّحَاتٌ শব্দের বহুবচন। تَرْجِيْحٌ শব্দের অর্থ হলো,কোনো বস্তু বা বিষয়কে অগ্রাধিকার বলে স্থির করা। অতঃপর مُرَجَّحَاتٌ শব্দের অর্থ হলো, অগ্রাধিকার প্রদত্ত বিষয় বা বস্তু।
পারিভাষিক সংজ্ঞা : শরিয়তের পরিভাষায় تَرْجِيْحٌ শব্দের অর্থ হলো—
بَيَانُ الرُّجْحَانِ فِي الْقُوَّةِ لِأَحَدِ الْمُتَعَارِضَيْنِ عَلَى الْآخَرِ وَتَقْدِيْمُ الرَّاجِحِ عَلَى الْمَرْجُوْحِ
অর্থাৎ, দুটি পরস্পর বিরোধী দলিলের একটিকে আরেকটির ওপর শক্তিতে অগ্রাধিকারের বর্ণনা প্রদান এবং অগ্রাধিকারী দলিলকে পশ্চাদাধিকারীর ওপর অগ্রে স্থান দেয়া।
الْمُرَجِّحَاتُ (মুরজ্জাহাতের) রূপরেখা ও উপকারিতা:
অনন্তর অগ্রাধিকার প্রদত্ত দলিলসমূহের মাধ্যমেই দুটি দলিলের মধ্যকার পরস্পর বিরোধ থেকে অব্যাহতি লাভ করা যায়।
এ জন্যই ইমাম আবু হানিফা (র.) রাসূল (স.)-এর বাণী— اِسْتَنْزِهُوا مِنَ الْبَوْلِ، فَإِنَّ عَامَّةَ عَذَابِ الْقَبْرِ مِنْهُ এর মোতাবেক আমল করাকে উরাইনিয়ানদের উটের পেশাব পান করার হাদিস মোতাবেক আমল করার ওপর অগ্রাধিকার প্রদান করেছেন। কেননা, হারাম ঘোষণা করার দলিল বৈধ ঘোষণা করার দলিলের উর্ধ্বে অগ্রাহ্য। একই বিষয়ে হালাল ঘোষণার দলিলের চাইতে অগ্রগণ্য হওয়ার অনুরূপ আরেকটি মাসয়ালা হলো, বর্ণিত আছে যে, রাসূল (স.) গুইসাপ ভক্ষণ করা থেকে নিষেধ করেছিলেন। আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূল (স.) গুইসাপ খাওয়ার অবকাশ দিয়েছিলেন।
এ দুটি হাদিস সম্পর্কে আমরা জানি যে, এ দুটি হাদিসের ঘটনা সময়ে ঘটেছিল। অতএব, হারামজ্ঞাপক হাদিসটি অবকাশজ্ঞাপক হাদিস থেকে অগ্রাহ্য হবে। পরিণামে অবকাশজ্ঞাপক হাদিসটি আগে সংঘটিত হয়েছিল বলে স্থির করতে হবে। সুতরাং এটা মানসুখ রহিত হয়ে যাবে। আর হারামজ্ঞাপক হাদিসটিকে পরবর্তী নাসিখ হাদিস বলে স্থির করতে হবে।
কেননা প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ইতবাচক দলিল ঐ বিষয়ে নেতিবাচক দলিলের ওপরে অগ্রাধিকার প্রদত্ত হবে। কেননা, ইতবাচক দলিল নেতিবাচক দলিল অপেক্ষা সত্যের অতি কাছাকাছি হয়ে থাকে। কারণ, ইতবাচক দলিল বাস্তবতা নির্ভর হয় এবং নেতিবাচক দলিল বাহ্যদৃষ্টি নির্ভর হয়ে থাকে।
এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো, বারিরা (রা.)-এর স্বামী মুগিছের আযাদির ইতবাচক ও নেতিবাচক সংবাদ । বারিরা (রা.) আয়েশা (রা.)-এর চুক্তিবদ্ধ দাসী ছিলেন। এ সময়ে বারিরা (রা.) মুগিছ নামক এক ক্রীতদাসের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। বারিরা যখন কিছু দিনের মধ্যে চুক্তির অর্থ আদায় করে আযাদ হয়ে যান তখন রাসূল (স.) তাকে বললেন— مَلَكْتِ بَضْعَتَكِ فَاخْتَارِيْ অর্থাৎ, আজ থেকে তুমি তোমার জননেন্দ্রিয়ের পূর্ণাঙ্গ অধিকার হয়ে গেলে। অতএব তুমি তোমার স্বেচ্ছাধিকার প্রয়োগ করতে পারো।
এ সময়ে বারিরা (রা.)-এর স্বামী মুগিছ ক্রীতদাস ছিলেন, নাকি স্বাধীন ছিলেন? এ ব্যাপারে মতিবিরোধ আছে। কেউ বলেছেন, মুগিছ পূর্বানুরূপ ক্রীতদাস ছিলেন। এটা ইমাম শাফেয়ি (র.)-এর সুচিন্তিত অভিমত। সুতরাং তার মতবাদ হলো, স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মহিলার স্বামী যখন ক্রীতদাস থাকবে তখন ঐ মহিলার জন্য বিবাহ বন্ধন বহাল রাখা না রাখার ব্যাপারে স্বেচ্ছাধিকার থাকবে। আবার কেউ বলেছেন, ঐ সময় মুগিছ স্বাধীন ছিলেন। এটা ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর গৃহীত অভিমত।
অতএব স্বাধীনতাপ্রাপ্ত স্ত্রীর জন্য বিবাহবন্ধন সম্পর্কে স্বেচ্ছাধিকার থাকবে, চাই স্বামী স্বাধীন হোক বা পরাধীন হোক। এক্ষেত্রে আবু হানিফা (র.) স্বাধীনতার ইতবাচক হাদিসকে নেতিবাচক হাদিসের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা, আগেই বলা হয়েছে, ইতবাচক বক্তব্য স্বভাবত নেতিবাচক বক্তব্যের চাইতে সত্যের অতি কাছাকাছি থাকে।
আল-কুরআন ও হাদিসে تَرْجِيْحٌ তথা বিরোধপূর্ণ দুটি দলিলের একটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উদ্ধৃত বাক্য সমূহের মধ্যে সংঘটিত হবে। এর অর্থ হলো, কুরআন ও হাদিসের মধ্যে عَامٌّ, خَاصٌّ, نَهْيٌ, أَمْرٌ, مُشْتَرَكٌ, مُؤَوَّلٌ ইত্যাদি যেসব প্রকারভেদ আছে এগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে تَرْجِيْحٌ-এর সম্ভাব্য ব্যবস্থা গৃহীত হবে।
এসব প্রকারের মধ্যে কোনো প্রকারে تَرْجِيْحٌ দেওয়া ঐ প্রকারের দিকনির্দেশনার শক্তির বিবেচনায় সংঘটিত হবে। যেমন, مُحْكَمٌ শক্তিতে مُفَسَّرٌ-এর ওপরে, مُفَسَّرٌ শক্তিতে نَصٌّ-এর ওপরে, نَصٌّ শক্তিতে ظَاهِرٌ-এর ওপরে, خَفِيٌّ শক্তিতে مُشْكَلٌ-এর ওপরে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত হবে।
কেননা, উপযুক্ত যুগল পরিভাষাসমূহের মধ্যে প্রথমটি শক্তিতে দ্বিতীয়টি থেকে অগ্রগণ্য। একইভাবে হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে الرِّوَايَةُ بِاللَّفْظِ শক্তিতে الرِّوَايَةُ بِالْمَعْنَى থেকে অগ্রগণ্য।