ইসলাম মানবতার কল্যাণকামী একটি জীবনব্যবস্থা। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানব কল্যাণ সাধন এ জীবনব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য। এ জীবনব্যবস্থা মানবতার সকল অধিকারের ব্যাপারে সদা সজাগ ও সচেতন। মানুষের জন্য ইসলাম প্রদত্ত অধিকারগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হলে অশান্তির অনলে বিক্ষত এ বিশ্ব শান্তির নীড়ে পরিণত হবে।
মানবাধিকারের পরিচয় :
ক. আভিধানিক অর্থ : মানবাধিকার শব্দটির অর্থ বোঝাতে ইংরেজিতে কয়েকটি শব্দ ব্যবহার হয়। যেমন— Fundamental Rights, Basic Human Rights, Birth Rights of a man অর্থাৎ, মৌলিক অধিকার, মৌলিক মানবাধিকার, একজন মানুষের জন্মগত অধিকার ইত্যাদি। আর আরবিতে একে الْحُقُوقُ الْإِنْسَانِيَّةُ বলা হয়।
খ. পারিভাষিক সংজ্ঞা : মানবাধিকারের পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদানে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্নভাবে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। যথা—
১. মানবাধিকারের সংজ্ঞায় রাষ্ট্র বিজ্ঞানী লাস্কি বলেন- অধিকার সমাজ জীবনের সে সকল অবস্থা যা ব্যতীত মানুষ তার ব্যক্তিত্বকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারে না।
২.প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন – অধিকার হচ্ছে সে সকল সুযোগ-সুবিধা যা ব্যক্তি বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এবং যা সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত।
৩. সমাজ বিজ্ঞানী বোজাংকেট এর মতে, অধিকার হলো সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত এবং রাষ্ট্র কর্তৃক প্রযুক্ত দাবি।
বস্তুত মানুষ পৃথিবীতে সন্তান, নাগরিক, স্বামী, স্ত্রী, সৈনিক, সেনাপতি, ক্রেতা, বিক্রেতা, ছাত্র, শিক্ষক, মালিক এবং শ্রমিক হিসেবে যে সকল সুযোগ সুবিধা অপরিহার্যভাবে পাওয়ার দাবি রাখে সেগুলোকেই মানবাধিকার বলে।
এ মানবাধিকারের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
كُلُوا مِنْ ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ
মোটকথা, ‘অধিকার’ বলতে সমাজ ও রাষ্ট্রকর্তৃক স্বীকৃত কতকগুলো সুযোগ-সুবিধাকে বোঝায়, যা ছাড়া ব্যক্তির মানবাধিকারের বিকাশ ঘটে না।
আরো পড়ুন : ইলমে তাসাউফ কাকে বলে? এর অর্থ,গুরুত্ব , লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ইসলামে মানবাধিকার :
ইসলামী জীবন দর্শন যেমনি পরিপূর্ণ, ইসলামে মানবাধিকারের ধারণাও তেমনি ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ। আমরা এ পর্যায়ে সুনির্দিষ্টভাবে ইসলাম কিভাবে মানবাধিকার সংরক্ষণ করেছে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র পরিবেশন করছি। যেমন—
১. জীবনের নিরাপত্তার অধিকার : মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষের বেঁচে থাকার তথা জীবনের নিরাপত্তার অধিকারকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। ইসলাম আদালতে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ প্রমাণিত হওয়া ও আদালত কর্তৃক শাস্তি ঘোষণা ছাড়া কোনো মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করাকে সমস্ত মানবকুলের হত্যার সমতুল্য অপরাধ বলে গণ্য করেছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا
২. সম্পদের মালিকানা সংরক্ষণের অধিকার : ইসলামে সবকিছুর নিরঙ্কুশ মালিকানা একমাত্র আল্লাহর। অবশ্য মানুষের দুনিয়ার জীবনকে সুখী সমৃদ্ধ ও শান্তিময় করে গড়ে তোলার জন্য ইসলাম সম্পদের মালিকানা ও ভোগ দখলের অধিকার দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
৩. মান ইজ্জত ও মর্যাদা রক্ষার অধিকার : ইসলাম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মানুষের ইজ্জত ও সম্মান রক্ষার সুস্পষ্ট বিধান ঘোষণা করেছে। মানুষের মর্যাদাহানি ও হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নিন্দা, কুৎসা রটনা, বিদ্রূপ, উপহাস, নাম ও উপাধিকে বিকৃত করা ইত্যাদিকে হারাম বলে ঘোষণা করেছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
١- لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ
٢- اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
٣- لَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا
আরো পড়ুন : প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য। কুরআন ও হাদিসের আলোকে
