তাওহীদ কাকে বলে? তাওহীদের অর্থ, মূলনীতি ও স্তরসমূহ

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন— إِنَّمَا إِلَهُكُمْ وَاحِدٌ অর্থাৎ, অবশ্যই তোমাদের প্রভু একজন, তাঁর কোনো শরিক নেই। ঈমানের মূল হলো তাওহীদ বা আল্লাহ তায়ালাকে একক বলে স্বীকৃতি প্রদান করা। আল্লাহ তায়ালাকে এক বলে মানার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। যার তাওহিদ ঠিক নেই তার সব কিছুই ধংসযোগ্য।

তাওহীদ অর্থ কি ও কাকে বলে?

আভিধানিক অর্থ: تَوْحِيْدٌ বাবে تَفْعِيْلٌ-এর মাসদার। এক বলে মেনে নেয়া, একত্ববাদে বিশ্বাস করা। যার অর্থ এক হওয়া, একক হওয়া বা অতুলনীয় হওয়া তাওহিদ অর্থ এক করা, এক বানানো, একত্রিত করা, একত্বে ঘোষণা দেয়া বা একত্ববাদে বিশ্বাস করা।

তবে এটি اِسْمُ مَصْدَرٌ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত। اِسْمُ مَصْدَرٌ হিসেবে এর অর্থ হলো একত্ববাদ।

تَوْحِيْدٌ-এর উৎপত্তি অনুসারে তার অর্থকে এভাবেও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে যে, تَوْحِيْدٌ শব্দটি أَحَدٌ বা وَاحِدٌ থেকে এলে ‘এক’ বুঝায় আর وَحْدٌ থেকে এলে এক বলে মেনে নেয়া বুঝায়। তবে এ দু’উৎসমূলের সম্মিলিত চাহিদাই হলো تَوْحِيْدٌ তথা একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করা।

সম্পর্কিত পোস্ট : তাওহীদের পরিচয়, গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা

পারিভাষিক সংজ্ঞা: ১. আকাইদ শাস্ত্রের পরিভাষায়—

التَّوْحِيْدُ هُوَ الْإِيْمَانُ بِاللهِ تَعَالَى وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ

অর্থাৎ, এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা যার কোনো অংশীদার নেই।

২. مُعْجَمُ لُغَةِ الْفُقَهَاءِ-এর গ্রন্থকার বলেন—

الْإِقْرَارُ بِوَحْدَانِيَّةِ اللهِ تَعَالَى فِيْ ذَاتِهِ وَصِفَاتِهِ وَأَفْعَالِهِ

অর্থাৎ, সত্তাগত, গুণগত ও কাজকর্মে আল্লাহর একত্বাদের স্বীকৃতি প্রদানকে তাওহিদ বলা হয়।

৬. মুফতি আমিমুল ইহসান (র.) বলেন, আহলুল আলিমদের মতে—

تَجْرِيْدُ الذَّاتِ الْإِلَهِيَّةِ عَنْ كُلِّ مَا يَتَصَوَّرُالْأَفْهَامُ وَيَتَخَيَّلُ فِي الْأَوْهَامِ وَالْأَذْهَانِ

অর্থাৎ, আল্লাহর সত্তাকে জ্ঞানের সমস্ত আকৃতি থেকে এবং ধারণাপ্রসূত সব আকৃতি বা প্রতিকৃতি থেকে মুক্ত রাখা।

সম্পর্কিত পোস্ট : তাওহীদ শব্দের অর্থ কি? কাকে বলে। কত প্রকার ও কি কি

তাওহীদের মূলনীতি :

তাওহিদ বা একত্ববাদের মূল হলো, আল্লাহ তায়ালাকে অংশীবাদী থেকে মুক্ত করা এবং একত্ববাদ সাব্যস্ত করা। তিনি এক ও একক; তাঁর কোনো শরিক নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন—

١. وَمَا أُمِرُوْا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا

অর্থাৎ, এক আল্লাহর ইবাদত ছাড়া তাদেরকে অন্য কিছুর হুকুম দেয়া হয়নি।

٢. وَلَا تَدْعُ مَعَ اللهِ إِلَهًا آخَرَ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ

অর্থাৎ, আল্লাহর তায়ালার সাথে অপর কোনো ইলাহকে ডেকো না।

٣. لَوْ كَانَ فِيْهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللهُ لَفَسَدَتَا

অর্থাৎ, আসমান ও জমিনে যদি আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আরো ইলাহ থাকতো, তবে বিশ্বের ব্যবস্থাপনা ওলট-পালট হয়ে যেতো।

