ভাষায় ভুল বানান পরিহার করে শুদ্ধ বানান লেখা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত শিক্ষা ও আয়ত্তের ব্যাপার। একজনের কাছে যে বানানটি খুব সহজ, অন্যজনের কাছে সেটি হয়ত খুব কঠিন মনে হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজের ভুল বানানগুলো খেয়াল করে দক্ষতা ও উৎকর্ষ অর্জন করতে হয়। নিচে বাংলা শব্দের সঠিক বা শুদ্ধ বানান পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো-
বাংলা শব্দের সঠিক বা শুদ্ধ বানান পদ্ধতি
বানান ভুলের তালিকা রাখা: যেসব বানান কঠিন সেগুলো লিখে খাতায় তালিকাবদ্ধ করে মুখস্থ করতে হবে এবং মাঝে মাঝে লিখে ও বাক্যে প্রয়োগ করে সেগুলো আয়ত্তে এসেছে কিনা তা দেখতে হবে।
অভিধানের সাহায্য নেয়া: হাতের কাছে অভিধান রাখতে হবে। কোনো শব্দের বানান নিয়ে সন্দেহ হওয়া মাত্রই চট করে অভিধানের সঙ্গে তা মিলিয়ে নিতে হবে। বানান শুদ্ধ আছে কিনা সে সম্পর্কে সন্দেহ-প্রবণতা বানান-দক্ষতা অর্জনে ভালো কাজ দেয়। সন্দেহ হলেই আলসেমি কিংবা অনুমানের ওপর নির্ভর না করে সঙ্গে সঙ্গে অভিধান দেখে বানান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। এভাবে অভিধান দেখতে দেখতে একসময় বানানে দক্ষ হয়ে ওঠা যাবে।
বানানের ক্ষেত্রে অসাবধানতা ও অমনোযোগিতা পরিহার করা: অনেক ক্ষেত্রে বানান ভুলের কারণ অজ্ঞতা নয়, অসাবধানতা ও অমনোযোগিতা। লেখার পর পুনর্বার পড়ে ভুল সংশোধন না করলে কিংবা প্রুফ না দেখলে লেখায় ভুল থেকে যায়। অনেকসময় তাড়াহুড়ো করে লেখার কারণেও প্রচুর বানান ভুল হয়ে থাকে। পরীক্ষার উত্তরপত্রে এটা বেশি দেখা যায়।
এ ধরনের ভুল পরিহারের জন্য লেখা শেষ করার পর ধীরে-সুস্থে আবার তা পড়ে দেখা উচিত। কঠিন শব্দগুলো খুঁটিয়ে দেখা ভালো। যে কোনো লেখার কাজ শেষ হওয়ার পর তা সতর্কতার সঙ্গে পুরোপুরি খুঁটিয়ে দেখলে বহুলাংশে বানান ভুল পরিহার করা যায়। মুদ্রিতব্য লেখায় যেন বানান ভুল না থাকে সেজন্য কয়েকবার করে দেখে ভুল সংশোধন করা উচিত।
শব্দকে ছবির মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য করার চেষ্টা: পড়ুয়া লোকেরা কম পড়ুয়া লোকের চেয়ে বানানে দক্ষ। এর কারণ, শব্দ দেখতে দেখতে শব্দের বানান তাদের মনের মাঝে গেঁথে যায়। তবে এটাও ঠিক যে, অনেক সময় আমরা শব্দ পড়ে যাই, কিন্তু মনোযোগ দিয়ে বানান খেয়াল করি না। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, আমরা উচ্ছ্বাস, সান্ত্বনা, ভৌগোলিক, মধুসূদন, মুহূর্ত ইত্যাদি শব্দ শিক্ষাজীবনে অসংখ্যবার পড়ি; কিন্তু তার পরেও লিখতে গিয়ে বানান ভুল করি।
তাই বানান শেখার জন্য দরকার, শব্দের বানান খুঁটিয়ে দেখা। অনেকেই শব্দের বানানকে ছবির মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য করে মনে রাখতে পারে। এ-রকম মনে রাখতে পারলে বানান ভুল কম হয়। তাছাড়া বানান শেখার সময়ে প্রতিটি হরফ, কার,-ফলা, যুক্তব্যঞ্জন ইত্যাদি একটি একটি করে উচ্চারণ করা উচিত। তাহলে শব্দের শ্রুতিগ্রাহ্য স্মরণশক্তি গড়ে উঠবে।
লিখন অভ্যাস গড়ে তোলা: কঠিন শব্দের বানান শেখার সময়ে তা বারবার লেখা ভালো। যদি নীতি বানানটি লিখতে ভুল হয় তবে তা দশ, বিশ বা ত্রিশবার লিখতে হবে। সেই সঙ্গে নীতি শব্দটি সহযোগে গঠিত অন্যান্য শব্দ যেমন, দুর্নীতি, নীতিবান, নীতিনিষ্ঠ, ন্যায়নীতি ইত্যাদিও লিখতে হবে।
তাহলে বানানটি দ্রুত আয়ত্তে আসবে। লেখার সময়ে মনে মনে বা উচ্চারণ করে বানান করা ভালো। এক্ষেত্রে ক. পরপর বানান দেখা, খ. মনোযোগের সঙ্গে সতর্কভাবে তা লেখা, গ. একই সঙ্গে তা উচ্চারণ করা-এ তিনের সংযোগে বানান আয়ত্ত করায় খুব ভালো কাজ দেয়।
নতুন শব্দ শেখা: পাঠ্যবইতে নতুন কোনো শব্দ দেখলেই তা শুদ্ধভাবে শিখে নেয়া উচিত। যেসব শব্দের বানান জটিল মনে হবে তা অবশ্যই চিহ্নিত করা দরকার (এজন্য রঙিন মার্কিং কলম ব্যবহার করা ভালো)। নতুন শব্দের বানান ও অর্থ আয়ত্তে না আসা পর্যন্ত তা লেখায় ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ কোনো শব্দের ভুল বানান লেখা শুরু করলে তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
মনে রাখার কৌশল অলবম্বন: জটিল বানানকে অন্য কোনো সহজ বানানের সঙ্গে সম্পর্কিত করলে অনেক সময় বানান মনে রাখা সহজ হয়। যেমন-“শ্বশুর অশ্ব-শিশুর মালিক”- এই কথাটা মনে রাখলে শ্বশুর শব্দের শ ও শুর বানান সহজে মনে রাখা যায়। আবার “শাশুড়ি শুয়ে শাল মুড়ি দিয়ে”- বাক্যটি মনে রাখলে শাশুড়ি বানান ভুল হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের কৌশল বানান শেখায় খুব কাজে লাগে।
পরিশেষ : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, উল্লিখিত বানানের নিয়ম অনুসরণ ছাড়াও শব্দের মূল, ধাতু, উপসর্গ, প্রত্যয়, সমাস, সন্ধি ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান বানান- দক্ষতা অর্জনে বেশ কাজে লাগে। বিশেষ করে সন্ধির জ্ঞান বাংলা ভাষার বানান দক্ষতার জন্য অপরিহার্য।