মিরাজ(مِعْرَاج) মহানবী (স)-এর জীবনে সংঘটিত অন্যতম প্রধান মুজিযা। যা স্বপ্নযোগে নয়; বরং জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে সংঘটিত হয়েছে। নিম্মে প্রশ্নালোকে এতদসংশ্লিষ্ট আলোচনা পেশ করা হলো।
মিরাজ অর্থ কি ?
আভিধানিক অর্থ : مِعْرَاج শব্দটি عُرُوْج মাসদার থেকে গৃহীত। এর আভিধানিক অর্থ— উর্ধগমন, উপরে ওঠা ইত্যাদি। এটি اِسْمُ اَله -এর وَاحِد كُبْرٰى-এর সীগাহ। সুতরাং এর অর্থ দু’ধরনের হবে। যথা—১. উর্ধগমনের একটি বড় যন্ত্র, ২. উর্ধগমনের সিঁড়ি বা যানবাহন।
মিরাজ কাকে বলে ?
১. ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়—
অর্থাৎ, মিরাজ হলো মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর সান্নিধ্যে রাসূল (স)-এর উর্ধাকাশ ভ্রমণ।
২. মুফতি আমীমুল ইহসান (র) বলেন—
اَلْمِعْرَاجُ صُعُوْدُهُ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْهُ اِلَى السَّمَاءِ وَكَانَ فِي الْيَقَظَةِ.
আরো পড়ুন : রাসূল সাঃ এর উপর দরূদ পাঠের ফযিলত ও দরূদ পাঠ না করার পরিণাম
মহানবী (স)-এর মিরাজ সংঘটনের সময়কাল :
মিরাজ সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞগণ বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যেমন—
১. আল্লামা তাবারী (র) বলেন, যে বছর নবী করীম (স)-কে নবুয়ত দান করা হয়, সে বছরই মিরাজ সংঘটিত হয়।
২. নবুয়ত লাভের পাঁচ বছর পর মিরাজ সংঘটিত হয়েছে। ইমাম নবুবী ও কুরতুবী (র) এ মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
৩. নবুয়তের দশম বছরে ২৭ রজব সংঘটিত হয়েছে। আল্লামা মনসুরপুরী (র) এ অভিমতটি গ্রহণ করেছেন।
৪. হিজরেতর ১৬ মাস পূর্বে, নবুয়তের দ্বাদশ বছর রমযান মাসে মিরাজ অনুষ্ঠিত হয়।
৫. হিজরেতর এক বছর দু’মাস পূর্বে মহররম মাসে মিরাজ সংঘটিত হয়েছে।
৬. কারো মতে, রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছে।
এভাবে ২০টিরও অধিক মত রয়েছে। নির্দিষ্ট একটি মতকে প্রাধান্য দেয়ার মতো কোনো একটি দলীল পাওয়া যায় না। তবে অধিকাংশ আলেম দশম বছর ২৮ রজব বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
মিরাজ এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা :
মিরাজ সংঘটিত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় পরিলক্ষিত হয়। যেমন—
ক. পবিত্র কুরআনের আলোকে : ১. মহান আল্লাহ তাঁর রাসুলের অলৌকিক নিদর্শন সম্পর্কে সূরা বনি ইসরাঈলে বলেন—
سُبْحَانَ الَّذِيْ أَسْرٰى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ اِلَى الْمَسْجِدِ الْاَقْصَا الَّذِيْ بٰرَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ اٰيٰتِنَا اِنَّهُ هُوَ السَّمِيْعُ الْبَصِيْرُ.
অর্থাৎ, পবিত্র ও মহিমাময় সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা তথা বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত। যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নির্দশন দেখানোর জন্য। আর নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
আরো পড়ুন : মানত কাকে বলে ? এর অর্থ, শর্তাবলী, হুকুম ও বিধান
২. অন্যত্র তিনি বলেছেন—
اَفَتُمَارُوْنَهُ عَلٰى مَا يَرٰى. وَلَقَدْ رَاٰهُ نَزْلَةً اُخْرٰى. عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهٰى. عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوٰى. اِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشٰى. مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغٰى. لَقَدْ رَاٰى مِنْ اٰيٰتِ رَبِّهِ الْكُبْرٰى.
অর্থাৎ, তিনি (মুহাম্মদ স.) যা দেখেছেন, তোমরা কি সে বিষয়ে তাঁর সাথে বিতর্ক করবে? নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে (হযরত জিবরাঈল আ.-কে) আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার নিকট অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার তা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম ও লক্ষ্যচ্যুত হয়নি। তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলি দেখেছিলেন।
খ. হাদীসের আলোকে : মিরাজের ঘটনা বুখারী ও মুসলিমসহ বিভিন্ন গ্রন্থে সহীহ সনদে বিশজনের অধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। সংক্ষেপে রাসূলুল্লাহ (স)-এর اِسْرَاء তথা মিরাজ সংঘটিত হওয়া সংক্রান্ত কতিপয় ঘটনা নিম্নরূপ—
১. রাসূল (স) মক্কার মসজিদে হারাম থেকে বোরাকযোগে বায়তুল মুকাদ্দাস পৌছেন। এখানে নবী রাসূলগণের সাথে সালাত আদায় করেন।
২. বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-এর সহযোগিতায় বায়তুল মামুরে পৌছেন। এখানে নবী রাসূলগণের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং সাত আসমান অতিক্রম করেন।
৩. সেখান থেকে তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌছেন। এখানে তিনি আল্লাহর মহানিদর্শনসমূহ পর্যবেক্ষণপূর্বক জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় মহান আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করতঃ মহান আল্লাহর নিকট নামাযসহ অনেক উপহার লাভ করেন।