ইসলামি শরিয়তে মূলনীতি চতুষ্টয়ের মধ্যে قِيَاسٌ-এর স্থান অন্যতম, যা কুরআন ও হাদিসেরই আলোকে প্রবর্তিত। উক্ত قِيَاسٌ প্রধানত দুপ্রকার। যথা— ১. اَلْقِيَاسُ الْجَلِيُّ ও ২. اَلْقِيَاسُ الْخَفِيُّ; প্রয়োজনবোধে কোনো প্রকাশ্য কেয়াস পরিত্যাগ করে অপ্রকাশ্য কেয়াস— ইসতিহসান(اِسْتِحْسَانٌ )এর ওপর আমল করতে হয়। তাই ইসতিহসান সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা একান্ত প্রয়োজন।
ইসতিহসান অর্থ কি ও কাকে বলে ?
আভিধানিক অর্থ : اِسْتِحْسَانٌ শব্দটি বাবে اِسْتِفْعَالٌ-এর মাসদার। حَسُنَ মাদ্দাহ থেকে নিষ্পন্ন। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে—
১. تَحَسَّنَ الشَّيْءَ তথা সুন্দর মনে করা।
২. حُسْبَانُ الْخَيْرِ তথা উত্তম মনে করা।
৩. اَلْمُعَامَلَةُ الْحَسَنَةُ তথা সদ্যবহার করা।
৪. طَلَبُ الْخَيْرِ তথা কল্যাণ কামনা করা।
৫. اَلْأَعْمَالُ الْخَيْرِيَّةُ তথা কল্যাণকর কাজ।
৬. الِاخْتِيَارُ তথা পছন্দ করা ইত্যাদি।
পারিভাষিক সংজ্ঞা : ১. ইমাম আযম আবু হানিফা (র.) বলেন—
هُوَ الْعُدُوْلُ مِنْ مُوْجِبِ قِيَاسٍ إِلَى أَقْوَى مِنْهُ
অর্থাৎ, কোনো কেয়াসের চাহিদা হতে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী কেয়াসের প্রতি প্রত্যাবর্তন করাকে ইসতিহসান বলে।
২. নুরুল আনওয়ার গ্রন্থপ্রণেতা আল্লামা মোল্লাজিওয়ান (র.)-এর মতে—
هُوَ الدَّلِيْلُ الَّذِيْ يُعَارِضُ الْقِيَاسَ الْجَلِيَّ
অর্থাৎ, যে দলিল বাহ্যত قِيَاسٌ جَلِيٌّ-এর বিপরীত, তাকে اِسْتِحْسَانٌ বলে।
৩. ইমাম বাযদাবি (র) বলেন—
الِاسْتِحْسَانُ هُوَ الْقِيَاسُ الَّذِي قَوِيَ أَثَرُهُ وَإِنْ كَانَ خَفِيًا
অর্থাৎ, ইসতিহসান ঐ কেয়াসকে বলে, যে কেয়াসের তাৎপর্য বেশি শক্তিশালী, যদিও সূক্ষ্ম হোক না কেন।
সম্পর্কিত পোস্ট : ইজতিহাদ(اِجْتِهَادٌ) কাকে বলে? এর অর্থ, শর্ত ও হুকুম
ইসতিহসান এর উদাহরণ:
ক্রেতার হস্তগত হওয়ার পূর্বে مَبِيعٌ-এর মূল্যের ব্যাপারে ক্রেতা-বিক্রেতার মতানৈক্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিক্রেতা বস্তুটির মূল্য বলেছে দুইশত টাকা, আর ক্রেতা বলেছে একশত টাকা। এমতাবস্থায় قِيَاسٌ جَلِيٌّ দাবি করেছে, এক্ষেত্রে বিক্রেতার শপথ করতে হবে না। কেননা, সে অতিরিক্ত মূল্যের দাবিদার, আর ক্রেতা তা অস্বীকার করেছে।
যেমন হাদিসে এসেছে— اَلْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِيْنُ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ। কিন্তু এখানে قِيَاسٌ خَفِيٌّ হিসেবে ইসতিহসান হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই مُدَّعِيٌّ আবার مُنْكِرٌ-ও বটে। তাই উভয়কে শপথ করতে হবে। উভয়ের শপথের পর বিচারক উক্ত বেচা-কেনা ভেঙ্গে দেবেন।
ইসতিহসান এর প্রকারভেদ :
উসূলশাস্ত্রবিদগণ ইসতিহসানকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা—
১. اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْآثَارِ তথা হাদিসের ভিত্তিতে ইসতিহসান।
২. اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْإِجْمَاعِ তথা ইজমার ভিত্তিতে ইসতিহসান।
৩. اَلِاسْتِحْسَانُ بِالضَّرُوْرَةِ তথা প্রয়োজনের ভিত্তিতে ইসতিহসান।
৪. اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْقِيَاسِ الْخَفِيِّ তথা কিয়াসে খফির ভিত্তিতে ইসতিহসান।
সম্পর্কিত পোস্ট : ইজমা (إِجْمَاعٌ )কাকে বলে? অর্থ, শর্ত, রুকন ও হুকুম
উল্লিখিত চার প্রকার ইসতিহসান এর বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো—
১. اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْآثَارِ হাদিসের ভিত্তিতে ইসতিহসান : হাদিস দ্বারা বাহ্যিক কেয়াস পরিত্যাগ করে নস অনুপাতে আমল করাকে اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْآثَارِ বলে।
