পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষায় মানুষ তার বক্তব্য প্রকাশ্যভাবে কিংবা আকার ইঙ্গিতে উপস্থাপন করে থাকে। আরবি ভাষায়ও রয়েছে অনুরূপ নীতিমালা। সরাসরি উপস্থাপনকে বলা হয় সরীহ (صَرِيْحٌ); আর ইঙ্গিতে উপস্থাপনকে বলা হয় কেনায়া (كِنَايَةٌ)।
সরীহ (صَرِيْحٌ) অর্থ কি ?
صَرِيْحٌ শব্দটি فَعِيْلٌ-এর ওজনে صَرَاحَةٌ মাসদার থেকে إِسْمُ فَاعِلٌ-এর সীগাহ। এর আভিধানিক অর্থ—
- الْإِظْهَارُ তথা প্রকাশ করা।
- الْوُضَاحَةُ তথা স্পষ্ট হওয়া।
- الصَّفَاءُ তথা পরিষ্কার হওয়া।
- الْخَالِصُ তথা মিশ্রণমুক্ত হওয়া।
- الِانْكِشَافُ তথা উন্মুক্ত।
- স্বচ্ছ হওয়া।
- উচ্চ অট্টালিকা ইত্যাদি।
সরীহ কাকে বলে?
صَرِيْحٌ-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা নিম্নরূপ—
১. আল মানার প্রণেতা আল্লামা নাসাফী (র.) বলেন— صَرِيْحٌ এমন শব্দকে বলা হয়, যার উদ্দিষ্ট অর্থ সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য; চাই তা হাকিকী হোক কিংবা মাজাযী হোক।
২. আল্লামা নিযামুদ্দীন শাশী (র.) বলেন—
الصَّرِيْحُ لَفْظٌ يَكُوْنُ الْمُرَادُ بِهِ ظَاهِرًا
অর্থাৎ, এমন শব্দকে صَرِيْحٌ বলা হয়, যার মর্মার্থ অনায়াসেই প্রকাশ পায়।
৩. মুফতি আমীমুল ইহসান (র.) বলেন—
الصَّرِيْحُ مَا ظَهَرَ مُرَادُهُ بَيِّنًا
মোটকথা, صَرِيْحٌ এমন শব্দ, যার মর্মার্থ সুস্পষ্ট অর্থাৎ যা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
আরও জানুন : নস(نَص) কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি? উদাহরণ সহ বিস্তারিত
সরীহ এর উদাহরণ:
যদি কোনো মনিব তার গোলামকে লক্ষ্য করে বলে— أَنْتَ حُرٌّ তথা তুমি স্বাধীন, অথবা স্বামী তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলে— أَنْتِ طَالِقٌ তথা তুমি তালাক, তাহলে বক্তার কথাই কার্যকর হবে। কারণ এখানে বক্তার ভাব প্রকাশ্যভাবেই বোঝা যায়, কোনো প্রকার تَأْوِيْلٌ তথা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। এখানে حُرٌّ এবং طَالِقٌ হলো صَرِيْحٌ তথা স্পষ্ট শব্দ।
সরীহ -এর হুকুম:
صَرِيْحٌ-এর হুকুম বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লামা নিযামুদ্দীন শাশী (র.) বলেন—
১. উদ্দিষ্ট বস্তুর সংবাদ, প্রশংসা অথবা সম্বোধন যে কোনো প্রকারেরই হোক না কেন সেটা তার নিজ অর্থকে ওয়াজিব করে দেয়।
২. إِنَّهُ يَسْتَغْنِيْ عَنِ النِّيَّةِ অর্থাৎ, এতে নিয়তের প্রয়োজন হয় না। যেমন কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে— أَنْتِ طَالِقٌ (তুমি তালাক), অথবা طَلَّقْتُكِ (আমি তোমাকে তালাক দিলাম) তাহলে তখনই তালাক পতিত হবে, তালাকের নিয়ত করুক বা না করুক।
কেনায়া অর্থ কি ?
الْكِنَايَةُ শব্দটি فَعَالَةٌ-এর ওজনে বাবে ضَرَبَ-এর মাসদার। এ শব্দটি আহেল আরবের উক্তি, كَنَيْتُ وَكَنَوْتُ থেকে গৃহীত। এ থেকেই জৈনক কবির উক্তি, وَإِنِّي لَأَكْنُو عَنْ قَذُوْرٍ بِغَيْرِهَا। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে—
- الْإِيْمَاءُ وَالْإِشَارَةُ তথা ইঙ্গিত করা।
- শব্দ উল্লেখ করে সত্যিকার অন্য অর্থ উদ্দেশ্য করা।
- অস্পষ্টভাবে কোনো কিছু বলা।
- خِلَافُ الصَّرِيْحِ-এর বিপরীত।
আরও জানুন : আমর (أَمْر) কাকে বলে? অর্থ, হুকুম ও কয়টি অর্থে ব্যবহার হয়
কেনায়া কাকে বলে ?
উসুলিবদগণ كِنَايَةٌ-এর বিভিন্ন বাক্যরীতিতে সংজ্ঞা প্রদান করেন। যথা—
১. ইমাম বাযদাবি (র.) বলেন—
الْكِنَايَةُ خِلَافُ الصَّرِيْحِ وَهُوَ مَا اسْتَتَرَ الْمُرَادُ بِهِ
অর্থাৎ, কিনায়া সিরিহ-এর বিপরীত। আর এটা হলো ঐ শব্দ, বিভিন্ন মর্মসম্ভাব্য হওয়ার কারণে যার উদ্দেশ্য অস্পষ্ট।
২. আল্লামা নিযামুদ্দিন শাশি (র.) বলেন—
الْكِنَايَةُ هِيَ مَا اسْتَتَرَ مَعْنَاهُ
অর্থাৎ, যার অর্থ অস্পষ্ট থাকে তাকে كِنَايَةٌ বলে।
কেনায়া এর উদাহরণ:
كِنَايَةٌ-এর উদাহরণ হলো— কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে বললো, أَنْتِ بَائِنٌ; এখানে بَائِنٌ শব্দটি হলো كِنَايَةٌ শব্দ। কারণ, এর অর্থ অস্পষ্ট এবং বিভিন্ন মর্মসম্ভাব্য। সুতরাং নিয়ত কিংবা দালালতে হাল ছাড়া এর দ্বারা তালাক পতিত হবে না।
কেনায়া এর হুকুম :
كِنَايَةٌ-এর বিধান হলো, বক্তার নিয়ত ব্যতীত তার সাথে আমল করা ওয়াজিব নয়। কেননা, এর উদ্দেশ্য গোপন ও অস্পষ্ট। ফলে أَنْتِ بَائِنٌ বা أَنْتِ حُرَّةٌ বললে যতক্ষণ পর্যন্ত তালাকের নিয়ত না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তালাক পতিত হবে না। অথবা যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়তের স্থলাভিষিক্ত কোনো কাজ পাওয়া না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তালাক পতিত হবে না।