সূচনা :
শিশু যেমন তার মায়ের কোলকেই বেশি সুখদায়ক মনে করে, আমাদের গ্রামটিও আমার কাছে তেমনই সুখদায়ক মনে হয়। আমি এখানে জন্মেছি। এখানকার আলো-বাতাসে বেড়ে উঠছি। এ গ্রামের মানুষের কাছে পেয়েছি আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা। তাই আমার গ্রামকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি।
নাম ও অবস্থান :
আমাদের গ্রামের নাম শেরপুর। এটি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার অন্তর্গত একটি সুপরিচিত গ্রাম। গ্রামটির দৈর্ঘ্য দুই কিলোমিটার এবং প্রন্থ এক কিলোমিটার। গ্রামের মাঝখান দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে চলে গেছে শেরশাহের তৈরি একটি মহাসড়ক। যা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে পরিচিত। গ্রামের পূর্ব পাশে বিশাল মাঠ; দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে বিশাল ফসলের মাঠ। এখানে ধান, পাট, গমসহ বিভিন্ন ফসল ফলে। গ্রামের পূর্ব ও পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে দুটি খাল।
আয়তন, লোকসংখ্যা এবং পেশা :
আমার গ্রাম দৈর্ঘ্যে প্রায় এক কিলোমিটার ও প্রস্থে আধা কিলোমিটার থেকে কিছু কম। গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। এই গ্রামে হিন্দু ও মুসলমান একত্রে বসবাস করে। গ্রামের অনেকে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে ভালো চাকরি করেন। গ্রামের বয়স্ক লোকেদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো ব্যবসা কিংবা কৃষিকাজ করে জীবিকানির্বাহ করেন। অন্যান্য পেশার লোকও আছে। তাঁদের মধ্যে শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জেলে, কামার, কুমার, সুতার উল্লেখযোগ্য। গ্রামের অধিকাংশ লোক শিক্ষিত।
আরও দেখুন : আমাদের বিদ্যালয় – রচনা : ( ক্লাস ৬, 7, 8 )
ঘরবাড়ি:
গ্রামের অধিবাসীদের বাড়িঘর প্রধানত টিনের তৈরি। গ্রামে দশটি পাকা বাড়িও আছে। এখানে ছনের বা খড়ের ঘর নেই বললেই চলে।
উৎপন্ন দ্রব্য:
গ্রামের প্রধান উৎপন্ন দ্রব্যের মধ্যে ধান, পাট, গম, ডাল, সরিষা, তিল, তামাক, ইক্ষু এবং বিভিন্ন রকম শাকসবজি উল্লেখযোগ্য। পুকুর, নদী ও খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। বাগানে আম, জাম, কলা, নারিকেল, সুপারি, তাল, পেয়ারা, বেল প্রভৃতি ফল প্রচুর উৎপন্ন হয়। এককথায় আমাদের গ্রামটি কৃষিভিত্তিক স্বনির্ভর একটি গ্রাম।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান :
আমার গ্রামে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা আছে। ফলস্বরূপ গাঁয়ের ছেলে-মেয়েরা গত কয়েক বছর ধরেই ভাল ফলাফল করছে। সন্ধ্যার পর চৌধুরিবাড়ির বৈঠকখানায় বয়স্ক লোকদের লেখাপড়ার আসর বসে। গাঁয়ের কয়েকজন শিক্ষিত যুবক তাঁদের পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই আমাদের গ্রামে কোনো নিরক্ষর নেই। এ ছাড়া নদীর তীরে নতুন বাজারে পোস্ট অফিস, টেলিগ্রাম, দাতব্য চিকিৎসালয়, কৃষি অফিস আছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা :
ইউনিয়ন পরিষদের আধাপাকা সড়কটি আমার গ্রামের মধ্য দিয়ে খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কে ও শৈলকুপা উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই আধাপাকা সড়কেই গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুতে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।
আরও দেখুন : প্রবন্ধ রচনা : আমাদের দেশ / বাংলাদেশ
হাটবাজার ও দোকানপাট :
আমার গ্রামে একটি ছোটোখাটো বাজার আছে। সেখানে হাট সপ্তাহে দু বার বসে। মাছ, দুধ, তরকারিসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রায় সব জিনিসপত্র এখানে পাওয়া যায়। হাটের দিনে বহুদূর থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা আসে। বাজারে বিশজন স্থায়ী দোকানদার আছে। তাদের দোকান ভোর থেকে অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। মোটের ওপর গ্রামের লোকেরা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাববোধ করে না।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য :
সৌন্দর্যের দিক দিয়ে আমাদের গ্রামটা যেন প্রকৃতির লীলা নিকেতন। ষড়ঋতুর আবর্তে গ্রামখানি বিচিত্র রূপ ধারণ করে। মনে হয় যেন প্রকৃতির আপন খেয়ালে এ গ্রামটি সাজানো। মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাবৈচিত্র্যে ভরপুর আমাদের গ্রামখানি। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকে দেখা যায় আম, জাম, কাঁঠাল, বেল, কুল, পেয়ারা এবং আরও নানারকমের গাছ। মাঠভরা ধান ও অন্যান্য শস্যখেতের ওপর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায় তখন খুবই সুন্দর দেখায়।
উপসংহার :
এমন একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করে আমি ধন্য। তাই যেকোনো মূল্যে গ্রামের ঐতিহ্য বজায় রাখব, উন্নয়নে তৎপর হব এবং সকল কুপ্রভাব থেকে গ্রামটি মুক্ত রাখব।