শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.)-এর জীবনী

আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে এমন কতিপয় মহামানবের আবির্ভাব ঘটান, যাদের মাধ্যমে অন্ধকার পৃথিবী আলোর সন্ধান পায়। এসকল মনীষীর মধ্যে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ। পাক ভারত উপমহাদেশে তাঁর সমতুল্য জ্ঞানতাপস খুবই বিরল। বিশেষ করে ইসলামকে বিজয়ী করা এবং বিদআত মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি আজীবন শিরক, বিদআত ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন।

নাম ও পরিচিতি : তাঁর নাম— আহমদ, উপনাম-আবুল ফায়ায, পরিচিত নাম-ওয়ালি উল্লাহ, ঐতিহাসিক নাম-আজিমুদ্দিন, উপাধি-কুতুবুদ্দিন, পিতার নাম-শাহ আবদুর রহিম, দাদার নাম-আজিহুদ্দিন।

বংশধারা : ওয়ালি উল্লাহ আহমদ ইবনে শাহ আবদুর রহিম ইবনে ওয়াজিহুদ্দিন আশ-শহিদ ইবনে মুজাম ইবনে মানসুর ইবনে আহমদ ইবনে মাহমুদ ইবনে কিওয়ামুদ্দিন ইবনে কাজি কাশেম ইবনে কাজি কাবির, ইবনে আবদুল মালেক ইবনে কুতুবুদ্দিন ইবনে কামালুদ্দিন ইবনে মুফতি শামসুদ্দিন ইবনে শের মালিক ইবনে মুহাম্মদ আতা মুলক ইবনে আবুল ফাতাহ মালিক ইবনে ওমর আল-হাকিম মালিক ইবনে আদেল ইবনে মালিক ইবনে ফারক ইবনে জারিয়িস ইবনে আহমদ ইবনে মুহাম্মদ শাহরিয়ার ইবনে ওসমান ইবনে মাহান ইবনে হুমায়ুন ইবনে কুরাইশ ইবনে সোলায়মান ইবনে আফফান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ফারক ইবনে খাত্তাব (রা.)।

তাঁর বংশধারা পিতার দিক দিয়ে ওমর ইবনে ফারক (রা.)। আর মাতার দিক দিয়ে মুসা কাজেম (র.) পর্যন্ত গিয়ে পৌছে। তাঁর দাদা ওয়াজিহুদ্দিনের মাতা হুসাইন (রা.)-এর বংশের।

সম্পর্কিত পোস্ট : হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা কিতাবের বৈশিষ্ট্য

জন্ম : তিনি ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দ মুতাবেক ১১১৪ হিজিরের ৪ শাওয়াল বুধবার সূর্যোদয়ের সময় ভারতের মোজাফফর নগরের সম্রান্ত দীনি আলেম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।

শৈশবকাল : তাঁর শৈশবকাল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ছিল। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন সুবিখ্যাত জ্ঞানপণ্ডিত। তার মধ্যে পিতার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। স্বীয় পিতার তত্ত্বাবধানে তাঁর শৈশবকাল অতিবাহিত হয়। ফলে তিনি আচার-ব্যবহার, চাল-চলন সর্বদিক দিয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন।

শিক্ষা জীবন : মাত্র পাঁচ বছর বয়স হতে তাঁর শিক্ষা জীবনের শুভ সূচনা হয়। সাত বছর বয়সে ‘আরাফে জামি’ রচিত الْفَوَائِدُ الضِّيَائِيَّةُ গ্রন্থ সমাপ্ত করেন। তাঁর পিতা তাঁকে নিজের মত করে গড়ে তোলেন।

প্রতিভা : হায়াতে ওয়ালি নামক গ্রন্থপ্রণেতা বলেছেন, শাহ ওয়ালিউল্লাহ (র.) দশ বছর বয়সে নাহ সরফ শাস্ত্রে এতই গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন যে, নাহ ও সরফ শাস্ত্রের অনেক গ্রন্থকারও তাঁর সাথে নাহ শাস্ত্রের আলোচনায় হার মানতো। শুধু নাহ সরফেই নয়; বরং অল্প বয়সেই তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকহ, উসূল, ফারায়েয, আকাইদ, বালাগাত, মানতিক, হেকমত ইত্যাদি শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

সম্পর্কিত পোস্ট : ইমাম নাসায়ী (র) এর জীবনী ও নাসায়ীর বৈশিষ্ট্যসমূহ

বিবাহ : তিনি ১১২৮ হিজিরি সনে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে স্বীয় মামা ওবায়দুল্লাহ পাহলভীর কন্যাকে বিয়ে করেন। তাঁর ঔরসে এক ছেলে শেখ মুহাম্মদ এবং এক মেয়ে আমাতুল আযিয জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষকবৃন্দ : তিনি যাদের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন তারা হলেন তার পিতা শাহ আবদুর রহিম (র.), শায়খ মুহাম্মদ আকমল শিয়ালকোটি (র.), শায়খ আবু তাহের মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম কুরদি মাদানি (র.), শায়খ তাজউদ্দিন আল-হানাফি (র.) ওয়াযাফদুল্লাহ মালেকি (র.) প্রমুখ।

পিতার ইন্তেকাল এবং বাইয়াত গ্রহণের অনুমতি লাভ : শায়খ ওয়ালিউল্লাহ (র.)-এর বয়স যখন সতেরো বছর তখন তাঁর পিতা অসুস্থ হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি স্বীয় পুত্রকে বাইয়াত করানোর অনুমতি প্রদান করেন এবং মাদ্রাসায়ে রহিমিয়া ও খানকায়ে রহিমিয়া পরিচালনার ভার তার নিকট অর্পণ করেন। অতঃপর ১১৩১ হিজিরি মুতাবিক ১৭১৩ খ্রিষ্টাব্দ ১২ সফর বুধবার তাঁর পিতা আবদুর রহিম ইন্তেকাল করেন।

ছাত্রবৃন্দ : বহু জ্ঞান পিপাসু তার নিকট থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। তার ছাত্রদের মধ্যে প্রসিদ্ধ হলেন, শায়খ মুহাম্মদ আশেক পাহলভী, শায়খ নুরুল্লাহ, শায়খ জামালুদ্দিন, গাজী মুহাম্মদ আমিন কাশ্মিরি, শাহ আবু সাইয়াদ বেরেলভি, কাজি ছানাউদ্দাহ পানিপথি, শাহ মুহাম্মদ নুমান, আল্লামা মুরতাযা আল-হোসাইনী, শায়খ রাফিকুদ্দিন, শায়খ মুহাম্মদ সিদ্দ, আল্লামা মিয়ান, মুহাম্মদ কামরুদ্দিন (র.) প্রমুখ।

সম্পর্কিত পোস্ট : ইমাম বুখারী (র)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (পয়েন্ট আকারে)

গুণাবলি : শাহ ওয়ালিউল্লাহ (র.) ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দীন। তাছাড়া তিনি ছিলেন সমাজসংস্কারক। পাক-ভারতীয় উপমহাদেশে থেকে শিরক ও বিদআত মূলোৎপাটনের নিমিত্তে তিনি আমরণ সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি সর্বমহল থেকে ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ বিদূরিত করার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

মনীষীগণ তাকে মুজাদ্দিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কেননা, তিনি রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও সামরিক ক্ষেত্রে সংস্কার সাধনের প্রচেষ্টা চালান। তিনি একজন দার্শনিক ছিলেন। ইসলামকে শুধু বাহ্যিকভাবে না দেখে দার্শনিক, সুক্ষ্ম চিন্তা ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে দেখাতেন। তার প্রশংসায় শায়খ আবদুল হাই লখনভী বলেন—

إِنَّ حُجَّةَ اللهِ بَيْنَ بَنِيْ الْأَنَامِ إِمَامُ الْهُدَى قُدْوَةُ الْعُلَمَاءِ وَارِثُ الْأَنْبِيَاءِ آخِرُ الْمُجْتَهِدِيْنَ

অর্থাৎ, তিনি হলেন সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ তায়ালার দলিল, হিদায়াতের ইমাম, জাতির দিক নির্দেশক, মহাজ্ঞানী, নবীদের ওয়ারিশ ও শেষ মুজতাহিদ।

তাঁর শিক্ষক আবু তাহের মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম কুরদি (র.) বলেন—

إِنَّهُ يَسْتَنِدُ عَنِّيْ اللَّفْظَ وَكُنْتُ أُصَحِّحُ مِنْهُ الْمَعْنَى

অর্থাৎ, শাহ ওয়ালিউল্লাহ আমার থেকে শব্দের সনদ গ্রহণ করে, আর আমি তার থেকে অর্থ সঠিক শুদ্ধ করি।

অবদান : ইসলামে তাঁর অবদান এত অধিক যে, তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। নিচে তার প্রসিদ্ধ কতিপয় অবদান আলোচনা প্রদত্ত হলো—

১. তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা-বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করে ভ্রান্ত আকিদাসমূহ দূর করেছেন। আর এ প্রসঙ্গে তিনি إِزَالَةُ الْخُفَاءِ عَنْ خِلَافَةِ الْخُلَفَاءِ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

২. তাঁর যুগের মুসলমানদের ধারণা ছিলো, কুরআন মাজিদ কেবল কণ্ঠে পাঠ করার নিমিত্তে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু তিনি তাদেরকে পবিত্র কুরআনের অর্থ অনুধাবন ও মর্মার্থ বুঝার দিকে আহ্বান জানান এবং এ প্রসঙ্গে الْفَوْزُ الْكَبِيْرُ গ্রন্থ রচনা করেন।

৩. তার সময়কার মুসলমানগণ বিশুদ্ধ আরবি ভাষার সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। ফলে তারা আল্লাহ তায়ালার কুরআন মাজিদ বুঝতে অক্ষম ছিল। অতঃপর তিনি فَتْحُ الرَّحْمَنِ فِيْ تَرْجُمَةِ الْقُرْآنِ নামক পবিত্র কুরআনের একটি ফারসি অনুবাদগ্রন্থ রচনা করেন।

৪. ভারতবর্ষে হাদিসশাস্ত্র প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি হাদিসশাস্ত্র প্রসার ও প্রচারের নিমিত্তে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন।

৫. তৎকালীন যুগের মানুষরা উলুমে শারইয়ার ব্যাপারে অমনোযোগী ছিল। অতঃপর তিনি এ প্রসঙ্গে حُجَّةُ اللهِ الْبَالِغَةِ নামক একটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। মুফতি সাইয়িদ আহমদ পালনপুরি হাফিজাহুল্লাহ رَحْمَةُ اللهِ الْوَاسِعَةِ নামে পাঁচ খণ্ডে এ গ্রন্থের একটি অমূল্য শরাহ লিখেন।

রচনা সম্ভার : ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (র.) দুশরও অধিক অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। তন্মধ্যে কতিপয় গ্রন্থ হচ্ছে—

١. فَتْحُ الرَّحْمَنِ فِيْ تَرْجُمَةِ الْقُرْآنِ
٢. فِيْ أُصُوْلِ التَّفْسِيْرِ الْكَبِيْرُ الْفَوْزُ
٣. الْفَتْحُ الْخَبِيْرُ بِمَا لَا بُدَّ مِنْ حِفْظِهِ مِنْ عِلْمِ التَّفْسِيْرِ
٤. الْمُصَفَّى شَرْحُ الْمُوَطَّأِ
٥. الْمُسَوَّى شَرْحُ الْمُوَطَّأِ
٦. شَرْحُ تَرَاجِمِ الْأَبْوَابِ لِلْبُخَارِيِّ
٧. حُجَّةُ اللهِ الْبَالِغَةُ
٨. إِزَالَةُ الْخُلَفَاءِ عَنْ خِلَافَةِ الْخُلَفَاءِ
٩. قُرَّةُ الْعَيْنَيْنِ فِي تَفْضِيْلِ الشَّيْخَيْنِ
١٠. تَأْوِيْلُ الْأَحَادِيْثِ
١١. اللَّطَافُ الْقُدْسِ
١٢. فُيُوْضُ الْحَرَمَيْنِ
١٣. دِيْوَانُ الشِّعْرِ
١٤. سِلْسِلَاتٌ
١٥. سُرُوْرُ الْمَحْزُوْنِ
١٦. اللَّمَحَاتُ
١٧. الِانْتِبَاهُ فِيْ سَلَاسِلِ أَوْلِيَاءِ اللهِ
١٨. الْخَيْرُ الْكَثِيْرُ
١٩. مَنْهِيَّاتٌ عَلَى فَتْحِ الرَّحْمَنِ
٢٠. الْقَوْلُ الْجَمِيْلُ
٢١. إِعْرَابُ الْقُرْآنِ
٢٢. مَأْثُوْرُ الْأَجْدَادِ
٢٣. التَّفْهِيْمَاتُ الْإِلَهِيَّةُ
٢٤. حُسْنُ الْعَقِيْدَةِ
٢٥. الْإِنْصَافُ فِيْ بَيَانِ سَبَبِ الِاخْتِلَافِ
٢٦. وَالتَّقْلِيْدُ عِقْدُ الْجِيْدِ فِي أَحْكَامِ الِاجْتِهَادِ
٢٧. أَطْيَبُ النَّغَمِ فِي مَدْحِ سَيِّدِ الْعَرَبِ وَالْعَجَمِ
٢٨. أَنْفَاسُ الْعَارِفِيْنَ

মাযহাব : তিনি হানাফি মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তাঁর জৈনক ছাত্রের নিকট সনদ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন—

الْعُمَرِيُّ نَسَبًا الدَّهْلَوِيُّ وَطَنًا الْأَشْعَرِيُّ عَقِيْدَةً الصُّوْفِيُّ طَرِيْقَةً الْحَنْفِيُّ عَمَلًا الشَّافِعِيُّ تَدْرِيْسًا خَادِمُ التَّفْسِيْرِ وَالْحَدِيْثِ وَالْفِقْهِ وَالْعَرَبِيَّةِ وَالْكَلَامِ

ইন্তেকাল : তিনি ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দ মুতাবিক ১১৭৬ হিজির ২৯ মুহাররম জোহরের সময় স্বীয় রবের ডাকে সাড়া দেন।

শিক্ষাগার

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে লাখো শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment