উপস্থাপনা :
আরবি চান্দ্র মাস রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ বিশ্ব মুসলিমের নিকট পবিত্র দিন। এ দিনই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছেন। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে ঐ নির্দিষ্ট দিনেই তার তিরোধান সংঘটিত হয়। এ কারণে দিনটি যুগপৎ আনন্দ ও বেদনার দিন হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী কী :
আরবী ‘ঈদ’ অর্থ খুশি বা আনন্দ উৎসব। আর ‘মিলাদ’ অর্থ জন্মক্ষণ বা দিন। সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থ হলো জন্মদিনের উৎসব। রাসূল (স) যে ১২ রবিউল আউয়াল এ পৃথিবীতে এসেছেন এবং যেদিন তিনি ইন্তেকাল করেছেন সেদিনটি ঈদ হিসেবে পরিগণিত।
ঈদে মিলাদুন্নবী (স)-এর উদ্দেশ্য :
যাঁর কল্যাণে বিশ্ব মুসলিম আল্লাহকে চিনেছে, মুক্ত হয়েছে সমস্ত শিরক হতে এবং খুঁজে পেয়েছে আখিরাতের মুক্তিপথ, সে মহান ব্যক্তিত্বের অনুসৃত পথে চলার বারতা নিয়ে আসে এ দিনটি।
আরও পড়ুন : ঈদ উৎসব বাংলা রচনা – ক্লাস 6, 7, 8, 9, 10
ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন :
এদিন সকল মুসলমানের হৃদয় উচ্ছ্বসিত হয়ে গাম্ভীর্যের সাথে দিবসটি উদযাপিত হয় প্রতিটি মুসলিম ঘরে, প্রতিটি মুসলিম সমাজে ও রাষ্ট্রে। এ দিন আসলে মানব মনে ইসলাম সম্পর্কে জানার কৌতুহল বেড়ে যায় ।
সরকারিভাবে মিলাদুন্নবী :
এ দিনটি থাকে সরকারি ছুটির দিন। এদিন রাষ্ট্রীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় সকল সরকারি ভবনে । পবিত্র কালেমা ও কুরআনের বাণীতে সজ্জিত করা হয় শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন :
বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় সংগঠন মহানবীর জীবন ও কর্মধারা নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করে । অনেকে কালেমা খচিত প্লেকার্ড নিয়ে বর্ণাঢ্য র্যালিও বের করে ।
সেমিনার-সিম্পোজিয়াম :
বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এদিন রাসূল (স)-এর কর্মময় জীবনাদর্শ নিয়ে সেমিনার- সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে। আলোচনা হয় তাঁর জীবনাদর্শ নিয়ে । তারা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করে ।
আরও পড়ুন : পবিত্র মহররম – বাংলা প্রবন্ধ রচনা
প্রচার মাধ্যম :
রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম বেতার ও টেলিভিশন এ দিন বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে এবং এ দিবসটি উদযাপনের খবর গুরুত্বের সাথে প্রচার করে । সংবাদপত্রগুলো এ উপলক্ষে বের করে বিশেষ ক্রোড়পত্র ।
সাধারণ সমাজে মিলাদুন্নবী :
সাধারণ সমাজে মিলাদুন্নবী বলতে শুধুমাত্র হযরত মুহাম্মদ (স)-এর জন্মবৃত্তান্ত পাঠকেই বুঝানো হয়। বাস্তবে তারা এর সঠিক উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম হয় না ।
ঈদে মিলাদুন্নবীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য :
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) হচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তিনি ছিলেন একাধারে সমাজপতি, সমরনায়ক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং একজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীও বটে । যাকে সৃষ্টি করা না হলে পুরো দুনিয়াটাই সৃষ্টি করা হতো না ।
সেই মহামানবের আবির্ভাব ও তিরোধান দিবস হলো ১২ রবিউল আউয়াল । তাই সঙ্গত কারণেই ঈদে মিলাদুন্নবী গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম ।
মিলাদুন্নবীর শিক্ষা :
ঈদে মিলাদুন্নবী জাতীয় জীবনে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। এদিন সমগ্র মুসলমান এক কাতারে শামিল হয় ৷ এদিনটি ভ্রাতৃত্বপ্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হতে শিক্ষা দেয় ।
আরও পড়ুন : প্রবন্ধ রচনা : ঈদুল ফিতর
ঈদে মিলাদুন্নবী এক অসীম প্রেরণা:
ঈদে মিলাদুন্নবী (স) মুসলমানদের মাঝে এক অসীম প্রেরণা সৃষ্টি করে। এ দিনে প্রতিটি মুসলিম সত্তা নব উৎসাহ-উদ্দীপনায় জেগে ওঠে। রাসূল (স) এ পৃথিবীতে আগমন করলেন মানুষকে অন্ধকারের অমানিশা থেকে মুক্ত করতে। তিনি ঐশী বাণী ও স্বীয় চরিত্র মাধূর্যবলে এক স্বর্গীয় সোনালি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিহাসের সোনালি পটভূমিকায় এ মহামানবের জন্ম দিন সমগ্র মানবসত্তার জন্য এক অসীম প্রেরণা।
ইসলামের প্রসার:
ঈদে মিলাদুন্নবী (স) মুসলিম মিল্লাতে নবচেতনা জাগ্রত করে। এর মাধ্যমে মুসলিমগণ রাসূল (স)-এর জীবনবৃত্তান্ত জানার চেষ্টা করে। দীর্ঘ এক বছর পর ঈদে মিলাদুন্নবী আমাদের মাঝে আসে এবং নতুন প্রেরণা যোগায়। এ প্রেরণাই আমাদের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। আমরা নতুনভাবে নবী জীবনের অনেক কিছু জানতে এবং তা প্রচার করতে পারি।
ঈদে মিলাদুন্নবী প্রেমের অনুপম দৃষ্টান্ত:
সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী হিসেবে মহান রাব্বুল আলামীন মহানবী (স)-কে প্রেরণ করে দ্বীনের পূর্ণতা সাধন করেছেন। প্রতি বছর ঈদে মিলাদুন্নবী মুসলিম মিল্লাতে নবী প্রেমের প্রেরণাসহ মহাসমারোহে উপস্থিত হয়। এ দিনে মুসলমানগণ নব চেতনা লাভ করে। মূলত এটা মুসলমানদের একটা সাংস্কৃতিক ধারা, ঐতিহ্যের ধারাবাহিক লালন।
জাতীয় জীবনে ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রভাব:
ঈদে মিলাদুন্নবী জাতীয় জীবনে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। জাতীয় পর্যায়ে ঈদে মিলাদুন্নবী মুসলমানদের মঝে ঐক্য, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করে তাদেরকে কল্যাণের দিকে পরিচালিত করে।
আরও পড়ুন : রচনা : কুরবানি/কুরবানির শিক্ষা /জাতি গঠনে কুরবানির ভূমিকা
ঈদে মিলাদুন্নবী তাওহীদী প্রেরণার উৎস:
ঈদে মিলাদুন্নবী তাওহীদী প্রেরণার এক অনুপম উৎস। এর মাধ্যমে একই নিয়মতান্ত্রিকতায় একই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে খোদাপ্রেমে উৎসাহী হয়ে মানুষ তাওহীদী প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়।
নবী জীবনের শিক্ষা:
ঈদে মিলাদুন্নবীর মাধ্যমে আমরা জীবনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করতে পারি, জানতে পারি তার দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাবহুল শিক্ষণীয় দিকগুলো।
মিলাদুন্নবীর নামে অপসংস্কৃতি:
এ উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশে মুসলিম নামধারী কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন মিলাদুন্নবীর নামে এমনসব বিদয়াতি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যা ইসলামী সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। গানবাদ্য, নৃত্য-মাতম ও জসনে জুলুসের মাধ্যমে মিলাদুন্নবী উদযাপনের নামে তারা জনসাধারণের কাছে ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে।
আবার কেউ কেউ নিজেদেরকে আশেকে রাসূল দাবি করে মাজারভিত্তিক মিলাদুন্নবী পালন করে নবীর সুন্নাহ ও ইসলামের প্রতি নিদারুণ বিদ্রূপ প্রদর্শন করে থাকে অনেকে প্রাত্যহিক মৌলিক ইবাদত-বন্দেগী পালন অপেক্ষা বছরে একদিন মিলাদুন্নবী উদযাপনকেই ইসলামের প্রধানতম কর্তব্য মনে করে। এ সবই ইসলামী সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি।
উপসংহার :
ঈদে মিলাদুন্নবী জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা তুলে ধরে। ইসলামের যথার্থ অনুশীলন ও ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা নবজাগরণের শপথ গ্রহণ করে।
তবে যেদিন সারা বিশ্বের মুসলিম একতাবদ্ধ হয়ে রাসূল (স)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ইসলামী সমাজ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, সেদিনই কেবল ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ উদযাপন সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে ।