প্রাণীদের বৈচিত্র্যময়তার জন্য প্রাণী বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভাবে প্রাণী জগতের শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। নিম্নে তা উদাহরণ সহ উল্লেখ করা হলো :
প্রাণী জগতের শ্রেণীবিন্যাস :
১. আকার ও আকৃতির ভিত্তিতে :
ক। অতি-আণুবীক্ষনিক : উদাহরণ – Plasmodium vivax (ম্যালেরিয়া জীবাণু।।
খ। আলোক আণুবীক্ষণিক : উদাহরণ – এ্যামিবা, হাইড্রা, সাইক্লোপস্, ড্রাফনিয়া ইত্যাদি ।
গ। বড় প্রাণী :- উদাহরণ – পিঁপড়া, মাছি, কেঁচো, আরশোলা, কুমীর, কুকুর, বিড়াল, তিমি, মানুষ ইত্যাদি।
২. প্রতিসাম্যের ভিত্তিতে : জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের আনুপাতিক আকৃতি, গঠন, আকারের বিবরণ ইত্যাদিকে প্রতিসাম্য বলে । প্রতিসাম্যের ভিত্তিতে প্রাণী প্রধানতঃ চার প্রকারের হয় যথা–
ক। অপ্রতিসাম্য : উদাহরণ – অ্যামিবা, শামুক ইত্যাদি।
খ। দ্বি-পার্শ্বীয় প্রতিসাম্য : উদাহরণ- আরশোলা, টিকটিকি, ব্যাঙ, মানুষ ইত্যাদি ।
গ। অরীয় প্রতিসাম্য : উদাহরণ- হাইড্রা, জেলী ফিস, তারামাছ ইত্যাদি ।
ঘ। গোলীয় প্রতিসাম্য : উদাহরণ – ভলবক্স, কলোনী ইত্যাদি ।
আরও জানুন : শ্রেণীবিন্যাস: সংজ্ঞা, ধাপ, নীতি, উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা, নিয়ম
৩. বাসস্থানের ভিত্তিতে : বাসস্থানের ভিত্তিতে প্রাণী বিভিন্ন প্রকার হয়। যেমন-
ক। স্থলচর : এরা স্থলে বা ডাঙ্গায় বাস করে’। যেমন- আরশোলা, কুনোব্যাঙ, ছাগল, মানুষ ইত্যাদি ।
খ। জলচর : এরা পানিতে বাস করে। জলচর প্রাণী আবার দু প্রকার । যথা-
i. স্বাদু পানির প্রাণী : উদাহরণ – হাইড্রা, শিং, কই, সোনাব্যাঙ ইত্যাদি।
ii. সামুদ্রিক প্রাণী : উদাহরণ – ইলিশ, লইট্টা, ভলকিন, তিমি ইত্যাদি ।
গ। খেচর : এসব প্রাণী আকাশে উড়তে পারে। উদাহরন – বাঁদুর, চামচিকা, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ইত্যাদি।
ঘ। বৃক্ষবাসী : এরা গাছে বাস করে। উদাহরন – গেছো ব্যাঙ, অজগর সাপ, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, লেমুর, চিতাবাঘ ইত্যাদি।
ঙ। মরুবাসী : উদাহরন- এরা মরুভূমির প্রাণী ।
চ। গর্তবাসী : ইঁদুর, শিয়াল, প্লাটিপ্লাস, কিছু কিছু প্রজাতির সাপ ইত্যাদি ।
ছ। মেরুবাসী : মেরু অঞ্চলের বরফাচ্ছন্ন স্থানে কিছু কিছু প্রাণী বাস করে। উদাহরন- শ্বেতভল্লুক, বল্গা-হরিণ ইত্যাদি।
জ। অরণ্যবাসী : বাঘ, ভাল্লুক, হরিণ, ময়ূর, হাতি, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পাখি, শূকর, বন্য মহিষ ইত্যাদি প্রাণী গভীর অরণ্যে বাস করে।
ঝ। পর্বতবাসী : গয়াল, হাতি ইত্যাদি প্রাণী পাহাড়িয়া অঞ্চলে বাস করে ।
৪. স্বভাবের ভিত্তিতে : স্বভাবের ভিত্তিতে প্রাণী প্রধানত দুই প্রকার । যথা –
ক। দিবাচর : যথা- হরিণ, কাঁঠবিড়ালী, গরু, ঘোড়া, হাঁস-মুরগী ইত্যাদি ।
খ। নিশাচর : যথা- বাঘ, শিয়াল, বিভিন্ন ধরনের মথ, ছুঁচো ইত্যাদি ।
আরও জানুন : প্রাণী বৈচিত্র্য কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি-উদাহরণ সহ
৫. খাদ্যের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে : খাদ্যের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে প্রাণী প্রধানতঃ তিন ধরনের। যথা –
ক। উদ্ভিদভোজী বা শাকাসী বা তৃণভোজী : যথা- ছাগল, ভেড়া, গরু, মহিষ, হাতি, ঘোড়া, গিনিপিগ ইত্যাদি।
খ। মাংশাসী বা মাংসভোজী : যথা – বাঘ, সিংহ, শেয়াল, শকুন, হায়না, চিল ইত্যাদি ।
গ। সর্বভুক্ত, যথা- আরশোলা, কাক, গৃহপালিত কুকুর, বিড়াল ও মানুষ।
৬. পুষ্টি লাভের ভিত্তিতে : পুষ্টিলাভের ভিত্তিতে প্রাণী দু’ধরনের । যথা –
ক। হলোজোয়ীকি বা পরভোজী বা জুয়োট্রফিক : ইহা আবার দুই প্রকার যথা-
i. মৃতজীবি : যথা- আরশোলা, কাক, শকুন ইত্যাদি ।
ii. পরজীবি : যথা – ম্যালেরিয়া জীবাণু ।
খ। শিকারী প্রাণী : যথা- বাঘ, সিংহ, শেয়াল, নেকড়ে ইত্যাদি ।
