জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রচনা

উপস্থাপনা :

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নত বিশ্বের অযাচিত কাজের ফসল এই জলবায়ু পরিবর্তন, যার কারণে আজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। পৃথিবীর তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ একটি সময়ের দাবি, কেননা সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে।

জলবায়ু কী :

কোনো অঞ্চলের বায়ুর চাপ, বায়ুর তাপ, বৃষ্টিপাত ও বায়ুপ্রবাহের কমপক্ষে ৩০-৩৫ বছরের গড় অবস্থাকে ওই অঞ্চলের জলবায়ু বলা হয়। কোনো স্থানের আবহাওয়া অস্থায়ী, কিন্তু জলবায়ু স্থায়ী। আবহাওয়ার উপাদানের তারতম্যের ভিত্তিতে পৃথিবীকে উষ্ণমণ্ডল, উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল, মৃদু শীতল নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল, মেরুদেশীয় ও উচ্চ পার্বত্য ভূমি— এই জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করা হয়। অক্ষাংশ, উচ্চতা, সমুদ্র স্রোত, সমুদ্র হতে দূরত্ব, বায়ুপ্রবাহ ও বনভূমি জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে।

পরিবর্তনের কারণ :

বিশ্বে প্রতিনিয়ত বৃক্ষনিধন, শিল্প-কারখানা স্থাপন, দূষণ ও নগরায়ণ ঘটছে। ফলে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন ও ক্লোরোফ্লোরো কার্বনের মতো ক্ষতিকর গ্যাস বাড়ছে। এসব গ্যাস গ্রিন হাউজ প্রভাব সৃষ্টি করে। সূর্যের তাপ যে পরিমাণে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তার সবটা বের হতে পারে না। একই সাথে ওজোন স্তরের আবরণ ক্ষয় হচ্ছে। এতে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে পড়ছে। ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

বৈশ্বিক চিত্র :

২০০৭ সালে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত পরিবেশ সম্মেলনে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয়। তাতে বলা হয়, ২০৮০ সালের মধ্যে আফ্রিকা ও এশিয়ার ৩০০ কোটি মানুষ ভয়াবহ পানি ও খাদ্য সংকটে পড়বে। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গাছপালা ও প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। বিশ্বের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। আইপিসিসির চতুর্থ রিপোর্টে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ৯০ শতাংশেরও বেশি মানবসৃষ্ট গ্রিন হাউজ গ্যাস দায়ী।

প্রভাব :

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাহাড়ের বরফ ও মেরু অঞ্চলের হিমবাহ গলছে। এতে সমুদ্রের পানির স্তর বাড়ছে। জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বাড়বে এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হবে। এছাড়া বন্যা, দুর্ভিক্ষ, সাইক্লোন ও ঝড় দেখা দিচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে এবং সবুজ বৃক্ষরাজি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন নতুন রোগব্যাধির প্রকোপও বাড়ছে। পানিতে লবণাক্ততা বাড়লে জমির উর্বরতা কমে যায়। ফসলহানির ফলে খাদ্যাভাব ও অপুষ্টি দেখা দেয়।

বাংলাদেশের অবস্থা :

জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ প্রভাব আমাদের দেশে পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশের ৫৬,৯৭৭ বর্গমাইল এলাকার মধ্যে বনভূমি মাত্র ১০,০০০ বর্গমাইল, যা নিতান্তই অপ্রতুল। তাই প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, বন্যা, সিডর ও আইলার মতো দুর্যোগে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষকদের আশঙ্কা, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ১৭% ভূমি সমুদ্রে তলিয়ে যাবে।

২০৫০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য সমস্যা :

২০৫০ সালের মধ্যে দেশের নদীগুলোর পানির প্রবাহ ১০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। প্রতি বছর ৭০ মিলিয়ন মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হতে পারে। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিলে ধান ও গমের উৎপাদন ৮ থেকে ৩২ ভাগ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

বৈশ্বিক ও জাতীয় উদ্যোগ :

১৯৭২ সালে স্টকহোমে প্রথম জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলন হয়। ১৯৮৮ সালে আইপিসিসি গঠিত হয়। ১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকলে উন্নত দেশগুলো গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ ৫ শতাংশ কমাতে সম্মত হয়। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে এবং ২০২১ সালে গ্লাসগোতে (কপ-২৬) জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। এরপর জাতীয় সংরক্ষণ কৌশল (NCS) ও জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্ম পরিকল্পনা (NEMAP) তৈরি হয়।

প্রতিকার :

বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং বনভূমি রক্ষা করতে হবে। তেল, কয়লা ও গ্যাসের ব্যবহার কমাতে হবে। কলকারখানা সঠিক নিয়মে চালাতে হবে, যাতে বিষাক্ত গ্যাস কম বের হয়। ওজোন স্তরের ক্ষয় রোধ করতে হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করতে হবে।

উপসংহার :

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিপজ্জনক জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা জরুরি। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব বিপদ থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে।


Author

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment