দুরন্ত আশা কবিতার মূলভাব/বিষয়বস্তু/ সারমর্ম
আমাদের মনে যখন কোনো আশা জাগে, তখন আমরা অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে ঘরে বসে তামাক খাই বা তাস খেলি। আমরা সেই আশা পূরণ করার জন্য চেষ্টা না করে; বরং শয়নকক্ষে আড্ডা জমাই এবং ভালো মানুষ সেজে নিরীহ জীবনযাপন করি । এটা বাঙালি চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য । এ জাতি সর্বদাই পরিশ্রম বিমুখ।
অতি সহজে, অল্প পরিশ্রমে তারা সবকিছু পেতে চায়। ফলে আশা স্বপ্ন হয়ে। পাখনা মেলে ভেসে বেড়ায়। তা কখনো বাস্তবে রূপ পায় না। ফলে আশা বুকের ভেতর গুমরে মরে। কবি এরূপ জীবন পছন্দ করেন না। তিনি আরব মরুভূমিতে বাস করে বেদুইনদের মতো উদ্দাম জীবনের প্রত্যাশী। বেদুইনরা ঘোড়া বা উটে চড়ে ঘুরে বেড়ায় দিগন্ত থেকে দিগন্তে । জীবনের চলার পথ তাদের কুসুমাস্তীর্ণ নয় ।
আরও জানুন : কপোতাক্ষ নদ কবিতার মূলভাব/বিষয়বস্তু এবং নামকরণ
কবি বলেন, পৃথিবীতে যা কিছু নামকরা বা মহান তার সবই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত । কবি তাই ক্ষুদ্র গৃহকোণে লুকিয়ে থাকতে চান না। তিনি পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করাকে ঘৃণা করেন। কবি বলেন, পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে কোনো লাভ নেই। নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য সকল অলসতা, জড়তা পরিত্যাগ করে কঠোর প্ররিশ্রমী ও সংগ্রামী হতে হবে।
ভীরুতা পরিহার করে সাহসদৃপ্ত চরণে সুকঠিন মনোবল নিয়ে বাধা বিপত্তি মোকাবেলা করাই প্রকৃত জীবন । কবি আসলে অলস উদ্দমহীন জাতির প্রাণে শক্তি, সাহস, আশা আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে দিতে চেয়েছেন। জাতিকে জীবন সংগ্রাম ও দুরন্ত আশায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন।
দুরন্ত আশা কবিতার নামকরণ :
‘দুরন্ত আশা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা : সাহিত্যকর্মের নামকরণে সাহিত্যিককে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হয়। কবিতার নামকরণে সাধারণত কবিতার বিষয়বস্তু বা অন্তর্নিহিত ভাবকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। কবিগণ কবিতার নামকরণে অত্যন্ত জ্ঞান ও দূরদর্শীতার পরিচয় দিয়ে থাকেন।
কবিতার নামকরণে একটি বিশেষ রূপ ও রীতি আছে। এ নামকরণের মাধ্যমেই সৃষ্ট সাহিত্যের সামগ্রিক পরিচয় ফুটে ওঠে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর দূরন্ত কিছু আশার প্রেক্ষিতে এর নামকরণ করেছেন। দূরন্ত আশা কবিতার নামকরণ এর বিষয় ভাবনা বা মূল বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। কবির সুতীব্র আশা তিনি চলমান সভ্যতার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাবেন।
আরও জানুন : যাব আমি তোমার দেশে কবিতার মূলভাব ও নামকরণ
তিনি তথাকথিত সভ্যতার গণ্ডি মানতে চান না। কারণ বাঙালি জাতি নিজের ভাগ্য মিনতির ওপর ছেড়ে দেয় তারা নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার চেষ্টা করে না। এরা পূর্ব পুরুষের গৌরব মাহাত্ম্য প্রচার করে ভদ্রতার বাণী শোনায় । কবির একান্ত আশা এই ভদ্রতার মূলে আঘাত করা, কবি অল্প পরিশ্রমে সবকিছু পেতে চান না।
তিনি অবিরাম ছুটে চলতে চান আরব বেদুঈনদের মত ঘোড়া বা উটের পিঠে চড়ে দিগন্তের পথে । তিনি নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য সকল অলসতা, জড়তা পরিত্যাগ করে কঠোর পরিশ্রমী ও সংগ্রামী হতে চান। তিনি ভীরুতা পরিহার করে সাহসদৃপ্ত চরণে সুকঠিন মনোবল নিয়ে বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করতে চান।
কবি আসলে জাতিকে জীবন সংগ্রামে ও দুরন্ত আশায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন । তাই বিষয়বস্তুর আঙ্গিকে ও সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর নামকরণ ‘দুরন্ত আশা’ যথার্থ, সুন্দর ও সার্থক হয়েছে।