৪. মতামত প্রকাশের অধিকার : ইসলাম নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ ও স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَإِنْ تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
৫. ধর্মীয় ক্ষেত্রে স্বাধীনতার অধিকার : একটি ইসলামী রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মের লোক নিরাপদে বসবাস করতে পারবে এবং স্বাধীনভাবে তার ধর্ম কর্ম পালন করতে পারবে। এটা তার মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত বলে ইসলাম ঘোষণা করেছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
৬. অমুসলিমের ধর্ম পালনের অধিকার : ইসলাম অমুসলিম নাগরিকদের ধর্মীয় অধিকারের সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে মানবাধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। প্রত্যেক ধর্মের উপাস্যদের নিন্দাবাদ ও গালমন্দকে কুরআন দ্যর্থহীন ভাষায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলেছে—
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ
৭. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের অধিকার : ইসলাম জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ ও প্রাণীকুলের খাদ্যের প্রাথমিক অধিকার প্রদান করেছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا
৮. সুবিচার প্রাপ্তির অধিকার: ইসলাম শত্রু, মিত্র, মুসলিম, অমুসলিম সকল নাগরিকের সুবিচার প্রাপ্তি ও আইনের দৃষ্টিতে মানবাধিকার প্রাপ্তির ঘোষণা দিয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন—
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى
৯. শিক্ষার অধিকার: ইসলাম সকল স্তরের মানবসমাজের উপর জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাগ্রহণ বাধ্যতামূলক করে মানবাধিকারকে সমুন্নত করেছে। ইসলামী জ্ঞানের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে। এর মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ
১০. নারীর মর্যাদা ও অধিকার: ইসলামই প্রকৃতপক্ষে নারীর মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণ করেছে। মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত বলে নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
١- هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ
٢- وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
১১. শ্রমিকের অধিকার: ইসলাম শ্রমিকের অধিকারের ব্যাপারে অত্যন্ত সোচ্চার। শ্রমিক যেন তার যথাযথ প্রাপ্য যথাসময়ে পেয়ে যায়। যেমন রাসূল (স) বলে—
أَعْطُوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ
১২. ব্যবসায় বাণিজ্যের অধিকার: ইসলাম বৈধভাবে যেকোনো ব্যবসায় পরিচালনা করার অধিকার সকলকে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন—
أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা :
ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থা যা মানুষসহ প্রতিটি সৃষ্টিকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদানে সর্বদা সজাগ ও সচেতন। যেমন রাসূল (স)-এর বাণী—”তোমরা প্রত্যেক হকদারের প্রাপ্য হক আদায় করে দাও”। প্রাচীন ও আধুনিক কোনো ইতিহাসই এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখেনি, যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ধর্মীয় আদর্শের ওপরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তার অনুসারী ও ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসীদের মাঝে এমন ভারসাম্য স্থাপন করেছে যেমনটি ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা করেছে।
ইসলাম পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে, নারী-পুরুষকে পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করে তাদের প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অনুরূপভাবে ইসলাম শ্রেণিগতভাবে মুসলমান ও অমুসলিমের উল্লেখ করে সকল শ্রেণি ও ধর্মের মানুষকে তাদের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছে। ইসলাম প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী— لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ অর্থাৎ, ধর্মীয় ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।