٤. قُلْ لَوْ كَانَ مَعَهُ آلِهَةٌ كَمَا يَقُوْلُوْنَ إِذًا لَابْتَغَوْا إِلَى ذِي الْعَرْشِ سَبِيْلًا

অর্থাৎ, বল, আল্লাহর সাথে যদি অন্য ইলাহ হতো, যেমন লোকেরা বলছে, তাহলে তারা আরশ অধিপতির রাজত্ব দখল করার অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করতো।

৫. هَلْ أَرَى إِلَهٌ مَعَ الله অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালার সাথে কি কোনো ইলাহ আছে?

৬. لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ অর্থাৎ, তিন ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।

৭. مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُه অর্থাৎ, তিন ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই।

৮. قُلْ هُوَ اللهُ أَحَد অর্থাৎ, বল তিনি (আল্লাহ তায়ালা) একক।

৯. إِنَّ إِلٰهَكُمْ لَوَاحِدٌ অর্থাৎ, তোমাদের প্রকৃত ইলাহ তথমার একজনই।

১০. وَمَا مِنْ إِلَهٍ إِلَّا اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّار অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত ইলাহ নেই যিনি এক ও একক সর্বজয়ী।

১১. وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ অর্থাৎ, একমাত্র তিনিই (আল্লাহ তায়ালা) সব জিনিসের রব।

তাওহিদের স্তরসমূহ:

তাওহিদের স্তর মোট চারটি। যথা—

১. حَضْرُ وُجُوْبِ الْوُجُوْدِ فِيْهِ تَعَالَى অর্থাৎ, ওয়াজিবুল অজুদ তথা অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্ব আল্লাহ তায়ালার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা। সুতরাং তার অজুদ বা অস্তিত্ব ছাড়া অন্য কোনো ওয়াজিবুল অজুদ নেই।

২. حَصْرُ خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَسَائِرِ الْجَوَاهِرِ فِيْهِ تَعَالَى অর্থাৎ, আরশ, আকাশ, জমিন এবং সমস্ত জওহার সৃষ্টি করার ক্ষমতা একমাত্র তার মধ্যে সীমিত করা।

এ দুটি স্তরের ব্যাপারে পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবে আলোচনা করা হয়নি এবং এ দুটি নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই, এমনকি আরবের মুশরিক, ইহুদি এবং খ্রিষ্টানরাও এ ব্যাপারে একমত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

لَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُوْلُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيْزُ الْعَلِيْمُ

৩. حَضْرُ تَدْبِيْرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فِيْهِ تَعَالَى অর্থাৎ, আকাশ ও জমিনের এবং উভয়ের মাঝে যা কিছু রয়েছে সব কিছুর পরিচালনার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা।

৪. إِنَّهُ لَا يَسْتَحِقُّ الْعِبَادَةَ غَيْرُهُ অর্থাৎ, তিনি ছাড়া অন্য কেউ বান্দার ইবাদত পাওয়ার যোগ্য নয়, একথার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস করা।

আল্লাহ তায়ালার বাণী—

١. إِنَّنِيْ أَنَا اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُوْنِ
٢. يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوْا رَبَّكُمُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ
٣. إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوْا إِلَّا إِيَّاهُ
٤. قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ
٥. رَبُّ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَاتَّخِذْهُ وَكِيْلًا
٦. أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللهَ لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
٧. أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ

পরিশেষে : আল্লাহ তায়ালা একক ও অদ্বিতীয়। তার কোনো শরিক নেই। তিনিই একমাত্র স্রষ্টা, রিযিকদাতা, বিধান-দাতা ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। কুরআন মাজিদের প্রথম ও প্রধান দাওয়াত হলো তাওহিদ। তাওহিদ ঈমানের প্রথম ভিত্তি।

শিক্ষাগার

প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে

মাহমুদুল হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা
গণিতে অনার্স ও মাস্টার্স

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফাজিল সম্পন্ন

গোপালপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিশেষ দক্ষতা

বাংলা সাহিত্য • গণিত • ইসলামিক শিক্ষা

অভিজ্ঞতা

শিক্ষকতা ও ৫+ বছর কন্টেন্ট রাইটিং

আমাদের লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করা। ২০২৩ সাল থেকে লাখো শিক্ষার্থী শিক্ষাগার থেকে উপকৃত হচ্ছে।

Leave a Comment