উদাহরণ : اَلِاسْتِحْسَانُ-এর উদাহরণ হচ্ছে— بَيْعٌ سَلَمٌ; আর بَيْعٌ سَلَمٌ বলা হয় এমন ক্রয়-বিক্রয়কে, যাতে মূল্য নগদ আদায় করা হয়, কিন্তু বিক্রয় পণ্য বকেয়া থাকে। مَبِيْعٌ অজ্ঞাত থাকে। এরূপ ক্রয় বিক্রয় কিয়াসে জলি এর অনুকূলে জায়েজ নয়। কারণ, এতে বিক্রয় পণ্যটি অজ্ঞাত থাকে। কিন্তু হাদিসে প্রকাশ্য ইরশাদ হয়েছে বিধায় আমরা এটাকে জায়েয বলে থাকি। যেমন রাসূল (স.) বলেছেন—
مَنْ أَسْلَمَ مِنْكُمْ فَلْيُسْلِمْ فِيْ كَيْلٍ مَعْلُوْمٍ وَوَزْنٍ مَعْلُوْمٍ إِلَى أَجَلٍ مَعْلُوْمٍ
কাজেই قِيَاسٌ جَلِيٌّ এরূপ ক্রয়-বিক্রয়কে নাজায়েয বললেও আমরা এ হাদিসটি দ্বারা بَيْعٌ سَلَمٌ-কে বৈধ বলে থাকি।
২. اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْإِجْمَاعِ ইজমার ভিত্তিতে ইসতিহসান: ইজমায়ে উম্মতের মাধ্যমে বাহ্যিক কেয়াস পরিত্যাগ করাকে اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْإِجْمَاعِ বলে।
উদাহরণ : اِسْتِصْنَاعٌ তথা ক্রয়-বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে কাউকে কোনো জিনিস তৈরি করার আদেশ দেয়া। যেমন— কোনো ব্যক্তি জুতো তৈরির আদেশ দিল এবং তার নমুনা ও মাপ জানিয়ে দিল, কিন্তু মূল্য সময়সীমা নির্দিষ্ট করে নি। এক্ষেত্রে কেয়াস চাইছে, এরূপ ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে না। যেহেতু এটা একটি مَعْدُوْمٌ مَجْهُوْلٌ বিষয়ের ক্রয়-বিক্রয়। কিন্তু আমরা এ কেয়াসকে বর্জন করেছি এবং ইজমার মাধ্যমে ইসতিহসান হিসেবে এটাকে জায়েযরূপে গ্রহণ করেছি। কারণ এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
সম্পর্কিত পোস্ট : কিয়াস(قِيَاس) সংজ্ঞা, অর্থ, শর্ত, রুকন, হুকুম ও দলিল
৩. اَلِاسْتِحْسَانُ بِالضَّرُوْرَةِ প্রয়োজনের ভিত্তিতে ইসতিহসান: বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে قِيَاسٌ جَلِيٌّ-এর বিপরীত আমল করাকে اَلِاسْتِحْسَانُ بِالضَّرُوْرَةِ বলে।
উদাহরণ : تَطْهِيْرُ الْآوَانِيْ তথা অপবিত্র পাত্রসমূহ পবিত্র হওয়া। যেমন বাসন-কোসন, থালা-বাটি, কূপনলকূপ ইত্যাদি জিনিসপত্র পাতনসহ কঠিন হওয়ার কারণে কাপড়ের মতো নিংড়ানো যায় না। তাই এসব পাত্র পবিত্র না হওয়ার কেয়াসের দাবি। কিন্তু اِسْتِحْسَانٌ স্বরূপ আমরা এগুলোকে পবিত্র বলে থাকি। কারণ, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে সেসবের ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়ে। তা ছাড়া এগুলো নাপাক বলে ফেলে রাখলে পাতের সংকট দেখা দিতে পারে।
৪. اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْقِيَاسِ الْخَفِيِّ কেয়াসে খফির ভিত্তিতে ইসতিহসান : কেয়াসে খফির মাধ্যমে কেয়াসে জলিকে পরিত্যাগ করাই হলো اَلِاسْتِحْسَانُ بِالْقِيَاسِ الْخَفِيِّ।
উদাহরণ : قِيَاسٌ خَفِيٌّ-এর দাহিদা হলো হিংস্র পাখির উচ্ছিষ্ট পবিত্র হওয়া। এক্ষেত্রে قِيَاسٌ جَلِيٌّ-এর দাহিদা হলো এদের উচ্ছিষ্ট অপবিত্র হওয়া। কারণ, এদের سِبَاعُ الْبَهَائِمِ-এর ন্যায় গোশত ভক্ষণ হারাম। আর উচ্ছিষ্ট গোশত থেকে উৎপন্ন হয়। লালা, আর উচ্ছিষ্ট লালামিশ্রিত। অতএব বাঘ, সিংহ প্রভৃতি হিংস্র প্রাণীর উচ্ছিষ্টের মতো হিংস্র পাখির উচ্ছিষ্টও নাপাক।
কিন্তু قِيَاسٌ خَفِيٌّ হিসেবে একটি ইসতিহসান আছে। পাখিরা ঠোঁট দিয়ে আহার করে। আর ঠোঁট হাড় দিয়ে তৈরি এবং জীবিত বা মৃত সকল প্রাণীর হাড়ই পবিত্র। অতএব পবিত্র জিনিস পবিত্র বস্তুতে পড়লে নাপাক হওয়ার তো কোনো কারণই থাকে না। অবশ্য উক্ত পাখির ঠোঁটে নাপাক লেগে থাকলে তার উচ্ছিষ্ট নাপাক হবে এ ক্ষেত্রে তা ভিন্ন কথা।