ইজতিহাদের দরজা বর্তমানে খোলা না বন্ধ, অর্থাৎ বর্তমানে ইজতেহাদ করা যাবে কি-না, এ প্রসঙ্গে দুটি অভিমত পরিলক্ষিত হয়। যথা—
১. জুমহুরের অভিমত : অধিকাংশ আলেমের মতে, ইজতিহাদের দ্বার বর্তমানে বন্ধ নয়; বরং উন্মুক্ত এবং এটা কেয়ামত পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে।
দলিল : ইজতিহাদের দরজা যে বর্তমানেও খোলা রয়েছে, এ ব্যাপারে কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কেয়াস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপনা করা হলো।
ক. কুরআন : اِجْتِهَادٌ-এর অর্থ হচ্ছে التَّفَكُّرُ فِي الْأَمْرِ অর্থাৎ, কোনো বিষয়ে চিন্তাগবেষণা করা। আর আল্লাহ তায়ালা চিন্তাগবেষণা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং নির্দেশও দিয়েছেন। যেমন কুরআনে এসেছে—
١. فَاعْتَبِرُوْا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
٢. فَاعْتَبِرُوْا يَا أُولِي الْأَلْبَابِ
٣. وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوْا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
খ. হাদিস : মাশহুর হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত হয়, ইজতেহাদের দ্বার উন্মুক্ত; বরং দীনের স্বার্থে তা প্রশংসিতও বটে। যেমন মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.)-কে বিচারক হিসেবে ইয়েমেনে প্রেরণের প্রাক্কালে রাসূল (স.) তাঁকে বলেছিলেন—
بِمَا تَقْضِي يَا مُعَاذُ؟ فَقَالَ: بِكِتَابِ اللَّهِ. قَالَ: فَإِنْ لَمْ تَجِدْ؟ قَالَ: فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ. قَالَ: فَإِنْ لَمْ تَجِدْ؟ قَالَ: أَجْتَهِدُ بِرَأْيِي. فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَفَّقَ رَسُولَ رَسُولِهِ بِمَا يَرْضَى بِهِ رَسُولُهُ.
হাদিসে উল্লিখিত মুয়ায (রা.)-এর بِرَأْيِيْ أَجْتَهِدُ বক্তব্যটি শুনে রাসূল (স.) আল্লাহর প্রশংসা করেছেন।
সম্পর্কিত পোস্ট : ইজতিহাদ(اِجْتِهَادٌ) কাকে বলে? এর অর্থ, শর্ত ও হুকুম
গ. ইজমা : সাহাবিদের ইজমা দ্বারাও ইজতেহাদের দ্বার চির উন্মুক্ত হওয়া প্রমাণিত হয়। যেমন مُفَوَضَةٌ নারীর মহর সম্পর্কে ইবনে মাসউদ (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন—
أَجْتَهِدُ فِيْهَا بِرَأْيِيْ وَإِنْ أَصَبْتُ فَمِنَ اللهِ وَإِنْ أَخْطَأْتُ فَمِنِّيْ وَمِنَ الشَّيْطَانِ أَرَى لَهَا مَهْرَ مِثْلِ نِسَائِهَا لَا وَكْسَ وَلَا شَطَطَ
তিনি এ রায় সাহাবিদের এক বিশাল সমাবেশে ঘোষণা করেছিলেন, অথচ কেউ তাঁর কথার প্রতিবাদ করেন নি।
ঘ. স্বাভাবিক জ্ঞান দ্বারাও বোঝা যায়, ইজতেহাদের দ্বার চির উন্মুক্ত। কারণ, দিন দিন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত তা হতে থাকবে। তাই এসব সমস্যার সমাধানে ইজতেহাদের অবশ্যই প্রয়োজন। সুতরাং যাদের মাঝে ইজতেহাদের শর্তাবলি পাওয়া যাবে, তাদের জন্য ইজতেহাদের দ্বার খোলা থাকবে, এটাই সর্বজনস্বীকৃত কথা। তাই বিংশ শতাব্দীর ক্রান্তিলগ্নেও বিভিন্ন মনীষী ইজতেহাদ করে দীনের অনেক খেদমত করেছেন। যেমন— মাওলানা আশরাফ আলি থানবি (র.), মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (র.), তানতাবি মুফতি মুহাম্মদ শফি (র.), মুফতি তকি ওসমানি, শায়খ সালেহ উসায়মেন প্রমুখ।
