ইজতিহাদ(اِجْتِهَادٌ ) ইসলামি শরিয়তের একটি বিশেষ মূলনীতি। যে সমস্যার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহতে সরাসরি পাওয়া না যায়, সেক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতির আলোকে চিন্তা ও গবেষণা করে সমাধান দেয়া হয়। এটাকেই ইজতিহাদ বলে।
ইজতিহাদ শব্দের অর্থ কি ?
اِجْتِهَادٌ শব্দটি বাবে اِفْتِعَالٌ-এর মাসদার। جَهَدَ মূলধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হলো —
- اَلْبَحْثُ তথা গবেষণা করা, অনুসন্ধান করা।
- بَذْلُ السَّعْيِ তথা চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানো।
- بَذْلُ الطَّاقَةِ তথা শক্তি ব্যয় করা।
- التَّفَكُّرُ فِي الْأَمْرِ তথা কোনো বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করা।
- بَذْلُ الْوُسْعِ তথা অধিক শক্তি ব্যয় করা।
- بَذْلُ الْمَشَقَّةِ তথা পরিশ্রম করা।
- اَلتَّدَبُّرُ তথা ফলাফল বা পরিণাম বিবেচনা করে গবেষণা করা।
ইজতিহাদ কাকে বলে ?
১. ইবনে হাজার আসকালানি (র.) বলেন—
هُوَ بَذْلُ الْوُسْعِ لِلتَّوَصُّلِ فِيْ مَعْرِفَةِ الْحُكْمِ الشَّرْعِيِّ
অর্থাৎ, শরয়ি হুকুম ও মাসয়ালা নিরূপণে শ্রম ব্যয় করাকে ইজতিহাদ বলে।
২. অধিকাংশ উসূলশাস্ত্র বিশারদ বলেন—
কুরআন, হাদিস, ইজমা ও শরিয়ত সমর্থিত কেয়াসের আলোকে শরয়ি আহকামসমূহ উদ্ভাবন করার জন্য ফিকহগণের সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা করাকে ইজতিহাদ বলে।
সম্পর্কিত পোস্ট : ইজতিহাদের দরজা বন্ধ নাকি খোলা? ইজতিহাদ ভুল করলে তার হুকুম
ইজতিহাদ এর শর্তাবলি:
মুজতাহিদের জন্য ইজতিহাদের কতিপয় শর্ত রয়েছে। এ শর্তগুলো যার মধ্যে পাওয়া যাবে, তিনি ইজতিহাদের যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যিনি এগুলোর অধিকারী নন, তিনি কোনো মুজতাহিদের অনুসরণ করবেন। শর্তগুলো হলো—
١. عِلْمُ الْقُرْآنِ بِمَعَانِيْهِ وَوُجُوْهِهِ
٢. عِلْمُ السُّنَّةِ بِطُرُقِهَا
٣. عِلْمُ وُجُوْهِ الْقِيَاسِ بِطُرُقِهَا
٤. إِخْلَاصُ النِّيَّةِ
٥. كَوْنُهُ أَوْرَعَ
٦. مَعْرِفَةُ اللُّغَةِ الْعَرَبِيَّةِ
নিচে এগুলোর বিবরণ উল্লেখ করা হলো—
১. عِلْمُ الْقُرْآنِ بِمَعَانِيْهِ وَوُجُوْهِهِ : ইজতিহাদের প্রথম শর্ত হচ্ছে মুজতাহিদকে অবশ্যই আল-কুরআনের শব্দাবলির আভিধানিক অর্থ ও শরয়ি মর্ম এবং তার যাবতীয় শ্রেণি বিভাগ সম্পর্কে জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। অবশ্য সম্পূর্ণ কুরআনের যাবতীয় ইলম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা শর্ত নয়। শুধু আহকামে আয়াতগুলো জানা থাকলে চলবে।
২. عِلْمُ السُّنَّةِ بِطُرُقِهَا : সুন্নাহ তথা হাদিসশাস্ত্রে অগাধ জ্ঞান রাখা, বিশেষ করে আহকাম বিষয়ক তিন হাজার হাদিসের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা এবং হাদিস লাভের যাবতীয় পন্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা।
