نَذْر তথা মানত ফিকহশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানত করার বিধান শরীয়ত স্বীকৃত। বিভিন্ন কারণে এ মানত করা হয়। যেমন ভয়ভীতি দূর হওয়া, উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়া, জটিল সমস্যার সমাধান, অভাব বা সংকট থেকে মুক্তি ইত্যাদি কারণে মানত বা কোনো নির্দিষ্ট কাজ করার প্রতিজ্ঞা করা হয়।
মানত অর্থ কি ?
আভিধানিক অর্থ : মানতের আরবি শব্দ نَذْر; শব্দটি বাবে ضَـرَبَ ও نَصَـرَ-এর মাসদার। অথবা نَذْر শব্দটি اِسْمٌ; এটি একবচন, বহুবচনে نُذُوْر; এর আভিধানিক অর্থ—
- اَلْـحَـلْـفُ তথা শপথ করা।
- اَلْوَعْدُ তথা প্রতিজ্ঞা করা।
- ভয়ভীতি দূরা করা।
- উৎসর্গ করা।
- মানত করা।
- নিবেদন করা ইত্যাদি।
মানত কাকে বলে ?
১. সাইয়েদ মুফতি আমীমুল ইহসান (র) বলেন— আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রকাশের লক্ষ্যে মুবাহ তথা ওয়াজিব নয় এমন কোনো বৈধ কাজকে নিজের ওপর ওয়াজিব করে নেয়া। তবে শর্ত হলো এ কাজ যেন কোনো ওয়াজিব ইবাদত জাতীয় হয়।
৪. কোনো কোনো আলেমের মতে, ওয়াজিব নয় এমন কোনো কাজকে কোনো কিছু উৎসর্গ করার মাধ্যমে নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয়াকে মানত বলে।
মানতের হুকুম :
১. نَذْر তথা মানত একটি শরীয়তসম্মত বিধান। মানত হালাল কাজ বা বস্তুতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। যদি কেউ হালাল কাজ বা বস্তুতে মানত করে এবং তার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়, তবে সে মানত আদায় করা ওয়াজিব।
২. অসুস্থ হওয়ার ফলে যদি মানত পূরণ করতে অক্ষম হয় এবং ওয়ারিশগণকে সে মানত পূরণ করার অসিয়ত করে যায়, তবে বিধান অনুযায়ী ওয়ারিশগণের ওপর সে অসিয়ত পূর্ণ করা ওয়াজিব।
৩. মানত যদি শরীয়তসম্মত না হয়, তবে তা পূরণ করা ওয়াজিব নয়।
৪. মানতের কাফফারার অর্থ খাদ্য ও অন্যান্য বস্তু পাওয়ার যোগ্য তারাই, যারা যাকাত ও ওয়াজিব সদকা পাওয়ার যোগ্য।
৫. কোনো পীর, দরবেশ, মাজার, দরগা ইত্যাদির নামে বা উদ্দেশ্যে মানত করা শিরক।
মানতের শর্তাবলি :
نَذْر তথা মানত শুদ্ধ হওয়ার জন্য কিতপয় শর্ত রয়েছে। যেমন—
১. نَاذِر তথা মানতকারী মুমিন হওয়া। সুতরাং অমুসলিমের মানত শুদ্ধ হবে না।
২. যে কাজের মানত করা হয়, তা পুণ্যকর্ম হওয়া। সুতরাং গুনাহ বা অন্যায় কাজের মানত করলে তা শুদ্ধ হবে না।
৩. নির্ধারিত সময়সীমায় বৈধ মানত পূর্ণ করা।
৪. মানত পূরণে অক্ষম হলে কাফফারা আদায় করতে হবে।
৫. মানত একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হতে হবে।
৬. মানতকারীর সাধ্যের আওতায় মানত হতে হবে।
মানত শরীয়তসম্মত কিনা :
نَذْر তথা মানত করার বিধান শরীয়তসম্মত। বিভিন্ন কারণে এ মানত করা হয়। উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়া, ভয়ভীতি দূর হওয়া, জটিল সমস্যার সমাধান, অভাব থেকে মুক্তি ইত্যাদি কারণে মানত করা হয়। যেমন কেউ বলল, আমি পরীক্ষায় পাস করলে আল্লাহর ওয়াস্তে একটি বকরি জবাই করার জন্য মানত করলাম। এটি এমন একটি ইবাদত যা ইসলামের পূর্বেও ছিল।
হযরত মারইয়াম (আ) সম্পর্কে তাঁর মা মানত করেছেন। যেমন আল্লাহর বাণী—
رَبِّ اِنِّيْ نَذَرْتُ لَكَ مَا فِيْ بَطْنِيْ مُحَرَّرًا.
