ভাষার মাধ্যমে মনের ভাব সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায়। মানুষ তার মনের ভাব কখনো অল্প কথায় প্রকাশ করে আবার কখনো বিস্তৃত আকারে প্রকাশ করে। ভাবের সুসংগত সার্থক প্রসারণই ভাবসম্প্রসারণ। সম্প্রসারণ কথাটির অর্থ হলো প্রসারণ, বাড়ানো বা বিস্তৃতকরণ।
ক্ষুদ্র আকারে প্রকাশিত কোনো ভাবকে বিশদভাবে প্রকাশ করার নামই ভাবসম্প্রসারণ। ভাবসম্প্রসারণ সার্থক করতে হলে সারগর্ভ বাক্যটি মনোযোগ সহকারে বার বার পড়ে মূলভাব বুঝে নিতে হয়। কথার ভেতরে যে ভাব লুকিয়ে রয়েছে তা যথাযথ যুক্তি সহকারে প্রকাশ করতে হয়।
ভাবসম্প্রসারণ কাকে বলে?
ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে কবি-সাহিত্যিকগণ অনেক সময় স্বল্প কথায় গভীর ভাব প্রকাশ করে থাকেন। এসব ভাবকে সহজ-সরল ভাষায় বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করাকে ভাব সম্প্রসারণ বলে।
ভাবসম্প্রসারণ লেখার নিয়ম :
ভাবসম্প্রসারণ ৩টি অংশে বিভক্ত। সেগুলো হলো-
- মূলভাব।
- সম্প্রসারিত ভাব এবং
- মন্তব্য।
১। ভাব সম্প্রসারণ লেখার আগে প্রথমে প্রদত্ত অংশটি ভালো ভাবে কয়েকবার পড়তে হবে।
২। তারপর একটি বাক্যে বা অনুচ্ছেদে প্রদত্ত অংশের মূলভাব বা তাৎপর্য দেয়া।
৩। সম্প্রসারিত অংশটি মূলভাবের সাথে যথাযথ সংগতি রেখে অন্য আর একটি অনুচ্ছেদে সহজ সরল ভাষায় মূলভাবটিকে বিশ্লেষণ করা।
৪। মূলভাবকে সহজে বোঝানোর জন্য সম্ভবক্ষেত্রে উপমা উদাহরণ দেয়া।
৫। সবশেষে ভাব-সম্প্রসারণটি থেকে আমরা কী শিক্ষা গ্রহণ করলাম সে বিষয়ে ইঙ্গিত বা মন্তব্য দেয়া।
ভাবসম্প্রসারণ করার সময় যা করণীয় বা লক্ষ্যণীয় :
১. মূল ভাবটিকে যুক্তি-তর্কের সাহায্যে প্রসারিত করা।
২. নিজের ভাষায় অর্থাৎ সহজ, সরল ও মধুর ভাষায় লেখা।
৩. আয়তনের দিক থেকে সারাংশের মতো ক্ষুদ্র বা প্রবন্ধের মতো দীর্ঘ না করা।
৪. উপমা উদাহরণ দেয়ার প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক হওয়া।
৫. অবান্তর বা অপ্রাসঙ্গিক কথার অবতারণা না করা।
৬. একই কথা বা ভাবের পুনরাবৃত্তি না করা।
ভাবসম্প্রসারণ এর নমুনা
অভাবে স্বভাব নষ্ট।
মূলভাব : মানুষের চাহিদার কোনো সীমা নেই। একটি চাহিদা পূরণ হলে আর একটি চাহিদা এসে দেখা দেয়। চাহিদার মোহে পড়েই মানুষ অসৎ পথে পা বাড়ায়।
সম্প্রসারিত ভাব : এ জগতে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। এ প্রয়োজনের কোনো শেষ নেই। একটি প্রয়োজন মিটলে আর একটি প্রয়োজন এসে দেখা দেয়। আর এভাবে চলতেই থাকে। কেউ দু’ মুঠো ভাত আর একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেই খুশি। আবার কেউ বিশাল প্রাসাদে বাস করেও শান্তি পাচ্ছে না। তার আরো সম্পদের দরকার। কারো বাঁচার তাগিদ, আবার কারো বিলাস উচ্চাকাঙ্ক্ষা। এটাই আজকের সমাজের চিত্র। কিন্তু যে প্রয়োজনটুকু না মিটলেই নয়, যা দৈনন্দিনের প্রয়োজন, বেঁচে থাকার জন্য যা না হলেই নয়, তা যদি না পাওয়া যায় তা হলেই জীবনে নেমে আসে অভিশাপ। কোনো নীতি কথায় মানুষের অভাব মিটে না। অভাব দূর করার জন্য সমস্ত ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে বেছে নেয় অবৈধ পথ। তাই বলা যায়, অভাব একটি বড় অভিশাপ। অভাবের তাড়নায় মানুষ ঘৃণিত পথে চলতে বাধ্য হয়। অভাবে পড়লে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। অভাব কোনো ন্যায় অন্যায় বুঝে না। ফলে মানুষের জীবন হয়ে ওঠে অতিষ্ঠ ও জ্বালাময়। তাই জীবনকে সুন্দর করতে হলে অভাবের সময় ধৈর্যধারণ করতে হবে। ধৈর্যের সুফল অনিবার্য।
মন্তব্য : অভাব মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে এবং অনেক সময় ভুল পথে নিয়ে যায়। তাই জীবনকে সুন্দর করতে হলে অভাবের সময় ধৈর্যধারণ করতে হবে। ধৈর্যের সুফল অনিবার্য।
ভাব সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা :
পাঠককে সাধারণত লেখকের লেখার ভাব বোঝার জন্য কিছুটা চেষ্টা করতে হয়। ছোট আকারের কথার মধ্যে গভীর ভাব ফোটানোই লেখকের কৃতিত্ব। কিন্তু পাঠককে তা খুঁজে বের করতে হয়। ভাব খোঁজার এই কাজটি সহজ করার জন্যই ভাব সম্প্রসারণ। ভাবের ব্যঞ্জনা ইঙ্গিতের বাইরে এনে ভাব সম্প্রসারণের মাধ্যমে মূলকথা প্রকাশ করাই এর লক্ষ্য। ভাব সম্প্রসারণের ফলে বক্তব্য বিষয় সহজে পাঠকের কাছে ধরা পড়ে। এতে বিষয়ের জটিলতা দূর হয় এবং পাঠক বক্তব্যের মর্ম বুঝতে সক্ষম হন।