৩. عِلْمُ وُجُوْهِ الْقِيَاسِ بِطُرُقِهَا : কিয়াসে শরয়ি যাবতীয় প্রক্রিয়া ও শর্তাবলি এবং পদ্ধতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞানার্জন করা।
৪. إِخْلَاصُ النِّيَّةِ : ইজতিহাদের আরেকটি শর্ত হচ্ছে নিয়তের বিশুদ্ধতা। দীনি বিধানের প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোপরি আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে ইজতিহাদ করতে হবে।
৫. كَوْنُهُ أَوْرَعَ : মুজতাহিদকে অত্যধিক পরহেজগার ও আল্লাহভীরু হতে হবে। ফাসিকের ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়।
৬. مَعْرِفَةُ اللُّغَةِ الْعَرَبِيَّةِ : মুজতাহিদকে অবশ্যই আরবি ভাষা, সাহিত্য, বালাগাত, ফাসাহাত ইত্যাদি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। কেননা, ইজতিহাদ হয় কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে। আর এগুলোর ভাষা হলো আরবি। উল্লেখ্য, ইজতিহাদের জন্য عَدَالَةٌ শর্ত নয়। তবে মুজতাহিদের মতবাদ সর্বজনগ্রাহ্য হওয়ার জন্য عَدَالَةٌ শর্ত।
সম্পর্কিত পোস্ট : সাহাবীদের যুগে ইজতিহাদ করার পদ্ধতি দলিলসহ বিস্তারিত
ইজতিহাদ এর হুকুম বা বৈধতা :
১. আল-মানার গ্রন্থপ্রণেতা আল্লামা আবুল বারাকাত আন-নাসাফি (র.) ইজতিহাদের বিধান সম্পর্কে বলেন—
حُكْمُ الِاجْتِهَادِ الْإِصَابَةُ بِغَالِبِ الرَّأْيِ
অর্থাৎ, ইজতিহাদের বিধান হলো, প্রবল ধারণার আলোকে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। ইজতিহাদের দ্বারা অকাট্য জ্ঞান অর্জিত হবে না।
২. নুরুল আনওয়ার গ্রন্থের টীকাকার এর ব্যাখ্যায় আরো বলেছেন—
প্রবল ধারণা অনুযায়ী শরয়ি বিধানটি সঠিক হওয়া, তবে এর বিপরীত দিকটির সম্ভাবনাও বিদ্যমান আছে মনে করা।
৩. শায়খ মোল্লাজিওয়ান (র.)-এর মতে—
حُكْمُ الِاجْتِهَادِ إِصَابَةُ الْحَقِّ بِغَالِبِ الرَّأْيِ دُوْنَ الْيَقِيْنِ
৪. ড. আবদুল করিম যায়দান (র.) বলেন—
اَلِاجْتِهَادُ وَاجِبٌ عَلَى مَنْ كَانَ أَهْلَهُ
৫. মু’তাযিলা সম্প্রদায় বলেন, প্রত্যেক মুজতাহিদ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এজন্য বলা হয়ে থাকে— اَلْمُجْتَهِدُ يُخْطِئُ وَيُصِيْبُ অর্থাৎ, মুজতাহিদ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ভুলও করতে পারেন, আবার সঠিক সিদ্ধান্তেও উপনীত হতে পারেন। আর ইজতিহাদের ক্ষেত্রে পরস্পরের মাঝে মতৈনক্য হলে মূলত একজন সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন; উভয়জন নয়।
পরিশেষে : মুজতাহিদ যিনি শরিয়তের মধ্যে ইজতিহাদ করে থাকেন তিনি উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে ইজতিহাদের যোগ্যতম ব্যক্তি হবেন। এসব শর্তের ত্রুটি যার মাঝে আছে, সে ‘ইজতিহাদ’-এর যোগ্য নয়।