২. কেউ বলেছেন, ইজতেহাদের দ্বার উন্মুক্ত নয়; বরং এটা চিরবদ্ধ। কেননা, পূর্ববর্তী আলেমগণ দীনের প্রায় সব ব্যাপারে তাদের অভিমত পেশ করে গেছেন। এখন নতুন কোনো মতামত দিলে ফেতনার আশঙ্কা দেখা দেবে। তবে বর্তমানেও যদি এমন সমস্যা দেখা যায়, যা মুজতাহিদ ফিকহগণের যুগে ছিলো না, তাহলে পূর্ববর্তী ইমামগণের মূলনীতি অনুসারে মাসয়ালার সমাধান করা হবে।
প্রত্যুত্তর : এটা ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত কথা মাত্র; বরং ইজতেহাদের দরজা কেয়ামত পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে, যাতে করে শরয়ি নির্দেশনা অনুযায়ী মুজতাহিদ স্বীয় গবেষণার মাধ্যমে সব যুগের সব সমস্যার সমাধান নিরূপণ করে দিতে সক্ষম হন।
সম্পর্কিত পোস্ট : সাহাবীদের যুগে ইজতিহাদ করার পদ্ধতি দলিলসহ বিস্তারিত
মুজতাহিদ তার ইজতিহাদে ভুল করলে করণীয়:
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতে, মুজতাহিদ ভুলও করেন, আবার সঠিক মাসয়ালাও উদঘাটন করে থাকেন। মুজতাহিদ যদি প্রথমে অথবা শেষদিকে মাসয়ালা উদঘাটনে ভুল করে থাকেন তবে তার হুকুমের ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতিবিরোধ রয়েছে—
১. ইমাম আবুল মানসুর ও কতিপয় উসূল বিশারদদের মতে—মুজতাহিদ যদি ভুল করে, তাহলে তাকে শুরু ও শেষ উভয় দিকে ভুল করেছে বলে স্বীকার করতে হবে।
২. ওলামায়ে আহনাফের মতে, মুজতাহিদ যদি মাসয়ালা উদ্ভাবন করতে ভুল করেন, তাহলে বুঝতে হবে তিনি প্রথম প্রচেষ্টায় সঠিকই ছিলেন, পরবর্তীতে ভুল করেছেন।
৩. আল্লামা বাযদাভি (র.)-এর মতে—
اَلْمُخْتَارُ عِنْدَنَا أَنَّهُ مُصِيْبٌ فِيْ اِبْتِدَاءِ اجْتِهَادِهِ لَكِنَّهُ مُخْطِئٌ انْتِهَاءً
অর্থাৎ, গ্রহণযোগ্য মত হলো মুজতাহিদ ইজতিহাদের প্রথম দিকে সঠিকপথ থাকেন, কিন্তু শেষের দিকে ক্রটি-বিচ্যুতিকারী হয়ে থাকেন।
৪. আল-মানার গ্রন্থপ্রণেতা বলেন, বিশুদ্ধ অভিমত হলো, মুজতাহিদ ভুল করলে শেষ অবস্থায় ভুল করেছেন বলতে হবে। প্রথম অবস্থায় তাকে হকের ওপর ছিল বলে মনে করতে হবে। কেননা, তিনি ভূমিকা সাজাতে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন, এতে তিনি তাঁর চেষ্টায় কোনো ক্রটি করেননি। অতঃপর শেষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত দিতে তিনি ভুল করেছেন।
কেননা, সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া না হওয়া তার আয়ত্তের বাইরে। আল্লাহ তা’আলা যাকে ইচ্ছে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত করেন। সুতরাং তাকে যে গবেষণা করতে বলা হয়েছে তিনি তা করেছেন, এজন্য তাঁকে পুরস্কৃত করা হবে—
لِأَنَّ الْمُخْطِئَ لَهُ أَجْرٌ وَالْمُصِيْبَ لَهُ أَجْرَانِ
অর্থাৎ, ভুল সিদ্ধান্তকারীকে (তার গবেষণার জন্য) একটি প্রতিদান দেয়া হবে। আর সঠিক সিদ্ধান্তকারীকে তাঁর গবেষণা ও সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য দুটি প্রতিদান প্রদান করা হবে।