৭. মেরুদণ্ডের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ভিত্তিতে : প্রাণীদের মেরুদণ্ডের উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির ভিত্তিতে প্রধান দু ভাগে ভাগ করা যায় । যথা –
ক। অমেরুদণ্ডী প্রাণী (Invertebrates। বা মেরুদণ্ডহীন প্রাণী : যথা- অ্যামিবা, কেঁচো, আরশোলা, তারামাছ, অক্টোপাস, শামুক, ঝিনুক, হুকওয়ার্ম ইত্যাদি ।
খ। মেরুদণ্ডী প্রাণী (Vertebrates। বা মেরুদণ্ড বিশিষ্ট প্রাণী : যেমন – লোনা পানির মাছ, উভচর প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি মানুষ ইত্যাদি।
৮. অর্থনৈতিক গুরুত্বের ভিত্তিতে : মানুষের অর্থনৈতিক গুরুত্বের ভিত্তিতে প্রাণীদেরকে প্রধান দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যথা –
ক। উপকারী প্রাণী : যথা- মিঠা এবং সামুদ্রিক পানির মাছ, কুকুর, বিড়াল, ছাগল, গরু, ঘোড়া, গাধা, হাতি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।
খ। ক্ষতিকর প্রাণী : যথা- ম্যালেরিয়া জীবাণু, মশা, মাছি, ফিতাকৃমি, বিষাক্ত সাপ, ইঁদুর, বাঘ, সিংহ ইত্যাদি ।
আরও জানুন : দ্বিস্তরী ও ত্রিস্তরী প্রাণীর-সংজ্ঞা,উদাহরণ,পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য
প্রাণী জগতের শ্রেণীবিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা :
শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে কোনো প্রাণিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত একটি প্রাণী সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করলে ঐ গোষ্ঠীর অন্যান্য প্রাণী সম্বন্ধে ধারণা জন্মে। যেমন : Arthropoda পর্বের সকল প্রাণির উপাঙ্গ সন্ধিযুক্ত। মাথায় এক বা দু’জোড়া অ্যান্টেনা ও পুঞ্জাক্ষি থাকে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো মৌমাছি, প্রজাপতি, কাঁকড়া, চিংড়ি সকলের মধ্যেই বিদ্যমান। ফলে, শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে কম পরিশ্রম ও অল্প সময়ে প্রাণিজগতের অনেক সদস্য সম্পর্কে জানা ও শেখা যায়।
আবার Echionodermata পর্বের প্রাণীগুলো কণ্টকময় হলেও কোনোটি দেখতে তারার মতো আবার কোনোটি দেখতে গোল বা শশার মতো। ফলে বলা যায় যে, শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে প্রাণিকূলের পারস্পরিক সম্পর্ক বা জাতিজনির বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। প্রাণিকূলের বিবর্তনিক ধারা নির্ণয়ে শ্রেণিবিন্যাস সাহায্য করে।
অন্যদিকে, Mollusca পর্বের প্রাণীরা খোলকবাহী হওয়ায় যে কোনো প্রাণীর দেহে শক্ত খোলস থাকলে এবং তা অখণ্ডকায়িত হলে শ্রেণিবিন্যাসের সাহায্যে নতুন প্রজাতি শনাক্ত করা সম্ভব। তাছাড়া বিভিন্ন প্রাণির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বা জাতিজনির বিভিন্ন তথ্য শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে পাওয়া যায়।
প্রাণীজগতের পর্ব কয়টি ও কি কি ?
প্রাণীজগতকে প্রধানত ৯টি পর্বে বিভক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হলো –
| পর্ব নং | পর্বের নাম (ইংরেজি ও বাংলা) |
|---|---|
| ১ | Porifera (পরিফেরা) |
| ২ | Cnidaria (নিডারিয়া) |
| ৩ | Platyhelminthes (প্লাটিহেলমিনথিস) |
| ৪ | Nematoda (নেমাটোডা) |
| ৫ | Annelida (এনিলিডা) |
| ৬ | Arthropoda (আর্থ্রোপোডা) |
| ৭ | Mollusca (মোলাস্কা) |
| ৮ | Echinodermata (একাইনোডার্মাটা) |
| ৯ | Chordata (কর্ডাটা) |
প্রাণিজগতের পর্ব ও পরিচিত নাম
| পর্বের নাম | কি নামে পরিচিত |
|---|---|
| 1. Porifera | ছিদ্রালো প্রাণী |
| 2. Cnidaria | একনালি দেহী / সমুদ্রের ফুল |
| 3. Platyhelminthes | চ্যাপ্টাদেহী প্রাণী |
| 4. Nematoda | নলাকার প্রাণী |
| 5. Annelida | অঙ্গূরীযুক্ত প্রাণী |
| 6. Arthropoda | সন্ধিপদী প্রাণী |
| 7. Mollusca | নরমদেহী প্রাণী / খোলসযুক্ত প্রাণী |
| 8. Echinodermata | কণ্টকত্বক প্রাণী |
| 9. Chordata | মেরুদণ্ডী প্রাণী |
