ইজতিহাদ ইসলামি শরিয়তের একটি বিশেষ মূলনীতি। যে সমস্যার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে সরাসরি পাওয়া না যায়, শরিয়তের মূলনীতির আলোকে চিন্তা ও গবেষণা করে সেটির সমাধান দেয়া হয়। এটাকেই ইজতিহাদ বলে। নিচে সাহাবিদের যুগে ইজতিহাদ করার পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
সাহাবীদের যুগে ইজতিহাদ করার পদ্ধতি :
নবি করিম (স.) সাহাবিদেরকে ইজতিহাদের ওপর চলার শিক্ষা দিয়েছেন। এরকম বহু দৃষ্টান্ত তার যুগে আমরা দেখতে পাই। তার ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম নতুন নতুন সমস্যার সমাধানের জন্য ইজতিহাদ করেছেন। সাহাবায়ে কেরামগণ ছিলেন উম্মতে মুহাম্মদির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তাদের যুগ হলো خَيْرُ الْقُرُوْنِ, মহান আল্লাহ তায়ালা তার নবীর সাহায্যে ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য তাদেরকে নির্বাচন করেছেন।
সাহাবায়ে কেরামও এ কাজে অগ্রণী হয়ে এসেছেন, তারা নিজেদের পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ এবং জন্মভূমি ত্যাগ করে হিজরত করেছেন, বহু কষ্ট স্বীকার করেছেন, শহিদ হয়েছেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট।
সম্পর্কিত পোস্ট : ইজতিহাদ(اِجْتِهَادٌ) কাকে বলে? এর অর্থ, শর্ত ও হুকুম
রাসূল (স.)-এর ওফাতের পর ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেছেন, ফলে খোলাফায়ে রাশেদার বিস্তৃতি ঘটে। আরব ও আজম একাকার হয়ে যায় এবং নতুন নতুন সমস্যাবলির উদ্ভব হয়। এসব সমস্যাবলির সমাধানে সাহাবায়ে কেরাম বহু ইজতিহাদ করেছেন। তাদের ইজতিহাদের কিছু পদ্ধতি ছিল। নিচে তা পেশ করা হলো—
প্রথম পদ্ধতি : সাহাবায়ে কেরামের সামনে যখন কোনো মাসয়ালা উদয় হতো তখন তারা প্রথমে كِتَابُ اللهِ-এর মধ্যে এর সমাধান খুঁজতেন। যদি كِتَابُ اللهِ-তে তার কোনো সমাধান পাওয়া না যেত, তখন তারা سُنَّةُ الرَّسُوْلِ-এর প্রতি দৃষ্টি দিতেন। এরপর যদি তারা كِتَابُ اللهِ ও سُنَّةٌ-তে এর সমাধান না পেতেন, তখন তারা শরিয়তের দলিলাদি এবং شرعی قَوَاعِدُ كُلِّيَّةٌ দ্বারা গবেষণা করতেন, একটি বিষয়কে অপর বিষয়ের সাথে তুলনা করতেন এবং مَصَالِحُ الشَّرِيْعَةِ-এর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে ইজতিহাদ করে তারা সমাধান দিতেন।
দ্বিতীয় পদ্ধতি : সাহাবায়ে কেরামের اِجْتِهَادٌ-এর দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো তারা কোনো সমস্যা দেখলে তার সমাধানের জন্য বড় বড় সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ করতেন এবং সৃষ্ট সমস্যার সমাধান দিতেন।
সম্পর্কিত পোস্ট : ইজতিহাদের দরজা বন্ধ নাকি খোলা? ইজতিহাদ ভুল করলে তার হুকুম
তৃতীয় পদ্ধতি : সাহাবায়ে কেরামের اِجْتِهَادٌ-এর তৃতীয় পদ্ধতি হলো الِاهْتِمَامُ بِالْمَسَائِلِ الْوَاقِعَةِ তথা সৃষ্ট মাসয়ালাসমূহের প্রথমে গুরুত্ব অনুধাবন করা। সে হিসেবে তারা سُنَّةُ الرَّسُوْلِ ও كِتَابُ اللهِ-এর আলোকে এর সমাধান দিতেন।
চতুর্থ পদ্ধতি : সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদের চতুর্থ পদ্ধতি ছিলো—
اَلرُّجُوْعُ عَنِ الِاجْتِهَادِ إِذَا تَبَيَّنَ عَدَمُ صَوَابِهِ
অর্থাৎ, ইজতিহাদ সঠিক হয়নি প্রকাশ হলে তারা ইজতিহাদ থেকে ফিরে আসতেন।
পঞ্চম পদ্ধতি : সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদের পঞ্চম পদ্ধতি হলো— কৃত ইজতিহাদে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে তাদের কেউ অপরকে দোষারোপ করতেন না। বরং সকলে একে অপরের সম্মানের প্রতি সদা সজাগ ছিলেন।
পরিশেষে : ইজতিহাদ ইসলামি শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। যদি ইজতিহাদের সুযোগ শরিয়তে না থাকতো, তাহলে অনেক অভিনব মাসয়ালার ক্ষেত্রে মানবজীবন স্থবিরতার সম্মুখীন হয়ে পড়তো।
সম্পর্কিত পোস্ট : الْمُرَجِّحَاتُ অর্থ, সংজ্ঞা, রূপরেখা ও উপকারিতা