মুশতারাক (مُشْتَرَكٌ) ও মুআওয়াল(مُؤَوَّلٌ) উসূলশাস্ত্রের বহুল আলোচিত দুটি পরিভাষা। আরবি ভাষায় এমন কিছু শব্দ রয়েছে যেগুলো একাধিক অর্থ প্রকাশ করে যা مُشْتَرَكٌ নামে পরিচিত। আবার কখনো একাধিক অর্থের মাঝে মাত্র একটি অর্থের জন্য শব্দটি নির্দিষ্ট হয়ে থাকে যা مُؤَوَّلٌ নামে পরিচিত। নিচে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হলো।
মুশতারাক (مُشْتَرَكٌ)অর্থ কি ও কাকে বলে?
আভিধানিক অর্থ: مُشْتَرَكٌ শব্দটি বাবে اِفْتِعَالٌ থেকে إِسْمُ مَفْعُوْلٌ-এর সীগাহ। اِشْتِرَاكٌ মাসদার থেকে নির্গত। এর অর্থ হচ্ছে—
১. اَلْاِخْتِلَاطُ তথা মিশ্রিত হওয়া।
২. اَلْاِلْتِبَاسُ তথা একাধিক বস্তুর সমন্বয় ঘটা।
৩. اَلْاِجْتِمَاعُ তথা সম্মিলিত হওয়া।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ১. উসূলুশ শাশি গ্রন্থকার বলেন—
الْمُشْتَرَكُ مَا وُضِعَ لِمَعْنَيَيْنِ مُخْتَلِفَيْنِ أَوْ لِمَعَانٍ مُخْتَلِفَةِ الْحَقَائِقِ
অর্থাৎ, مُشْتَرَكٌ এমন একটি শব্দ যাকে পরস্পর বিরোধী দুটি অর্থের জন্য অথবা বিভিন্ন হাকিকতবিশিষ্ট একাধিক অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে।
২. الْمَنَارُ গ্রন্থকার বলেন— মুশতারাক এমন শব্দকে বলা হয়, যা বিভিন্ন সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত কতিপয় এককে বদল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।
৩. কতিপয় উসূলশাস্ত্রবিদ বলেন—
الْمُشْتَرَكُ هُوَ لَفْظٌ وُضِعَ لِمَعْنَيَيْنِ أَوْ أَكْثَرَ
অর্থাৎ, মুশতারাক এমন শব্দকে বলা হয়, যাকে দুই বা ততোধিক অর্থের জন্য গঠন করা হয়েছে।
উদাহরণ: ১. মহান আল্লাহর বাণী— يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوْءٍ-এর মধ্যে قُرُوْءٌ শব্দটি حَيْضٌ এবং طُهْرٌ উভয় অর্থের মধ্যে মুশতারাক। ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে, قُرُوْءٌ শব্দের অর্থ حَيْضٌ আর ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে قُرُوْءٌ শব্দের অর্থ طُهْرٌ।
২. عَيْنٌ শব্দটি ‘ঝরনা’ ও ‘চোখ’ এ দুটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়। তাই এটা মুশতারাক।
আরও জানুন : যিহার (ظِهَارٌ) অর্থ, সংজ্ঞা, কাফফারা ও হুকুম দলিল সহ
মুশতারাক এর হুকুম :
১. مُشْتَرَكٌ-এর হুকুম বর্ণনা করতে গিয়ে “الْمَنَارُ” গ্রন্থে বলা হয়েছে— চিন্তাভাবনা করার শর্তে تَوَقُّفٌ বা নীরবতা অবলম্বন করা। যাতে তার বিভিন্ন অর্থ হতে একটিকে আমল করার জন্য প্রাধান্য দেয়া হয়।
২. উসূলুশ শাশি গ্রন্থকার বলেন— একাধিক অর্থের মধ্য থেকে যখন একটি অর্থ নির্ধারিত হয়ে যায়, তখন অন্যান্য অর্থের সম্ভাবনা বিদূরিত হয়।
৩. এর দ্বারা عِلْمٌ قَطْعِيٌّ তথা অকাট্য জ্ঞান অর্জিত হয়।
৪. আল্লামা হোসামী (র.) বলেন, চিন্তাভাবনা করার শর্তে تَوَقُّفٌ তথা স্থগিত থাকবে।
মুআওয়াল(مُؤَوَّلٌ)অর্থ কি ও কাকে বলে ?
আভিধানিক অর্থ: مُؤَوَّلٌ শব্দটি بَابُ تَفْعِيْلٌ থেকে إِسْمُ مَفْعُوْلٌ-এর সীগাহ। اَلتَّأْوِيْلُ মাসদার থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো—
১. الْمُفَسَّرُ তথা ব্যাখ্যাকৃত।
২. الْمُعَبَّرُ তথা বিশ্লেষিত।
৩. الْمُنْصَرِفُ তথা রূপান্তরিত।
৪. الرُّؤْيَا الْمُعَبَّرَةُ তথা ব্যাখ্যাকৃত স্বপ্ন।
৫. الْعَاقِبَةُ الْحَسَنَةُ তথা ভব পরিণাম।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ১. উসূলুশ শাশি গ্রন্থকার বলেন— যখন কোনো মুশতারাক শব্দের দ্বারা প্রবল ধারণার ভিত্তিতে কোনো একটি অর্থ নেয়া হয় তখন مُؤَوَّلٌ হয়ে যায়।
২. الْمَنَارُ গ্রন্থকার বলেন—প্রবল ধারণার ভিত্তিতে মুশতারাকের একাধিক অর্থ হতে যখন কোনো একটি অর্থকে প্রাধান্য দেয়া হয় তখন তাকে مُؤَوَّلٌ বলে।
উদাহরণ: আল্লাহ তায়ালার বাণী— حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ আয়াতে نِكَاحٌ শব্দটি عَقْدٌ ও وَطَاٌ উভয় অর্থের মধ্যে থাকে; কিন্তু প্রবল ধারণার ভিত্তিতে وَطَاٌ অর্থ নেয়া হয়েছে। সুতরাং نِكَاحٌ শব্দকে مُؤَوَّلٌ بِالْوَطَاٌ করা হয়েছে।
আরও জানুন : হাকিকত ও মাজাজ কাকে বলে?অর্থ,প্রকারভেদ,হুকুম ও উদাহরণ
مُؤَوَّلٌ-এর হুকুম
১. مُؤَوَّلٌ-এর হুকুম সম্পর্কে الْمَنَارُ গ্রন্থে বলা হয়েছে—
অর্থাৎ, ত্রুটি বিচ্যুতির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এর ওপর আমল করা ওয়াজিব।
২. উসূলুশ শাশি গ্রন্থকার বলেন— إِنَّهُ يَجِبُ الْعَمَلُ بِهِ يَقِيْنًا অর্থাৎ, দৃঢ়তার সাথে এর ওপর আমল করা ওয়াজিব।
৩. কেউ বলেন, এর অস্বীকারকারীকে কাফের বলা যাবে না।
مُشْتَرَكٌ ও مُؤَوَّلٌ উভয়ের মধ্যে পার্থক্য :
১. مُشْتَرَكٌ-এর ক্ষেত্রে تَوَقُّفٌ তথা নীরবতা অবলম্বন করতে হবে। এটা আমলকে ওয়াজিব করে না। আর مُؤَوَّلٌ আমলকে ওয়াজিব করে, যদিও তাতে অন্য অর্থের সম্ভাবনা থাকে।
২. مُشْتَرَكٌ-এর ক্ষেত্রে একটি অর্থকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য চিন্তা গবেষণা করতে হবে। আর مُؤَوَّلٌ ঐ উচ্চ চিন্তা গবেষণারই ফলস্বরূপ।
৩. مُشْتَرَكٌ কোনো ব্যাপারে দলীল হতে পারে না। পক্ষান্তরে مُؤَوَّلٌ দলীল হতে পারে, যদিও তা দলীল হিসেবে ظَنِّيٌّ তথা সন্দেহসূচক।