অর্থাৎ, আল্লাহ আমার গর্ভে যা আছে তা আপনার জন্য মুক্ত করে দেয়ার আমি মানত করলাম। (আলে ইমরান : আয়াত- ৩৫)
মানত পূর্ণ করার বিধান :
আল্লাহর নাফরমানির বিষয়ে মানত করা না হলে সকল মানতই পূর্ণ করার নির্দেশ আছে।
দলীল : আল্লাহ তায়ালা বলেন— وَلْيُوْفُوْا نُذُوْرَهُمْ অর্থাৎ, তারা যেন তাদের মানতসমূহ পূর্ণ করে (সূরা হজ্জ : আয়াত- ২৯)। আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে আরও বলেন—
فَلَمَّا وَضَعَتْهَا قَالَتْ رَبِّ اِنِّيْ وَضَعْتُهَا اُنْثٰى وَاللّٰهُ اَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْاُنْثٰى.
অর্থাৎ, অতঃপর যখন সে তাকে প্রসব করল, তখন বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি এক কন্যা সন্তান প্রসব করেছি। সে যা প্রসব করেছে সে সম্পর্কে আল্লাহ ভালো জানেন। আর ছেলে তো কন্যার মতো নয়। হাদীসের বাণী—
مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيْعَ اللّٰهَ فَلْيُطِعْهُ. وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَّعْصِيَ اللّٰهَ فَلَا يَعْصِهِ. (البخاری – المسلم)
অর্থাৎ, যে আল্লাহর আনুগত্যের জন্য মানত করে, সে যেন তা পূর্ণ করে। আর যে আল্লাহর নাফরমানি করার ক্ষেত্রে মানত করে, সে যেন আল্লাহর নাফরমানি করা থেকে বিরত থাকে। (বুখারী ও মুসলিম)
অলীদের কবর ও মাযারের (প্রচলিত) মানতের ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে। শরীয়তসম্মত অভিমত হলো— ঐ সকল মানত দ্বারা যদি মাযারের আশেপাশে বসবাসকারী ফকির মিসকিনদের প্রতি সহায়তার নিয়ত করা হয়, তবে সে মানতে কোনো ক্ষতি নেই।
আর ঐ অলীর খাদেম নিজে ফকির না হলে এবং তার পরিবার অসহায় না থাকলে তার পক্ষে কোনোভাবেই উক্ত মানত গ্রহণ করা, ভক্ষণ করা কিংবা তাতে হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়। তবে যদি খাদেম দরিদ্র হয় কিংবা তার পরিবার দরিদ্র হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা বৈধ। যেমন—
قَدْ رُوِيَ أَنَّ امْرَأَةً أَتَتِ النَّبِيَّ (صَ) فَقَالَتْ اِنِّيْ نَذَرْتُ أَنْ أَذْبَحَ بِمَكَانِ كَذَا وَكَذَا مَكَانٌ كَانَ يُذْبَحُ فِيْهِ فِيْ أَهْلِ الْجَاهِلِيَّةِ. قَالَ لِصَنَمٍ قَالَتْ لَا. قَالَ لَا أَوْفِيْ بِنَذْرِكَ.
অর্থাৎ, এক মহিলা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স)! আমি মানত করেছি অমুক জায়গায় (একটি পশু) জবাই করার। ঐ স্থান যেখানে জাহেলী যুগের লোক জবাই করত। তখন নবী করীম (স) আবার জিজ্ঞেস করলেন, কোনো দেবতার জন্য? মহিলা বললেন, না। নবী করীম (স) বললেন, কোনো মূর্তির জন্য? মহিলা বললেন, না। তখন নবী করীম (স) আদেশ দিলেন, তোমার মানত পূরণ কর। (আবু দাউদ)সুতরাং এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, মানত পূর্ণ করা আবশ্যক।